কিন্তু আমাকে ক্ষমা করলেন কেন সুলতান! আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে মিগনানা মারিউস।
কারণ, তুমি হত্যা করতে এসেছিলে আমাকে। আর ও এসেছিলো আমার জাতির চরিত্র ধ্বংস করতে। তোমার সঙ্গীটিও বুঝে-শুনে পরিকল্পনা মোতাবেক এসেছিলো মানুষ খুন করতে। আর তুমি এসেছে, আমার রক্ত ঝরিয়ে আল্লাহর দর্শন লাভ করতে। জবাব দেন সুলতান আইউবী।
অল্প কদিন পর-ই সাইফুল্লাহয় পরিণত হয় মিগনানা মারিউস। পরবর্তীতে সুলতান আইউবীর দেহরক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করে সে। সুলতান আইউবীর মৃত্যুর পর সাইফুল্লাহ বাকী জীবনের সতেরটি বছর কাটিয়ে দেয় সুলতানের কবরের পার্শ্বে। আজ কেউ জানে না, সাইফুল্লাহর সমাধি কোথায়।
১.৪ আরেক বউ
আরেক বউ
কায়রো থেকে দেড়-দু মাইল দূরবর্তী একটি অঞ্চল। এখানকার একদিকে উঁচু-নীচু বালির টিলা। অপর তিনদিকে ধু-ধু বালুকা প্রান্তর।
আজ লাখো জনতার পদভারে মুখরিত-প্রকম্পিত এ অঞ্চলটি। চারদিক থেকে সমুদ্রের ঢেউয়ের ন্যায় এসে ভীড় জমিয়েছে অগণিত মানুষ। কেউ এসেছে উটে চড়ে, কেউ ঘোড়ায়, কেউ বা এসেছে গাধার পিঠে করে। পায়ে হেঁটে এসেছে অসংখ্য।
চার-পাঁচদিন ধরে মানুষ আসছে আর আসছে। সমবেত হচ্ছে বিশাল-বিস্তৃত এই মরুপ্রান্তরে। কায়রোর বাজারগুলোতে লোকের ভীড় বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে জৌলুস। সরাইখানাগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই।
দূর-দূরান্ত থেকে এরা এসেছে সরকারী এক ঘোষণা শুনে। মিসরী ফৌজের সামরিক মহড়া হবে এখানে। ঘোড়-সওয়ারী, শতর-সওয়ারী, ধাবমান উট-ঘোড়ার পিঠ থেকে তীরন্দাজি ইত্যাদি রণকৌশলের মহড়া প্রদর্শন করবে মিসরী সৈন্যরা ।
ঘোষণাটি প্রচারিত হয়েছে মিসরের গভর্নর সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর পক্ষ থেকে। তাঁর উদ্দেশ্য দুটি। এক, এতে সাধারণ মানুষ সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার উৎসাহ পাবে। দুই. এখনো যারা সামরিক শক্তিতে সুলতান আইউবীকে দুর্বল মনে করে, তাদের সংশয় দূর হবে।
এ সামরিক মহড়ার প্রতি জনসাধারণের এত আগ্রহ দেখে সুলতান আইউবী বেজায় খুশী। কিন্তু খানিকটা অস্থিরচিত্ত বলে মনে হচ্ছে আলী বিন সুফিয়ানকে। তিনি সুলতানের সামনে নিজের এ অস্থিরতার কথা ব্যক্ত করেছেন। জবাবে সুলতান আইউবী হাসিমুখে বললেন–আরে, মহড়ায় অংশগ্রহণকারী লোকদের সংখ্যা যদি এক লাখ হয়, তাহলে তাদের মধ্য থেকে আমরা পাঁচ হাজার সৈন্যও তো পাবো।
আমীরে মুহতারাম! আমি তো বিষয়টাকে ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি। আপনার ধারণা অনুযায়ী মহড়ায় অংশগ্রহণকারী লোকদের সংখ্যা যদি এক লাখ হয়, তবে তাতে গুপ্তচর থাকবে অন্তত এক হাজার। পাড়া গা থেকে অসংখ্য মহিলাও আসছে। তাদের বেশীর ভাগ-ই সুদানী ও শ্বেতাঙ্গী। ফলে খৃষ্টান মহিলারা তাদের মধ্যে লুকিয়ে যেতে পারবে অনায়াসেই। বললেন আলী বিন সুফিয়ান ।
এ সমস্যাটী আমিও ভালো করেই বুঝি। কিন্তু তুমি তো জানো, আমি যে মেলার আয়োজন করেছি, তা কতো জরুরী। তোমার গোয়েন্দা বিভাগকে তুমি আরো সতর্ক করো। বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
হ্যাঁ, তা আমি করবো অবশ্যই। এই মেলা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আমি আমার অস্থিরতার কথা আপনাকে পেরেশান করার জন্য বলিনি। এই মেলা কি বিপদ সঙ্গে নিয়ে আসছে, আমি আপনাকে তা-ই শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। কায়রোতে অস্থায়ী পতিতালয় খোলা হয়েছে, যা কিনা আমোদীদের দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে সারা রাত। অনেকে শহরের বাইরে তাঁবু গেড়েছে। আমার গুপ্তচররা আমাকে তথ্য দিয়েছে, তাঁবুগুলোর মধ্যে জুয়াড়ী এবং বেশ্যা মেয়েদের আস্তানাও, রয়েছে। আগামীকাল মেলার প্রথম দিন। নর্তকী-গায়িকারা মেলায় অংশ নেয়া নিরীহ লোকদের পকেট উজাড় করে নিচ্ছে। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
মেলা শেষ হয়ে গেলে এসব নোংড়ামীরও পরিসমাপ্তি ঘটবে। এখনি এসবের উপর আমি কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চাই না। মিসরের মানুষের বর্তমান নৈতিক অবস্থা ভালো নয়। নাচ-গান, বেশ্যাবৃত্তি দু-একদিনে নির্মূল করা, যায় না। এ মুহূর্তে আমার প্রয়োজন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী। আমার ফৌজের। সংখ্যা বাড়াতে হবে। তুমি তো জানো আলী! আমাদের সৈন্যের কতো প্রয়োজন। সেনাবাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বৈঠকে স্পষ্ট করেই আমি একথা ঘোষণা দিয়েছি। বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
আপনার বক্তব্যে আমার দ্বিমত নেই। তবে আমীরে মুহতারাম! আমার গুপ্তচরদের দৃষ্টিতে আমাদের সামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অর্ধেক-ই আমাদের ওফাদার নয়। আপনি ভালো করেই জানেন, এদের মধ্যে এমন কিছু লোকও আছে, যারা আপনাকে এই গদিতে দেখতে চায় না। আর অবশিষ্ট যারা আছে, তাদের মনও সুদানীদের সঙ্গে। তাদের প্রত্যেকের পিছনে আমি একজন করে গোয়েন্দা লাগিয়ে রেখেছি। তারা আমাকে এদের তৎপরতা ও গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত করছে। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
আচ্ছা, কারো কোন ভয়ঙ্কর তৎপরতা চোখে পড়েছে কি? কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন সুলতান আইউবী।
এরা আপন ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার কথা ভুলে গিয়ে রাতের আঁধারে বিভিন্ন সন্দেহজনক তাঁবুতে এবং পতিতালয়ে চলে যায়। দুজন কর্মকর্তা সম্পর্কে আমি এমন রিপোর্টও পেয়েছি যে, তারা নিজ ঘরে নর্তকী ডেকে এনে আসর বসায়। এ যাবত এর চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
