***
১৯৮০ সালে মসুলের গবর্নর সাইফুদ্দীন মৃত্যুবরণ করেন। তার স্থলে ইযযুদ্দীন মাসউদ শাসন ক্ষমতা হাতে নেন। একই বছর সুলতান আইউবীর ভাই শামসুদ্দৌলা তুরান শাহ ইস্কান্দারিয়ায় মারা যান। সুলতান মিসরে চলে যান। সেখানকার পরিস্থিতি খারাপ হতে চলেছে। তিনি নিজ বাহিনীকে স্বীয় ভাই আল-আদিলের কমান্ডে পেছনে রেখে যান।
এখন ১১৮১ সাল। বল্ডউইন তার বাহিনীর সেনা সংখ্যা পূরণ করে নিয়েছেন। তাদের প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করেছেন। তিনি নিজ বাহিনীকে সুলতান আইউবীর কৌশল মোতাবেক সামরিক মহড়াও করিয়ে নিয়েছেন। এখন তিনি পরবর্তী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু তার আগে তাকে আল মালিকুস সালিহকে হাতে নেয়া আবশ্যক।
আল-মালিকুস সালিহ এখন কিশোর নয়- পরিণত যুক। রাষ্ট্র পরিচালনা বুঝতে শুরু করেছেন। তার উপদেষ্টা ও সালারগণ হচ্ছেন তার দুর্বলতা, যারা:তলে তলে খৃস্টানদের সহযোগী-সমর্থক। সুলতান আইউবীয় সঙ্গে তিনি সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন বটে; কিন্তু রাজত্বের পোকা এখনো মাথা থেকে বের হয়নি। এখনো তিনি স্বাধীন শাসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
একদিন তার নিকট সংবাদ আসে, খৃস্টান সম্রাট বল্ডউইনের দূত এসেছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাকে ভেতরে নিয়ে আসার অনুমতি প্রদান করেন। এই দূত নাশকতার ওস্তাদ এবং মানবীয় দুর্বলতা বিষয়ে ওয়াকিবহাল ব্যক্তি। সে আল-মালিকুস সালিহকে জানায়, আপনার জন্য কিছু উপহারও নিয়ে এসেছি।
কী উপহার? মহা মূল্যবান হীরা-জহরত ও স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি একটি বাক্স। দুটি তরবারী। পঁচিশটি উন্নত জাতের ঘোড়া। আর? আর একটি মেয়ে।
আস-সালিহ বাইরে গিয়ে ঘোড়াগুলো দেখেন। হীরা-জহরত স্বর্ণমুদ্রাগুলোও দেখেন। কিন্তু যে উপহারটির উপর তার চোখ আটকে যায়, সেটি হলো মেয়ে।
আস-সালিহ অনেকক্ষণ যাবত মেয়েটির প্রতি তাকিয়ে থাকেন। তার উঠতি যৌবনের সবগুলো দুর্বলতা একটি যাদুর রূপ ধারণ করে বিবেকের উপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলে। তিনি হাড়ে হাড়ে অনুভব করছেন, তিনি যৌবনে পদার্পণ করেছেন এবং তিনি টগবগে এক যুবক।
দূত আস-সালিহর হাতে বল্ডউইনের একটি বার্তা প্রদান করে। পত্ৰখানা আরবীতে লেখা। কিন্তু খৃষ্টান সম্রাটের পত্রের প্রতি তার কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। মেয়েটি তার কল্পনার চেয়েও বেশি রূপসী।
দূত পত্ৰখানা খুলে অন্য চিন্তায় বিভোর আস-সালিহর সম্মুখে রেখে দেয়। এবার তার চৈতন্য ফিরে আসে। তিনি পত্রখানা পাঠ করেন। বল্ডউইন লিখেছেন–
প্রিয় হালবের গবর্নর আলমালিকুস সালিহ! আমি দূত ও উপহারের পরিবর্তে বাহিনী প্রেরণ করতে পারতাম। কিন্তু আমি আপনার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ প্রয়োজন অনুভব করি না। আপনি আমার বন্ধু ও সন্তানতুল্য। আপনি যখন কিশোর ছিলেন এবং সালাহুদ্দীন আইউবী আপনার সালতানাতের উপর দখল প্রতিষ্ঠিত করতে এসেছিলেন, তখন আমরা আপনাকে সাহায্য করেছিলাম। আমি আক্ষেপে ফেটে যাচ্ছি, গোমস্তগীন ও সাইফুদ্দীন আপনাকে বন্ধুত্বের ধোঁকায় রেখেছে। আমরাও তাদের প্রতারণা ধরতে পারিনি। আপনি যদি একা হতেন, তাহলে আপনার বাহিনী পরাজিত হতো না। আপনি দেখেছেন, গোমস্তগীন কত বড় ধোকাবাজ ছিলো, যার ফলে আপনি তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। সাইফুদ্দীনও আপনাকে বরাবরই ধোকার মধ্যে রেখেছে। সে হাবের উপর দখল প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছিলো। আমরা তাকে তার প্রত্যয়-পরিকল্পনা থেকে বিরত রেখেছি।….
অবশেষে আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট পরাজয়বরণ করেছেন, যা আপনাকে তার আনুগত্য মেনে নিতে বাধ্য করেছে। আপনি এতোই অসহায় হয়ে পড়লেন যে, আপনি ইবনে লাইনের উপর আক্রমণ করার জন্য তাকে সৈন্য দিতে বাধ্য হলেন। আমি ভালো করেই জানি, আপনার ন্যায় একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন যোদ্ধা এই অপমান সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু আপনি তো সঙ্গীহীন ছিলেন। আমি নিজেও যুদ্ধ-বিগ্রহ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। অন্যথায় আমি আপনার সাহায্যে ধেয়ে আসতাম। এখন আমি আপনাকে নিয়ে ভাববার সুযোগ পেয়েছি। আপনার ভুলে গেলে চলবে না, সালাহুদ্দীন আইউবী আপনাকে এমন এক স্বায়ত্তশাসন দান করেছেন, যার অর্থ দাসত্ব। তিনি আপনাকে ধীরে ধীরে গোলামে পরিণত করছেন। তিনি ইযযুদ্দীনের সাহায্যার্থে আর্মেনীয়দের পরাজিত করেছেন এবং তাকে নিজের অনুকম্পার শিকলে বেঁধে ফেলেছেন। সমস্ত ছোট ছোট আমীর তার আনুগত্য মেনে নিয়েছে। এখন তার দৃষ্টি আপনি ছাড়াও মসুল ও হাররানের উপর নিবদ্ধ।…
ভেবে দেখুন, তিনি আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মিসর থেকে সৈন্য নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি তালখালেদের উপর গিয়ে আক্রমণ করলেন এবং আপনার থেকেও সৈন্য নিলেন। এখন আবার মিসর ফিরে গেছেন। তার এই যাওয়ার রহস্য কী? গোয়েন্দারা আমাদেরকে অবহিত করেছে, তিনি বিপুল পরিমাণ ধন-ভাণ্ডার নিয়ে গেছেন। সেগুলো কায়রোতে রেখে আবার ফিরে আসবেন। বলুন তো, আপনাকে তিনি কী দিয়েছেন? আপনার বাহিনীকে তিনি গনীমতের সম্পদের কতো অংশ দিয়েছেন? তিনি জেরুজালেম অভিমুখে কেন অগ্রযাত্রা করলেন না? আপনি কি জানেন, তিনি আর্মেনীয়দের কয়েকটি মেয়ে সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন?…
আমি জানি, এসব প্রশ্ন আপনার মস্তিষ্ককে আউলা-ঝাউলা করে দেবে। আপনার নিকট সালাহুদ্দীন আইউবীর চরিত্র এবং তার নিয়তের প্রকৃতি স্পষ্ট হয়ে যাবে। আপনার সঙ্গে আমাদের কোন শত্রুতা নেই। আমরা এই ভূখণ্ডে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত করতে এসেছি। আমরা এও জানি, সুলতান আইউবী আমাদেরকে এখান থেকে উৎখাত করে ইউরোপের উপর আক্রমণ করার এবং নিজের সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটানোর ভাবনা ভাবছেন। তিনি আপনাকে এবং অন্যান্য আমীরদেরকে নিজের থলের মুদ্রা জ্ঞান করেন। আপনি যদি নিজের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা না করেন, তাহলে আপনার নাম-চিহ্ন মুছে যাবে। এখানে আমরা ইউরোপের প্রতিরক্ষার জন্য যুদ্ধ করছি। আমার বক্তব্য যদি আপনার বুঝে এসে থাকে, তাহলে আমাকে উত্তর দিন। আমি আপনাকে উপদেষ্টা পাঠিয়ে দেবো, যে আপনার আর্থিক ও সামরিক প্রয়োজনের পরিসংখ্যান নিয়ে আমাকে অবহিত করবে। আমি যে ঘোড়াগুলো প্রেরণ করেছি, এগুলো আপনার জন্য উপহার। আপনার ফৌজের জন্য আমি এমন হাজার হাজার ঘোড়া দিতে পারি। ইউরোপ থেকে আমি নতুন অস্ত্র চেয়ে পাঠিয়েছি। তাও আপনাকে দিয়ে দেবো। আপনি সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করবেন না। উপরে উপরে তার অনুগত থেকেই আপনি নিজের প্রতিরক্ষা শক্ত করুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি।
