মিগনানা মারিউস মুবীকে বললো, সুলতানকে বলল, আমার দেহ থেকে মাথাটা বিচ্ছিন্ন করার আগে আমি তাকে আমার জীবন-কাহিনী শোনানোর একটু সময় চাই। অনুমতি পেয়ে মিগনানা মারিউস আগের রাতে তার কমাণ্ডার ও সঙ্গীদের যে আত্মকাহিনী শুনিয়েছিলো, সুলতান আইউবীকে আনুপুংখ তা শোনায়। সুলতান আইউবী তন্ময় হয়ে শ্রবণ করেন তার সেই করুণ কাহিনী। তারপর যীশুখৃষ্টের প্রতিকৃতির প্রতি, কুমারী মরিয়মের ছবির প্রতি এবং পাদ্রীদের মাধ্যম ছাড়া যে খোদার সঙ্গে কথা বলা যায় না, তার প্রতি তীব্র বিরাগ প্রকাশ করে সে বললো–আমার মৃত্যুর আগে আপনি আপনার খোদার একটি ঝলক দেখিয়ে দিন। আমার খোদা আমার পুত্র-কন্যাদের না খাইয়ে মেরে ফেলেছে, কেড়ে নিয়েছে আমার মায়ের দৃষ্টিশক্তি। মদ্যপ হায়েনাদের হাতে তুলে দিয়েছে আমার নিষ্পাপ সুন্দরী বোনকে। আর ত্রিশটি বছরের জন্য আমাকে নিক্ষেপ করেছে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। সেখান থেকে বের হয়ে এখন
আমি নিপতিত হয়েছি মৃত্যুর মুখে। মহামান্য সুলতান! আমার জীবন এখন। আপনার হাতে। আমায় সত্য খোদাকে একটু দেখিয়ে দিন, আমি তাঁর সমীপে ফরিয়াদ জানাবো, ন্যায় বিচার প্রার্থনা করবো।
সুলতান আইউবী বললেন–তোমার জীবন আমার হাতে নয়–আমার আল্লাহর হাতে। অন্যথায় এতক্ষণে থাকতে তুমি আমার জল্লাদের কজায়। যে খোদা তোমার থেকে আমার তরবারীকে ফিরিয়ে রেখেছেন, তার দর্শন লাভে আমি তোমায় ধন্য করবো। কিন্তু তোমাকে সে খোদার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। অন্যথায় তিনি তোমার আকুতি শুনবেন না। ন্যায় বিচারও পাবে না কোনদিন।
সুলতান আইউবী মিগনানা মারিউসের খঞ্জরটি ছুঁড়ে মারেন তার কোলে। নিজে তার কাছে গিয়ে পিঠটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে যান। মুবীকে উদ্দেশ করে বললেন–তাকে বলল, আমি আমার জীবনটা তার হাতে অর্পণ করছি। পিঠে খঞ্জর বিদ্ধ করে আমাকে হত্যা করতে বললো।–খঞ্জরটি হাতে তুলে নেয় মিগনানা মারিউস। নেড়ে-চড়ে গভীর দৃষ্টিতে দেখে অস্ত্রটি। দৃষ্টি বুলায় সুলতান আইউবীর পিঠে। তারপর উঠে ধীরে ধীরে চলে যায় সুলতান আইউবীর সামনে। তাঁকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত নিরীক্ষা করে দেখে। হাতটা কেঁপে উঠে মিগনানা মারিউসের। হাতের খঞ্জরটি রেখে দেয় সুলতানের পায়ের উপর। বসে পড়ে হাটু গেড়ে। সুলতানের ডান হাতটা টেনে ধরে চুমু খেয়ে কেঁদে উঠে হাউমাউ করে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মুবীকে বলে, জিজ্ঞেস করো, ইনি নিজেই কি খোদা, নাকি নিজের বুকের মধ্যে খোদাকে বেঁধে রেখেছেন। তার খোদাকে আমায় একটু দেখাতে বলল।
মিগনানা মারিউসের দু বাহু ধরে তুলে দাঁড় করান সুলতান আইউবী। বুকে জড়িয়ে নিয়ে নিজ হাতে মুছে দেন তার বিগলিত অশ্রুধারা।
***
মিগনানা মারিউস একজন বিভ্রান্ত মানুষ। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তার মনে ভরে দেয়া হয়েছিলো প্রচণ্ড ঘৃণা, ইসলামের বিরুদ্ধে ঢেলে দেয়া হয়েছিলো বিষ। কিন্তু অবস্থাবৈগুণ্যে সে নিজ ধর্মের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে উঠেছে। এক পর্যায়ে যে বিষয়টি তাকে এমনি এক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামিয়েছে, তা এক প্রকার পাগলামী ও তৃষ্ণা। সুলতান আইউবীর দৃষ্টিতে সে নিরপরাধ। কিন্তু তিনি লোকটাকে মুক্তি না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন।
পক্ষান্তরে মুবী রীতিমত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি মেয়ে, জঘন্য এক গুপ্তচর। যে সাতটি মেয়ে সুদানীদের নিকট, খৃষ্টানদের বার্তা নিয়ে এসেছিলো এবং সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে সুদানীদের বিদ্রোহে নামিয়েছিলো, মুবী তাদের একজন। মুবী ইসলামী সালতানাতের দুশমন, দেশের শত্রু। ইসলামী আইন তাকে ক্ষমা করে না।
মুবী ও মিগনানা মারিউসকে আলী বিন সুফিয়ানের হাতে সোপর্দ করেন সুলতান আইউবী। জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধ স্বীকার করেছে দুজন-ই। স্বীকার করেছে, তারা-ই রসদ কাফেলা লুট করেছে, বন্দী গুপ্তচর মেয়েদের তারা-ই মুক্ত করে নিয়েছে। রক্ষী বাহিনী এবং বালিয়ান ও তার সঙ্গীদেরও হত্যা করেছে তারা-ই।
জিজ্ঞাসাবাদ চলে একটানা তিনদিন। এ সময়ে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে যায় মিগনানা মারিউসের মস্তিষ্ক। সে সুলতান আইউবীকে জিজ্ঞেস করে–মুবীকে মুসলমান বানিয়ে আপনার হেরেমে স্থান দিয়েছেন কি? মানদীপ্ত দাস্তান
আজ সন্ধ্যায় আমি তোমার এ প্রশ্নের উত্তর দেবো। কিছুক্ষণ মৌন থেকে জবাব দেন সুলতান আইউবী ।
সন্ধ্যার সময় সুলতান আইউবী মিগনানা মারিউসকে সঙ্গে করে খানিক দূরে একস্থানে নিয়ে যান। সেখানে পাশাপাশি বিছানো লম্বা দুটি তক্তা। সাদা চাদর দিয়ে কি যেন ঢেকে রাখা আছে তার উপরে। একটি কোণ ধরে টান দিয়ে চাদরটি সরিয়ে ফেলেন সুলতান আইউবী। অকস্মাৎ ফ্যাকাশে হয়ে যায় মিগনানা মারিউসের চেহারা। চোখের সামনে একটি তক্তায় মুবীর লাশ, অপরটিতে তার সঙ্গীর মৃতদেহ। সুলতান আইউবী মুবীর মাথা ধরে টান দেন সামনের দিকে। ধড় থেকে আলাদা হয়ে সরে আসে মাথাটা। তারপর মিগনানা মারিউসের প্রতি তাকিয়ে বলেন, আমি মেয়েটাকে ক্ষমা করতে পারিনি। তাকে তুমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, যাতে রূপের ফাঁদে পড়ে আমি আমার ঈমান হারাই। কিন্তু তার দেহটা আমার কাছে মোটেও ভালো লাগেনি । এ একটি অপবিত্র দেহ। তবে হ্যাঁ, এখন মেয়েটাকে বেশ ভালো লাগছে। আমি দুআ করি, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন।
