হা্লবের জামে মসজিদের এই ইমাম সে সকল গোয়েন্দাদের কমান্ডার, সুলতান আইউবী যাদেরকে হাবে প্রেরণ করে রেখেছেন। যার রিপোর্ট দেয়ার প্রয়োজন হয়, ঈশার নামাযে মসজিদ গিয়ে ইমামকে দিয়ে আসে। ইমাম এই সময়টায় গোয়েন্দাদের রিপোর্ট নেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন। সেসব রিপোর্টের সত্যতা ও বাস্তবতা যাচাই করে তিনি সুলতান আইউবীর নিকট প্রেরণ করেন। এখন ইবনে খতীব অতিশয় মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট নিয়ে ইমামের সম্মুখে বসা।
এমন সময় এক মধ্যবয়সী মহিলা এসে হাজির হয়। মহিলা মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো বোরকায় ঢাকা। ভেতরে প্রবেশ করেই সে বোরকাটা খুলে ফেলে। বোরকার ভেতরের মানুষটাকে দেখেই সকলে হেসে ওঠে। মহিলা আল-মালিকুস, সালিহর চাকরানী। আস-সালিহর শয়ন কক্ষের দেখাশোনা করা তার দায়িত্ব। তার সকল গোপন তথ্য এই মহিলার পেটে। সেদিনই সে ইমামকে রিপোর্ট করেছিলো, খৃস্টানদের পক্ষ থেকে আল মালিকুস সালিহর নিকট একটি মেয়ে এসেছে, যে কিনা আকার, গঠন, শরীর এবং অঙ্গসৌষ্ঠব ও মুখের ভাষায় আপাদমস্তক একটা যাদু, যার থেকে রক্ষা পাওয়ার শক্তি ইয়া বড় অলি-দরবেশেও নেই। রূপের এক মূর্ত প্রতীক মেয়েটি। চাকরানী ইমামকে জানিয়ে রেখেছে, আস-সালিহর নিয়মতান্ত্রিক হেরেম নেই। কিন্তু নারী ছাড়া তার রাত কাটে না। নারী তার দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে।
… কিন্তু আমার কাছে মেয়েটা ইহুদী মনে হচ্ছে- চাকরানী বললো আস-সালিহকে সে নিজের গোলাম, বরং কয়েদী বানিয়ে নিয়েছে। লোকটা এমনই পাগল হয়ে গেছে যে, গর্বভরে আমাকে জিজ্ঞেস করে মেয়েটাকে কি তোমার পছন্দ হয়? আমি কি ওকে বিয়ে করে নেবো? আমি একবার বলেছিলাম, আপনার বোনকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, সে কী বলে। কিন্তু তিনি আমাকে শক্তভাবে বলে দেন, খবরদার ওকে কিছু বলবে না।
আস-সালিহর চাকরানীও গোয়েন্দা। সে ইমামকে বিস্তারিত জানায়, আল-মালিকুস সালিহ পুরোপুরি মেয়েটির জালে আটকা পড়ে গেছেন। এখন আর অন্য কোন নারী তার শয়নকক্ষে ঢুকতে পারে না। কিন্তু ভাবনার বিষয় হলো, এখনই সুলতান আইউবীকে রিপোর্ট করবো নাকি দেখবো খৃস্টানরা কী করে কিংবা আস-সালিহকে দিয়ে কী করায়।
ইমাম বললেন- আমার অভিমত হচ্ছে, আস-সালিহ যদি চুক্তি পরিপন্থী কোন আচরণ করে, তবেই সুলতানকে বিস্তারিত জানাবো।
সুলতান আইউবী মিসর চলে গেছেন- অপর একজন বললো। লোকটি বৃদ্ধ এবং মনে হচ্ছে বিচক্ষণ- এদিকে আল-আদিল আছেন। সুলতানের সিদ্ধান্ত না নিয়ে তিনি কোন অভিযান পরিচালনা করবেন না। ততোক্ষণে এখানকার পরিস্থিতি এমন রূপ ধারণ করতে পারে, যা হয়তো আমাদের আয়ত্ত্বের বাইরে চলে যাবে। আমাদের এমন কিছু করা দরকার, যার ফলে এই ধারাটি এখানেই শেষ হয়ে যায়।
আমি আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি- চাকরানী ইমামকে উদ্দেশ্য করে বললো- আস-সালিহর মনোযোগ শুধু মেয়েটির প্রতি। মেয়েটি ছাড়া তিনি এখন কিছুই বোঝেন না। ভাল-মন্দ ভাববার শক্তি তার নেই। মেয়েটি দিনের বেলায়ও তাকে মদ খাইয়ে মাতাল করে রাখে। হতভাগা আগেও মদপান করতেন, তবে শুধু রাতে পান করতেন। তাছাড়া এতো বেশি করতেন না। নেশা অবস্থায় বোনের মুখোমুখি হতেন না। বোমের সঙ্গে দিনে সাক্ষাৎ করতেন। এখনকার অবস্থা হলো, এই মেয়েটি আসার পর থেকে এ যাবত ভাই-বোনের সাক্ষাৎ ঘটেনি। বোনের মাঝে পিতার কৌলিন্য আছে। আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি বলি, রাষ্ট্রীয় কাজ-কর্ম এতো বেড়ে গেছে যে সময় পান না।… যা হোক, আমার পরামর্শ হলো, মেয়েটিকে গুম করে ফেলা দরকার। তবেই আস-সালিহ দিকদিশা হারিয়ে ফেলবেন।
প্রস্তাবের উপর দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনা হয়। ইবনে খতীব বললো, আমি বণিক তিনজনকেও গায়েব করে ফেলতে পারবো। কাজটা সহজ না হলেও অসম্ভব নয়।
***
১১৮১ সালের নবেম্বর মাস। উটের কাফেলা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ কেনাকাটা করছে। তিন খৃস্টান উপদেষ্টা আল-মালিকুস সালিহর সঙ্গে সাক্ষাৎ-যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। তারা আস-সালিহকে বল্ডউইনের পরিকল্পনা মাফিক ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করছে। দিনটা নবেম্বর মাসের ১৬ কি ১৭ তারিখ। ৫৭৭ হিজরীর ৭ কিংবা ৮। রাতে আল-মালিকুস সালিহ বিরাট এক ভোজের আয়োজন করেছেন। কারণটা বাহ্যত বুঝা যাচ্ছে না। বিষয়টা জানেন আস-সালিহর দুজন সালার। আস-সালিহ খৃস্টান উপদেষ্টাদের সঙ্গে গোপন চুক্তি সম্পন্ন করেছেন। সে উপলক্ষেই এই ভোজের আয়োজন। মেহমান অসংখ্য। তন্মধ্যে বণিকবেশী তিন খৃস্টান উপদেষ্টাও আছে। কাফেলার উষ্ট্ৰচালকরাও আজকের এই ভোজসভার বিশিষ্ট মেহমান। কিন্তু আসলে তাদের উপস্থিতি উষ্ট্ৰচালকের বেশে নয়; তারা উষ্ট্ৰচালকও নয়। তাদের কেউ গোয়েন্দা, অন্যরা খৃস্টান বাহিনীর অফিসার। উষ্ট্ৰচালক তাদের ছদ্ম পরিচয়। ভোজের আসরে ইহুদী মেয়েটিও আছে। আছে আস-সালিহর বোনও। কিন্তু তার দায়িত্ব আয়োজন তদারকি করা।
আজ রাত রক্ষীসেনাদের তৎপরতা কম। মেহমানগণ দলে দলে আসছে। কোন আশঙ্কা বোধ হচ্ছে না। অন্তত আস-সালিহর মনে কোন শঙ্কা নেই। মদপানের ধারা চলছে। আস্ত খাসীর রোস্ট তৈরি করা হয়েছে। খোলা মাঠে জাকজমকপূর্ণ প্যান্ডেল তৈরি করা হয়েছে। রাত যতো গম্ভীর হচ্ছে, আসরের রং ততোটা উজ্জ্বল হচ্ছে। সর্বত্র মেহমানদের পদচারণা বিরাজ করছে।
