বল্ডউইন তখনই তিনজন উপদেষ্টা ঠিক করে ফেলেন। খাষা রওনা হয়ে যায়।
***
ব্যবসার পণ্য বোঝাই অনেকগুলো উটের একটি কাফেলা হবে আল মালিকুস সালিহর প্রাসাদের সামান্য দূরে এসে দাঁড়িয়ে যায়। কাফেলায় জনাকতক লোক। তন্মধ্যে তিনজন এ্যারাবিয়ান পোশাক পরিহিত। উটগুলোকে দাঁড় করিয়ে রেখে এই তিনজন প্রাসাদের দিকে হাঁটা দেয়। দারোয়ান তাদের থামিয়ে দেয়। তারা নিজেদের ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে আলোচনার জন্য আল-মালিকুস সালিহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছে বলে জানায়। বললো, আমরা হীরা এবং অন্য আরো মহা-মূল্যবান কিছু পণ্য নিয়ে এসেছি, যেগুলো রাজা-বাদশাগণ ক্রয় করে থাকেন। তাছাড়া আমরা আপনাদের রাজার সাথে হাবের সঙ্গে ব্যবসা করার ব্যাপারেও আলোচনা করবো। রক্ষী কমান্ডার ইবনে খতীব তাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে। আলাপ জমিয়ে তাদেরকে মুক্তমনে কথা বলার সুযোগ করে দেয়। সে লোকগুলোর চোখের সবুজ ও নীলাভ বর্ণ এবং মুখশ্রীটা গভীরভাবে পরখ করে দেখে। তার জানা আছে, ব্যবসা সংক্রান্ত আলাপ আলোচনা কখনো সরাসরি রাজার সঙ্গে হয় না।
ইবনে খতীব লোকগুলোকে সরিয়ে নিয়ে যায়।
আপনাদের আসল উদ্দেশ্যটা বলুন। ইবনে খতীব বললো।
বলেছি তো আমরা ব্যবসায়ী। পণ্য বিক্রি করতে এবং আপনাদের রাজার সঙ্গে আলোচনা করতে এসেছি। লোকগুলো বললো।
জেরুজালেম থেকে এসেছেন, নাকি আক্ৰা থেকে? ইবনে খতীব জিজ্ঞেস করে।
আমরা ব্যবসায়ী- একজন উত্তর দেয়- আমরা সব দেশেই যাই। জেরুজালেম-আক্ৰায়ও যাই। আপনার সন্দেহটা কী?
না, আমার কোন সন্দেহ নেই- ইবনে খতীব বললো- আমি নিশ্চিত, আমি আপনাদের তিনজনকেই চিনি। তবে আপনারা আমাকে চেনেন না। আমি আপনাদেরই লোক। আমার নাম ইবনে খতীব। এটা আমার আসল নাম নয়। হারমান আমাকে ভালো করেই জানেন।
ইবনে খতীব কিছু সাংকেতিক শব্দ উচ্চারণ করে, যেগুলো খৃস্টানদের গুপ্তচররা পরস্পর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য ব্যবহার করে থাকে। ব্যবসায়ীগণ- যারা মূলত বল্ডউইনের প্রেরিতে উপদেষ্টা মুচকি হাসে। তাদের বলে দেয় হয়েছিলো, আল-মালিকুস সালিহর দরবারে খৃস্টান গোয়েন্দা আছে। ইবনে খতীব নিশ্চিত করে দেয়, সে তাদেরই গুপ্তচর।
আপনারা কি সেই উদ্দেশ্যেই এসেছেন?- ইবনে খুতীব জিজ্ঞেস করে আমাকে বলতে সমস্যা নেই। অন্যথায় আপনাদের ভেতরে যেতে দেয়া হবে না।
হ্যাঁ- একজন অস্ফুট স্বরে বললো- সে উদ্দেশ্যেই। আচ্ছা, এই প্রাসাদে সালাহুদ্দীন আউইবীর চর আছে কি?
আছে- ইবনে খতীব উত্তর দেয় তবে তাদের উপর আমরা নজর রাখছি। আমরা আপনাদেরকে তাদের থেকে লুকিয়ে রাখবো। কিন্তু আপনাদের উদ্দেশ্য এবং তৎপরতা সম্পর্কে আমাকে পুরোপুরি অবহিত করতে হবে।
গোপন সাঙ্কেতিক শব্দ এবং বর্ণনাভঙ্গি থেকে আগন্তুক তিন খৃস্টান নিশ্চিত হয়ে যায়, ইবনে খতীব তাদেরই লোক। তারা ইবনে খতীবকে তাদের উদ্দেশ্য খোলাখুলি ব্যক্ত করে। ইবনে খতীব ভেতরে ঢুকে আল মালিকুস সালিহকে সংবাদ জানায় তিনজন ব্যবসায়ী আপনার সাক্ষাৎ কামনা করছে।
তুমি কি রক্ষী বাহিনীর নতুন কমান্ডার আল-মালিকুস সালিহ জিজ্ঞেস করেন।
জ্বি হুজুর। ইবনে খতীব জবাব দেয়।
বাড়ি কোথায়?
ইবনে খতীব একটি গ্রামের নাম বলে। আল-মালিকুস সালিহ বললেন আমি যখন তখন যার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারি না। ভবিষ্যতে খেয়াল রাখবে। আচ্ছা, তাদেরকে ভেতরে পাঠিয়ে দাও।
ইবনে খতীব বেরিয়ে গিয়ে আগন্তুকদের ভেতরে যেতে বলে এবং বিশেষ ভঙ্গিতে চোখ টিপে বলে দেয় অনেক সাবধানে কথা বলবেন।
***
এখন রাত। ঈশার নামাযের পর। ইবনে খতীব জামে মসজিদের ইমামের নিকট উপবিষ্ট। আরো দুজন লোক আছে।
এখন আর কোন সন্দেহ থাকলো না যে, আল-মালিকুস সালিহ পুনরায় খৃষ্টানদের ফাঁদে চলে আসছেন- ইবনে খতীব বললো- আমি আপনাকে প্রথমে একজন দূতের আগমন এবং উপহারের সংবাদ অবহিত করেছিলাম। সেসব খৃস্টানদের পক্ষ থেকে এসেছিলো। উপহারের মধ্যে একটি অপরূপা সুন্দরী মেয়েও ছিলো। আজ প্রমাণিত হয়ে গেলো, সেই দূত বল্ডউইনের পক্ষ থেকে এসেছিলো। আজ তিনজন ব্যবসায়ী আল মালিকুস সালিহর সঙ্গে ব্যবসা সংক্রান্ত আলোচনা করতে এসেছে। আপনি জানেন, আমি দুই বছর বায়তুল মুকাদ্দাসে খৃস্টানদের মাঝে অবস্থান করে গুপ্তচরবৃত্তি করেছি। আজ যে তিন ব্যক্তি এসেছে, তাদের চেহারা এবং বর্ণনাভঙ্গি প্রমাণ করছে, তারা যে এ্যারাবিয়ান পোশাক পরিধান করেছে, এটা তাদের ছদ্মবেশ। আমি তাদেরই লোক দাবি করে তাদের আসল রূপ দেখে নিয়েছি। বায়তুল মুকাদ্দাসের চরবৃত্তি আজ আমাকে অনেক উপকার করেছে। আমি তাদের সঙ্কেত জানি, বিশেষ ইঙ্গিতও বুঝি। মুহতারাম আলী বিন সুফিয়ানের প্রশিক্ষণের সুফল আজ আমি চোখে দেখেছি।
ইবনে খতীব সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গুপ্তচর। অল্প কদিন হলো হাবে এসেছে এবং আল-মালিকুস সালিহর এমন একজন নায়েব সালারের মাধ্যমে এখানকার রক্ষী বাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত হয়েছে, যিনি মূলত সুলতান আইউবীর সমর্থক। ইবনে খতীব আলী বিন সুফিয়ানের একজন বিচক্ষণ ও নির্ভীক গোয়েন্দা। বায়তুল মুকাদ্দাসে খৃস্টান ম্রাট ও সেনা অধিনায়কদের হেডকোয়ার্টারে দুবছর অবস্থান করে সফল গুপ্তচরবৃত্তি করে এসেছে।
