মা দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছেন। মেয়ে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে অশ্বারোহী কাফেলার সকলের সম্মুখে চলে যাচ্ছে। কাফেলার গতি তার আদেশে উত্তরোত্তর বেড়ে চলছে।
রোজি খাতুন দরজা বন্ধ করে দেন। চোখ তার অশ্রু-আবিল। খাদেমা ভেতরে প্রবেশ করলে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন- আহা, মেয়েটা না খেয়েই চলে গেলো।
***
মা-মেয়ের এই সাক্ষাতের ঘটনা ১১৮১ সালের নবেম্বর মাসের। সুলতান আইউবীর ইবনে লাউনকে পরাজিত করে তারই বাহিনীর সৈন্যদের দ্বারা তার দুর্গকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া এর দুবছর আগের ঘটনা। দুর্গের ধ্বংসাবশেষগুলো নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছিলো। তার পরপরই সুলতান আইউবী খৃষ্টান সম্রাট বল্ডউইনকে পরাজিত করেছিলেন। কৃতিত্বটা ছিলো মূলত একজন মুসলিম গোয়েন্দার। তারই সময়োচিত রিপোর্টের ভিত্তিতে সুলতান আইউবী এই সফল অভিযান পরিচালনা করেন।
এটি বল্ডউইনের দ্বিতীয় পরাজয়। এর আগে তিনি সুলতান আইউবীর ভাই আল-আদিলের হাতে এমনিভাবে পরাস্ত হয়েছিলেন। এবার আইউবী তার কোমর ভেঙ্গে দিয়ে বসিয়ে দিয়েছেন। এখন আর তার উঠে দাঁড়াবার শক্তিটুকু অবশিষ্ট নেই।
কিন্তু ওখানে তিনি খৃস্টান সম্রাট একা তো নন। ইসলামী দুনিয়ায় একাধিক খৃস্টান বাহিনীর উপস্থিতি বিদ্যমান। তারা অন্তরের দিক থেকে একে অপরের প্রতিপক্ষ। কিন্তু সকলের শত্রু অভিন্ন। এ কারণে তারা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করতেন। সকলেরই কামনা, কীভাবে একাকী অধিকতর অঞ্চলে দখল প্রতিষ্ঠিত করা যায়। এ লক্ষ্যেই বল্ডউইন একাকী আল-আদিল ও সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তার সৈন্য ও উপকরণের অভাব নেই। অস্ত্রও আছে বিস্তর। আছে বিপুলসংখ্যক শক্তিশালী উট-ঘোড়া। কিন্তু তারপরও হেরে গেলেন।
বিক্ষিপ্ত সৈনিকদেরকে একত্রিত করতে কিছু সময় লেগে যায় বল্ডউইনের। ইতিমধ্যে সংবাদ পান, সুলতান আইউবী ইবনে লাউনকে পরাজিত করে তার রাজত্ব ও সামরিক শক্তি দুর্বল করে দিয়েছেন। ইবনে লাউন আর্মেনীয় নাগরিক। আর্মেনীয়রা খৃস্টানদের মিত্র। তাদের পরাজয় খৃস্টানদের হৃদয়ে বেশ আঘাত হানে। সেই সঙ্গে বল্ডউইন আরো সংবাদ পান, ইবনে লাউনের রাজ্য তালখালেদ ও তার দুর্গ কারাহেসার আক্রমণে সুলতান আইউবীর ফৌজৈর সঙ্গে আল-মালিকুস সালিহর বাহিনীও ছিলো। এটি বল্ডউইনের জন্য একটি অতিরিক্ত দুঃসংবাদ। বল্ডউইন অস্থির হয়ে ওঠেন। তিনি এবং অন্যান্য খৃস্টান সম্রাটগণ অবশ্য জানেন, সুলতান আইউবী আল-মালিকুস সালিহকে পরাজিত করে তাকে নিজের অধীন করে নিয়েছেন। কিন্তু আল-মালিকুস সালিহ চুক্তি অনুযায়ী কাজ করবেন, তা তাদের ভাবনায় ছিলো না। না করাটা আস-সালিহর চরিত্র। তাদের ধারণা ছিলো, লোকটা উপরে উপরে সুলতান আইউবীর অনুগত হয়ে গেলেও খৃস্টানদের সঙ্গে বাঁধা গাঁটছড়া অটুট থাকবে। কিন্তু তাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো।
বল্ডউইন জেরুজালেমে খৃস্টান সম্রাটদের হেডকোয়ার্টারে ফিরে যান। খৃস্টানদের আরেকটি হেডকোয়ার্টার আছে আক্ৰায়।
আপনারা কি জানেন, মুসলমানরা আবারও ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে? বল্ডউইন কমফারেন্সে খৃস্টান সম্রাট ও সেনানায়কদের উদ্দেশে বললেন- আল মালিকুস সালিহকে আপনারা আপনাদের জোটভুক্ত মিত্র মনে করছেন আর তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীকে তার বাহিনী প্রদান করেছেন।
ইবনে লাউনের পরাজয় আমাদেরই পরাজয়- ফিলিপ অগাস্টাস বললেন- আপনারা যদি ওৎ পেতে বসে থাকার পরিবর্তে ইবনে লাউনের সাহায্যে এগিয়ে যেতেন এবং পেছন থেকে সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর আক্রমণ করতেন, তাহলে পরাজয় আইউবীরই হতো।
দেখুন, সালাহুদ্দীন আইউবীর অগ্রযাত্রার গতি পরিবর্তন করে তালখালেদ অভিমুখে মুখ করার সংবাদ যেমন আপনারা কেউ জানতেন না, তেমনি আমিও জানতে পারিনি।
এটা আপনার গোয়েন্দা ব্যবস্থার দুর্বলতা- গাই অফ লুজিনান বললেন- আমরা অনেক দূরে ছিলাম। খোঁজ-খবর নেয়া এবং গোয়েন্দা ব্যবস্থা সম্পন্ন করার দায়িত্ব আপনার ছিলো। আপনি নিকটে ছিলেন। আইউবীর বাহিনী আপনার সন্নিকট দিয়ে অতিক্রম করেছে। কিন্তু আপনি টেরও পেলেন না। আপনি ওঁৎ পেতে চুপটি মেরে বসে রইলেন।
আমি জানতাম না, আমার সঙ্গে একজন মুসলমান আছে- বল্ডউইন বললেন- আমি তাকে গুরুত্বহীন লোক মনে করতাম। সে আমার কয়েদী ছিলো। পরে পালিয়ে গিয়ে সুলতান আইউবীকে আমার তথ্য প্রদান করে। সে যা হোক এখন আমাদের ভাবনার বিষয়, আইউবী- আস-সালিহর ঐক্য কীভাবে ভেঙ্গে দেয়া যায়।
আপনি কি মুসলমানদের দুর্বলতাগুলো ভুলে গেছেন নাকি উপেক্ষা করছেন?- এক খৃস্টান সম্রাট বললেন- আমরা যখন আস-সালিহর উপদেষ্টা, আমীর এবং সালারদেরকে উপঢৌকন ও বিলাস উপকরণ দিয়ে আমাদের হাতে এনেছিলাম, আস-সালিহ তখন কিশোর ছিলো। এখন যুবক হয়েছে। এখন তাকে হাতে আনা অধিকতর সহজ। আমরা আমাদের অস্ত্র ব্যবহার করি এবং বিশেষ উপহারটা দূত মারফত পাঠিয়ে দিই। আপনি যদি সামরিক শক্তির মাধ্যমে তাকে অনুগত বানাতে মনস্থ করে থাকেন, তাহলে এই ধারণা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিন। সুলতান আইউবীর বাহিনী এই অঞ্চলে উপস্থিত আছে। আপনারা যদি হাব আক্রমণ করেন, তাহলে সুলতান আইউবী তার সমগ্র বাহিনীর কমান্ড নিজ হাতে তুলে নেবেন। তিনি যদি আমাদের উপর জয়ী নাও হতে পারেন, তবু আমাদের এই ক্ষতিটা অবশ্যই হবে যে, আস-সালিহ আমাদের হাত থেকে আজীবনের জন্য বেরিয়ে যাবে। ফিলিস্তীন আমাদেরকে রক্ষা করতেই হবে। আমরা আমাদের বাহিনীকে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছি এবং লক্ষ্য রাখছি, সালাহুদ্দীন আইউবী কোন্দিকে মুখ করেন এবং তার পরিকল্পনা কী। এমতাবস্থায় আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পারবো না। আপনি নিজের মতো করে আস-সালিহকে হাত করে নিন।
