***
রাত পোহাবার পর আল-মালিকুস সালিহর অবস্থা এখন পাগলের চেয়েও শোচনীয়। তিনি দুজন ঘনিষ্ঠ সালারকে সম্মুখে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। তারা ইবনে খতীবকে ডেকে নিয়ে আসে। খতীবকে জিজ্ঞেস করা হয়- একটি মেয়ে এবং আরবীয় ব্যবসায়ীদের বের হতে দেখেছো কি?
হ্যাঁ দেখেছি- ইবনে খতীব উত্তর দেয়- আমি তো বাহিনীসহ বাইরে প্রস্তুত দণ্ডায়মান ছিলাম। মধ্য রাতের আগে ব্যবসায়ী তিনজন বাইরে আসে। তাদের সঙ্গে একটি সুন্দরী মেয়েও ছিলো। তারা এখান থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেছে। আমি ছুটন্ত ঘোড়র পদশব্দ শুনতে পেয়েছি। পরে আর তাদেরকে ফিরে আসতে দেখিনি।
সুলতান আইউবীর সমর্থক সালারও এসে পড়েছেন। তিন খৃস্টান ও মেয়েটির সন্ধান তার জানা আছে। তিনি আস-সালিহকে খৃস্টানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে শুরু করেন। তারা এমন একটি রূপসী মেয়েকে আপনার কাছে রেখে যাওয়া সমীচীন মনে করেনি। আপনাকে ধোঁকা দিয়ে তারা আপনার অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য নিয়ে পালিয়েছে। হয়তোবা আপনিও জানেন না, কী সে মূল্যবান তথ্য।
আস-সালিহর উপর নীরবতা ছেয়ে গেছে। বোধ হয় তার চৈতন্য ফিরে এসেছে যে, মেয়েটি তাকে দিনের বেলায়ও মদপান করিয়ে অচেতন করে রাখতো। সে সময় কে জানে সে তার মুখ থেকে কী সব কথা বের করে নিয়েছে। এখন ভাবটা এমন, যেনো আল-মালিকুস সালিহ কৃতকর্মে মর্মাহত। গত রাতে একটুও ঘুমাননি। অনেক দিন যাবত মদপান করে আসছেন। একদিকে তার ক্রিয়া, অন্যদিকে আক্ষেপ-অনুশোচনা। হঠাৎ মুখ খুলে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আদেশ করেন- লোকগুলোর সঙ্গে যে কাফেলা এসেছিলো, তাদের প্রত্যেককে বন্দী করে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করো, তাদের উট ও অন্যান্য মালপত্র ক্রোক করে নাও।
সেদিনই সন্ধায় আস-সালিহর পেট ব্যথা শুরু হয়। ডাক্তার দেখে ওষুধ দেন। কিন্তু রোগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। রাত নাগাদ পেট ফুলে ওঠে। ৫৭৭ হিজরীর ৯ই রজব অর্থাৎ পরদিন অবস্থা আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করে। ডাক্তার এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকছেন। কিন্তু আস-সালিহর অবস্থার কোন উন্নতি হচ্ছে না। পরবর্তী রাতও একইভাবে অতিবাহিত হয়। দ্বিতীয় দিন তার সংজ্ঞা হারিয়ে যেতে শুরু করে। ডাক্তার তাকে কিছু বুঝেত না দিয়ে সালার প্রমুখদের জানিয়ে দেন, মহারাজের সেরে ওঠার সম্ভাবনা নেই। জামে মসজিদের ইমামকে ডেকে আনা হলো। তিনি শিয়রে বসে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করেন। রাতে আস-সালিহ চোখ খোলেন। ইমামের প্রতি তাকিয়ে অনুচ্চ স্বরে বললেন- কুরআন যদি সত্য হয় থাকে, তাহলে তার বরকতে আমাকে সারিয়ে তুলুন।
আমার একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, কুরআনের বিরুদ্ধাচরণ করা আপনার মিশনে পরিণত হয়েছে- ইমাম বললেন- এই সংক্ষিপ্ত জীবনের পুরোটাই আপনি কুরআন ও ইসলামের বিপক্ষে ব্যয় করেছেন। কুরআনের বরকত সেই ব্যক্তির জন্য, যে তার আনুগত্য করে চলে। আপনি আল্লাহর সমীপে পাপের ক্ষমা ভিক্ষা করুন। তার নিকট থেকে ক্ষমা নেয়ার চেষ্টা করুন।
আস-সালিহর বোন পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। আস-সালিহ বলে ওঠেন যাও আমার মাকে ডেকে আনন। তাকে বলল, তোমার পুত্র মৃত্যুবরণ করছে; তুমি এসে তার দুধের দাবি এবং জীবনের পাপ ক্ষমা করে দাও।
ইমাম শামসুন্নিসার প্রতি তাকান। শামসুন্নিসা ভাইয়ের মাথায় স্বস্নেহে হাত বুলিয়ে বললো- আমি এক্ষুনি দামেশকের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছি। আমি মাকে নিয়েই তবে আসবো। সে পর্যন্ত তুমি বেঁচে থাকো ভাইয়া!
শামসুন্নিসা দ্রুতপদে বাইরে বেরিয়ে যায়। অল্পক্ষণ পরই সে রক্ষীদের সঙ্গে দামেশকের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়।
কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তাঁর রোজনামচায় লিখেছেন- রজবের ১৩ তারিখ আস-সালিহর অবস্থা এতোই গুরুতর রূপ ধারণ করে যে, দুর্গের ফটক বন্ধ করে দেয়া হয়। এক পর্যায়ে সামান্য চৈতন্য ফিরে এলে. আস সালিহ ইযুদ্দীনকে স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেন। ইযযুদ্দীন সাইফুদ্দীনের মৃত্যুর পর মসুলের গবর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। সে সময় তিনি মসুল অবস্থান করছিলেন। এখন তাকে হালবেরও গবর্নর নিযুক্ত করা হলো। আস-সালিহ সকল আমীর ও সালারদের ডেকে বললেন, শপথ নাও, তোমরা ইযযুদ্দীনকে গবর্নর হিসেবে বরণ করে নেবে এবং তার অনুগত হয়ে কাজ করবে। সবাই শপথ করে।
৫৭৭ হিজরীর ২৫ রজব আল-মালিকুস সালিহ অচেতন অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মসুলে দূত প্রেরণ করে ইযযুদ্দীনকে ডেকে আনা হলো। তাকে অবহিত করা হলো, আপনাকে হাবের গবর্নর নিযুক্ত করা হয়েছে।
***
যে সময়ে শামসুন্নিসা দামেশকে মায়ের পায়ের উপর বসে বলছিলো, আপনার একমাত্র পুত্র মৃত্যুবরণ করছে, আপনার দুধের দাবি মাফ করানোর জন্য তিনি আপনাকে নিতে পাঠিয়েছেন আর মা বলেছিলেন, আমি তার দুধের দাবি ক্ষমা করতে পারি; কিন্তু গুনাহের ক্ষমা আল্লাহর নিকট থেকে নিতে হবে, তখন আস-সালিহর জীবনের চির অবসান ঘটে। শামসুন্নিসা হাবে ফিরে এসে দেখতে পায়, দুর্গ থেকে তার ভাইয়ের জানাযা বের হচ্ছে।
দূত ইযযুদ্দীনকে আস-সালিহর মৃত্যুর সংবাদ জানায়। ইযযুদ্দীন সঙ্গে সঙ্গে রওনা হয়ে যান। দ্রুত এসে পৌঁছানোর জন্য তিনি অন্য পথ ধরেন। সুলতান আইউবীর ভাই আল-আদিলের সেনা ছাউনীর পাশ দিয়ে তার অতিক্রম ঘটে। তিনি আল-আদিলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আল-আদিল আস-সালিহর মৃত্যুর খবর জানতেন না। ইযযুদ্দীন তাকে সংবাদটি জানান। সঙ্গে এও অবহিত করেন যে, তাকে হাবের গবর্নর নিযুক্ত করা হয়েছে। আল-আদিল বললেন- তবে তো তুমি ইচ্ছে করলে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারো এবং হাবকে দামেশকের সঙ্গে একীভূত করে ফেলতে পারে। গাদ্দার মরেছে। তুমি তো গাদ্দার নও।
