এতটুকু তথ্য পাওয়ার পর আলী বিন সুফিয়ান আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন । তিনি কক্ষের তালা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করেন। তল্লাশী চালিয়ে এমন কিছু বস্তু উদ্ধার করেন, যা তাঁর সন্দেহকে দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত করে।
সুলতান আইউবীর সঙ্গে তাদের সাক্ষাতের মতলব বুঝে ফেলেন আলী বিন সুফিয়ান। তিনি ফিরে এসে তাদের ঘোড়াগুলোকে নিরীক্ষা করে দেখে গিয়েছিলেন। বেশ উন্নত জাতের ঘোড়া। সরাইখানার কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করে আলী বিন সুফিয়ান জানতে পারেন, এরা তিনজন এসেছিলো উটে চড়ে। মেয়েটি। এই ঘোড়া দুটো সংগ্রহ করায়। বলেছিলো, আমাদের অতি উন্নত ও দ্রুতগামী দুটো ঘোড়ার প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষ আরো জানায়, মেয়েটির স্বামী বোবা। ভৃত্যটিও বোধ হয় কথা বলতে পারে না। এখানে এসে অবধি দুজনের কেউ কারো সঙ্গে কথা বলেনি। যা বলেছে সব মেয়েটিই বলেছে।
আলী বিন সুফিয়ান যখন ফিরে আসেন, ততক্ষণে বৈঠক শেষ হয়ে গেছে। সোজা চলে যান তিনি সুলতানের কাছে। তাঁকে আগন্তুকদের প্রসঙ্গে অবহিত করেন, তারা তাঁকে যা বলেছে তা-ও শোনান এবং ইতিমধ্যে সরাইখানা থেকে যেসব তথ্য এনেছেন, তা-ও সুলতানের কানে দেন। তাদের কক্ষ তল্লাশী করে সন্দেহজনক যা যা পেয়েছেন, তা-ও দেখান এবং নিজের অভিমত ব্যক্ত করেন যে, আমি নিশ্চিত, তারা আপনাকে হত্যা করতে এসেছে। সেজন্য-ই আপনার সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করা তাদের এতো প্রয়োজন। আমার প্রবল ধারণা, তারা পরিকল্পনা করে এসেছে, আপনাকে খুন করে বেরিয়ে যাবে এবং অন্যরা টের পেতে না পেতে দ্রুতগামী মোড়ায় চড়ে ততক্ষণে শহর ত্যাগ করে চলে যাবে। এ-ও হতে পারে, এই সুন্দরী মেয়েটির ফাঁদে ফেলে আপনার শয়নকক্ষে-ই তারা আপনাকে হত্যা করতে চায়।
ভাবনায় পড়ে গেলেন সুলতান। ক্ষণকাল মৌন থেকে বললেন–এখনই ওদেরকে গ্রেফতার করো না; আগে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।
আলী বিন সুফিয়ান তাদেরকে সুলতানের কক্ষে পাঠিয়ে দিলেন এবং নিজে দরজা ঘেঁষে বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর কমাণ্ডারকে ডেকে বললেন–ঐ ঘোড়া দুটোকে আমাদের ঘোড়ার সঙ্গে বেঁধে, যিনগুলো খুলে রাখ আর সঙ্গের লোকটাকে তোমাদের প্রহরায় বসিয়ে রাখো। তল্লাশী করে দেখো, লোকটার সঙ্গে অস্ত্র আছে কিনা। থাকলে নিয়ে নাও।
নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা হলো। মিগনানা মারিউসের সঙ্গী গ্রেফতার হলো, তল্লাশী নেয়া হলো। পোশাকের মধ্যে লুকানো একটি খঞ্জর পাওয়া গেলো। ঘোড়া দুটোও জব্দ করা হলো।
সুলতান আইউবী তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে হাত থেকে একটি মুদ্রা নীচে ফেলে দিয়ে নিশ্চিত হলেন যে, মেয়েটির সঙ্গের লোকটি বধির নয়। মুদ্ৰাপতনের শব্দ হওয়া মাত্র সে চকিতে পিছন ফিরে তাকিয়েছিলো ।
***
সুতান সালাহুদ্দীন আইউবী গম্ভীর কণ্ঠে মেয়েটিকে উদ্দেশ করে বললেন, তাকে বলল, আমার জীবন খৃষ্টানদের হাতে নয়–জীবন আমার খোদার হাতে।
মুবী তার নিজের ভাষায় মিগনানা মারিউসকে কথাটা বললে সে চমকিত হয়ে মুবীকে কী যেন বললো। মুৰী সুলতান আইউবীকে বললেন, ইনি জিজ্ঞেস করছেন, আপনারও কি খোদা আছেন, মুসলমানও কি খোদায় বিশ্বাস করে?
সুলতান আইউবী বললেন–তাকে বলো, মুসলমান সেই খোদাকে বিশ্বাস করে, যিনি নিজে সত্য এবং সত্যের অনুসারীদের ভালবাসেন। আমাকে কে বলে দিলো যে, তোমরা আমাকে হত্যা করতে এসেছো? বলেছেন আমার খোদা। তোমার খোদা যদি সত্য হতো, তাহলে তোমার খঞ্জর আমাকে শেষ করে ফেলতো। কিন্তু আমার খোদা তোমার হাতের খঞ্জরটি আমার হাতে এনে দিয়েছেন। এই বলে তিনি পার্শ্ব থেকে একটি তরবারী ও কিছু জিনিসপত্র বের করে তাদের দেখিয়ে বললেন–এ তরবারী ও এই জিনিসগুলো তোমাদের । সমুদ্রের ওপার থেকে তোমরা এগুলো নিয়ে এসেছিলে । কিন্তু তোমার পৌঁছার আগেই এগুলো আমার কাছে পৌঁছে গেছে।
বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে উঠে দাঁড়ায় মিগনানা মারিউস। চোখ দুটো কোঠর থেকে বেরিয়ে এসেছে তার। এ পর্যন্ত যতো কথা হয়েছে, সব হয়েছে মুবীর মাধ্যমে। এবার নিজেই কথা বলতে শুরু করে সে। খোদা সম্পর্কে সুলতান আইউবীর কথাগুলো শুনে আবেগ্নাপুত কণ্ঠে নিজের ভাষায় বলে ওঠে–এ লোকটিকে সঠিক বিশ্বাসের অনুসারী বলে মনে হয়। আমি তার জীবন নিতে এসেছিলাম; কিন্তু এখন আমার-ই জীবন তার হাতে। তাকে বলো, তোমার বুকে যে খোদা আছেন, তাকে আমাকে একটু দেখাও, আমি তার সেই খোদাকে এক নজর দেখতে চাই, যিনি বলে দিয়েছেন, আমরা তাকে হত্যা করতে এসেছি।
এত দীর্ঘ আলাপচারিতার সময় নেই সুলতান আইউবীর; নেই প্রয়োজনও। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুজনকে জল্লাদের হাতে তুলে দেয়াই ছিলো যুক্তিযুক্ত। কিন্তু লোকটাকে বিধ্বস্ত ও বিভ্রান্ত বলে মনে হলো তার কাছে। সুলতানের কাছে মনে হলো, লোকটা পাগল না হলেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাই মিগনানা মারিউসের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ কথা বলতে শুরু করেন তিনি।
ইত্যবসরে ভিতরে প্রবেশ করেন আলী বিন সুফিয়ান । সুলতান কি হালে আছেন, তিনি দেখতে এসেছেন। সুলতান আইউবী স্মিত হেসে বললেন–কোন অসুবিধা নেই আলী! তার থেকে আমি খঞ্জর নিয়ে নিয়েছি। প্রশান্তির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বের হয়ে যান আলী বিন সুফিয়ান।
