ইহুদীদের চিত্তহারী রূপসী এই মেয়েটি শুরুতেই আল-মালিকুস সালিহর তরুণ মস্তিষ্কটা কজা করে ফেলে। বার্তার প্রতিটি শব্দ যাদুর ন্যায় তার হৃদয়ে গেঁথে যায়। তিনি দূতের বিশ্রাম ও খাওয়ার এমন আয়োজনের নির্দেশ প্রদান করেন, যেনো বল্ডউইন নিজেই এসে হাজির হয়েছেন। তারপর তিনি নিজেকে মেয়েটির হাতে সপে দেন। আল-মালিকুস সালিহ এর চেয়েও অধিক রূপসী মেয়ে দেখেছেন। কিন্তু এই মেয়েটি অপূর্ব ভাবভঙ্গি আর মুচকি হাসি তার রূপে অবিশ্বাস্য এক যাদুকরি ক্রিয়া সৃষ্টি করে রেখেছে।
আস-সালিহ অন্ধ হয়ে যান।
রাতে যখন মেয়েটি আল-মালিকুস সালিহর শয়নকক্ষে প্রবেশ করে, তখন তার হাতে পিপা ও পেয়ালা। এগুলোও তার সঙ্গে উপহার হিসেবে আসা। মেয়েটি তাকে বললো, এগুলো ফ্রান্সের মদ, যা কিনা শুধু সম্রাটদের জন্যই প্রস্তুত হয়ে থাকে।
আপনার হেরেমে কিছুই তো নেই- মেয়েটি বললো- আপনি কি প্রয়োজন মনে করেন না আপনার হেরেমটা সজ্জিত হোক?
আমার হেরেমের জন্য তুমি একাই যথেষ্ঠ। আস-সালিহ বললেন। আমি আমার ন্যায় আরো মেয়েদের দ্বারা হেরেম ভরে দেবো- মেয়েটি মদের পেয়ালাটা আস-সালিহর হাতে দিতে দিতে বললো- এটা কি সত্য, সালাহুদ্দীন আইউবীর একজনই স্ত্রী এবং তিনি কাউকে হেরেমে নারী রাখার অনুমতি দেন না?
হ্যা- আস-সালিহ জবাব দেন- এটাও ঠিক, তিনি মদপানের অনুমতি দেন না।
আপনি তাহলে জানেন না তার একটি গোপন হেরেম আছে, যাতে অসাধারণ সুন্দরী মেয়েরা আছে। তাদের মধ্যে মুসলমান আছে, ইহুদী খৃষ্টানও আছে। মেয়েটি বললো।
ঝাড়বাতির রঙিন ও হাল্কা মিষ্টি আলো আর ফ্রান্সের মদের নেশার মধ্যে এই মেয়েটি আপাদমস্তক যাদুর রূপ ধারণ করে আস-সালিহকে প্রভাবিত করে চলেছে। ক্ষণিকের মধ্যেই তিনি মেয়েটির রেশমী চুলের শিকলে বন্দী হয়ে যান।
রাত পোহাবার পর চোখ মেলে আল-মালিকুস সালিহ মেয়েটিকে বললেন- এখানে আমার এক বোন আছে। তুমি তার মুখোমুখি হবে না। বিবাহ ছাড়া কোন মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া সে পছন্দ করে না। তোমার আমার এই সম্পর্ক সে মেনে নেবে না। সুযোগ মতো আমি তাকে বলে দেবো, তুমি মুসলমান এবং আমার সঙ্গে বিয়ে বসতে এসেছে।
বোনকে মুক্ত করে দেন না কেন?- মেয়েটি বললো- তাকে পুরুষদের। সঙ্গে উঠা-বসা করতে দিন। সে রাজকন্যা। আপনি রাজা। সালাহুদ্দীন আইউবী আপনার পদমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছেন। আমরা আপনার বোনকে আলাদা একটা রাজ্য দিয়ে রাণী বানিয়ে দেবো।
আল-মালিকুস সালিহ স্বপ্নের রাজা হয়ে যান।
***
কী সংবাদ এনেছো? বল্ডউইন মদমাতাল কণ্ঠে দূতকে জিজ্ঞেস করেন।
আমি কখনো ব্যর্থ হয়ে ফিরেছি নাকি? দূত জবাব দেয়। সে আল মালিকুস সালিহর প্রাসাদে চার দিনের দীর্ঘ সফর শেষে এইমাত্র এসে পৌঁছেছে। সে বললো- মুসলমানদের উপর সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আপনারা অযথা জীবন ও সম্পদহানি করছেন। একটি মেয়েই তো মুসলমানদের শাসকদের হাত থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে আনতে যথেষ্ঠ।
মেয়ে নয়- বল্ডউইন বললেন- মুসলমানকে যদি তুমি একটি মেয়ের শুধু কল্পনা দাও, তাতেই সে নিজের নেরু-বদ ভুলে গিয়ে সেই কল্পনার গোলাম হয়ে যায়। এবার বলো, তুমি কী করে এসেছো?
তিনি লিখিত উত্তর দেননি- দূত বললো- সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দা ও কমান্ডো সেনারা সর্বত্র গিজ গিজ করছে। লিখিত উত্তয় দিলে পাছে ধরা পড়ে যায় কিনা। তিনি আপনার সব বক্তব্য মেনে নিয়েছেন। তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীর সমর্থক নন। তবে সন্ত্রস্ত এবং আইউবীর মোকাবেলায় নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করছেন। আপনার বার্তা তাকে অনেক সাহস যুগিয়েছে। তিনি বলেছেন, আপনি আপনার উপদেষ্টা পাঠিয়ে দিন, তবে তাকে যেতে হবে বণিকের বেশে। ওখানকার সকলকে বলবে, সে উচ্চ পর্যায়ে ব্যবসা সংক্রান্ত আলোচনা করতে এসেছে।
তার মনে কোন সন্দেহ নেই তো? বল্ডউইন দূতকে জিজ্ঞেস করেন।
আপনি তাকে ইহুদীদের যে উপহারটা প্রদান করেছেন, সে সন্দেহ করার কোন অবকাশ থাকতে দেয়নি- দূত জবাব দেয়- আমি সেখানে চারদিন অবস্থান করেছি। এ সময়টায় আমি, তার সালারদের ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছি, কথাবার্তা বলেছি ও মতবিনিময় করেছি। তাদের অনেকে আইউবীর সমর্থক। আমি তাদের দুজনকে হাত করে নিয়েছি। তাদেরকে আমি বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছি এবং লুকিয়ে লুকিয়ে উপহারও দিয়েছি। ওখানে সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দাও আছে। সে কারণে কোন কথাই গোপন রাখা সম্ভব হয় না। তথাপি আল-মালিকুস সালিহকে আপনারই লোক মনে করুন। যে দুজন সালারকে হাত করে এসেছি, মেয়েটির সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। সে তার দায়িত্ব পালন করবে। আপনি তাড়াতাড়ি উপদেষ্টা পাঠিয়ে দিন।
এই দূত শুধু দূতই নয়; মানুষের মনস্তত্ব নিয়ে খেলা করার দক্ষ ওস্তাদ। সে বললো- সালাহুদ্দীন আইউবী তার অফিসার-কর্মকর্তা ও দেশের জনগণকে উপদেশ দিয়ে থাকেন, রাজত্বের স্বপ্ন-মোহ, সম্পদ ও নারী এই তিনটি বিষয় মানুষের ঈমানকে নিঃশেষ করে দেয়। এই তিনটি বস্তু যখন একজন বিজ্ঞ আলেমেরও সম্মুখে এসে হাজির হয়, তারও ঈমানের পা উপড়ে যায়। এটা মানবীয় দুর্বলতা। তখন তাকে ওয়াজ শুনিয়েও কোন লাভ হয় না।
