ইহুদী মেয়েটি ফাং ফাং করে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। মেয়েটি কার সঙ্গে যেনো সাক্ষাৎ করে এদিকে আসছিলো। এমন সময় চাকরানী তাকে দাঁড় করিয়ে একজন সালারের নাম করে বললো, কি এক প্রয়োজনে তিনি আপনাকে যেতে বলেছেন। মেয়েটি জানে, সালার তাদের লোক। সে সালারের নিকট চলে যায়। কিন্তু আর ফিরে আসেনি। কী হলো, কোথায় গেলো, কেউ বলতে পারছে না। ঘটনাটা আস-সালিহ এখনো জানতে পারেননি।
ইবনে খতীব আজ রাত ডিউটিতে নেই। সুযোগ সৃষ্টি করে সে তিন বণিকের একজনের সঙ্গে কথা বলে বললো- আপনারা তিনজন এখান থেকে বেরিয়ে যান। অন্যথায় মারা পড়বেন। বিরাট সমস্যা দেখা দিয়েছে। সুলতান আইউবীর কমান্ডোরা জেনে ফেলেছে, আপনারা মেহমানের বেশে এখানে আছেন।
ইবনে খতীব একটি জায়গার নাম বলে বললো- আপনারা ওখানে চলে আসুন।
আমাদের চলে যাওয়ার সময়ও হয়ে গেছে- খৃস্টান বললো- আমাদের কাজ হয়ে গেছে।
তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ুন- ইবনে খতীব বললো- অন্যথায় সকালে এখান থেকে আপনাদের লাশ বের হবে।
তৎক্ষণাৎ খৃস্টান লোকটি কথাটা তর সঙ্গীদের কানে দেয়। তারা একজন একজন করে প্রাসাদ থেকে এমনভাবে বেরিয়ে পড়ে, যেনো কারো মনে সন্দেহ না জাগে। প্যান্ডেলের ভেতর থেকে সাবধানে বের হয়েই তারা। অন্ধকার পথে ঢুকে পড়ে। ইবনে খতীব তিনটি ঘোড়ার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। সেও একটি ঘোড়ার পিঠে সওয়ার। আসরে নাচ-গান চলছে। আমোদে উন্মাতাল অতিথিগণ। হট্টগোল এতো যে, চারটি ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ কারো কানেই প্রবেশ করেনি। আস-সালিহ টেরই পাননি যে, তার বিশিষ্ট তিন মেহমান কাল্পনিক বিপদ থেকে পলায়ন করে প্রকৃত বিপদের মধ্যে চলে গেছে।
***
লোকালয় থেকে দূরে ঝুপড়ির মতো একটি ঘর। তিন খৃস্টান সেই ঘরে বসা। ইবনে খতীব মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছে যে, তাদের জীবন রক্ষা পেয়ে গেছে। তারা তাদের উষ্ট্ৰচালকদের সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করে। ইবনে খতীব তাদেরকে সান্ত্বনা প্রদান করে। তাদেরকেও বের করে আনা হলে ইবনে খতীব বললো, আস-সালিহর সঙ্গে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, আমার জানা দরকার। আমাকেও তো সতর্ক থাকতে হবে। তারা বললো, আমরা আস-সালিহকে নেপথ্য থেকে সমর সরঞ্জাম ও ঘোড়া দেবো। তার বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেবো। গোয়েন্দা দেবো। আর যখন তিনি সুলতান আইউবীর উপর আক্রমণ করবেন, তখন আমরা আইউবী বাহিনীর উপর পেছন থেকে আক্রমণ করবো। মোটকথা, আস-সালিহ আইউবীর সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে ফেলবেন। কিন্তু যুদ্ধ তখন করবেন, যখন আমরা তাকে সবুজ সঙ্কেত দেবো।
এখনই কি আমাদের রওনা হওয়া উচিত না? এক খৃস্টান বললো।
হ্যাঁ- ইবনে খতীব বললো- আপনাদের রওনা হওয়ার সময় হয়ে গেছে। আমার সঙ্গে আসুন।
ইবনে খতীব কক্ষের দরজা খোলে। এটি অন্য এক দরজা। বললো, চলুন।
তারা দরজা পেরিয়ে একটি কক্ষে ঢুকে পড়ে। কক্ষটা অন্ধকার। কিন্তু ঢোকামাত্র হঠাৎ কি যেনো ঘটে গেলো। তিন খৃস্টানের প্রত্যেককে একজন করে লোক ঝাঁপটে ধরে এবং পরক্ষণেই প্রত্যেকের হৃদপিণ্ডে খঞ্জর ঢুকে যায়। আগেই কক্ষের এক কোনে একটি গভীর গর্ত খুড়ে রাখা হয়েছিলো। আল-মালিকুস সালিহর তিন খৃস্টান উপদেষ্টাকে তাতে পুঁতে রাখা হলো।
সেই কক্ষেরই এক কোণে আল-মালুিকস সালিহর উপহার ইহুদী মেয়েটি উপবিষ্ট। অন্ধকারে সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। হাত-পা বাঁধা। মুখে কাপড় গোজানো। তাকেও ভোজসভা থেকে চাকরানীর মাধ্যমে সফলভাবে অপহরণ করা হয়েছে। কক্ষে ইবনে খতীব ছাড়া আরও পাঁচ ব্যক্তি। তারা মেয়েটির হাত-পা খুলে দেয় এবং মুখের কাপড় বের করে ফেলে। মেয়েটি তার সহকর্মী খৃস্টানদের পরিণতি দেখেছে। বললো, আমাকে অপর কক্ষে নিয়ে চলো। তাকে অপর কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে একটি প্রদীপ জ্বলছে।
তোমরা কি আমার চেয়ে রূপসী মেয়ে কখনো দেখেছো? মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
তুমি কি আমাদের অপেক্ষা বেশি ঈমানদার কোন দিন দেখেছো? ইবনে খতীব পাল্টা প্রশ্ন করে আমরা তোমাকে এতোটুকু সুযোগ দেবো না যে, তুমি আস-সালিহর ন্যায় আমাদের ঈমানও ক্রয় করে ফেলবে।
আমি তোমাদের নিকট জীবন ভিক্ষা চাচ্ছি- মেয়েটি বললো- তোমাদের যদি আমাকে ভালো না-ই লাগে, তাহলে কী পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা তোমাদের দরকার বলো; আমি সকালেই সেসব তোমাদের নিকট এনে হাজির করবো। তারপর আমি এখান থেকে সোজা জেরুজালেম চলে যাবো।
ইবনে খতীব সঙ্গীদের প্রতি তাকায়। দুজনের চেহারায় বিস্ময়কর প্রতিক্রিয়া দেখতে পায়। সে অতি দ্রুততার সাথে খঞ্জর বের করে অস্ত্রটা মেয়েটির বুকে সেঁধিয়ে দেয়। মেয়েটি লুটিয়ে পড়ে গেলে মাথার চুলে ধরে টেনে-হেঁচড়ে অপর কক্ষে নিয়ে গর্তে ছুঁড়ে ফেলে। সকলে মিলে গর্তটা মাটিতে ভরে দেয়।
ইমামকে রাতেই জানানো হলো, কাজ সমাধা হয়ে গেছে।
ওদিকে আস-সালিহ তিন উপদেষ্টা ও রক্ষিতা মেয়েটির জন্য অস্থির বেচাইন হয়ে ওঠেছেন। কী ব্যাপার, ওরা গেলো কোথায়? ওদের দেখছি না কেন?
মধ্য রাতের খানিক পর যখন শেষ মেহমানটিও বিদায় নিয়ে গেলো, তখন আস-সালিহ ঘনিষ্ঠদের জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, ওরা গেলো কোথায়? অনেক খোঁজাখুঁজি করে কোথাও পাওয়া গেলো না। আস-সালিহ বিশেষত মেয়েটির জন্য বেশি অস্থির ছিলেন। এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করছেন আর চাকরানীকে বকছেন। অবশিষ্ট রাত নিজেও ঘুমালেন না, চাকর-নকরদেরও ঘুমাতে দিলেন না। চাকরানী ইমামকে বলেছিলো, মেয়েটি হাতছাড়া হয়ে গেলে আস-সালিহ হুঁশ হারিয়ে ফেলবেন। এখন তারই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তার মন্তব্য সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। আল মালিকুস সালিহ পাগল হয়ে যাচ্ছেন।
