ভাইয়া নিজের পাপের ক্ষমা প্রার্থনা করছেন মা। শামসুন্নিছা কান্না বিজড়িত কণ্ঠে চীৎকার করে বললো।
এও এক প্রতারণা মনে হচ্ছে- রোজি খাতুন বললেন- আমি জানি, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী হালব দখল করে নেয়ার পর সে তোমাকে এজাজ দুর্গ ভিক্ষা চাওয়ার জন্য আইউবীর নিকট পাঠিয়েছিলো। মহান সুলতান তোমাকে নিজের কন্যা মনে করে তোমাদেরকে দুৰ্গটা দান করেছেন। সে আগেই নিজে সুলতানের দরবারে আসলো না কেন? পরাজিত হওয়ার পর তো তাকে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হওয়ার প্রয়োজন ছিলো। নিজে এসে তরবারীটা আইউবীর পায়ে রাখা দরকার ছিলো। আইউবী তার শত্রু ছিলেন না। সে তো তাকে মামা ডাকতো। কিভু আসল ব্যাপার হচ্ছে, গাদ্দারদের ঈমানদারদের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার সাহস হয়। যারা নিজেদের ঈমান নীলাম করে দেয়, তারা কাপুরুষ ও প্রতারক হয়ে থাকে। আমার পুত্র মালিকুস সালিহ গাদ্দার, কাপুরুষ, প্রতারক।
এতো পাষাণ হয়ো না মা। শামসুন্নিছা মিনতির সুরে বললো। এই গৃহযুদ্ধে যতো মুসলমান শহীদ হয়েছে, তাদের মায়েরা অন্তরে পাথর বেঁধে রেখেছে- রোজি খাতুন বললেন- তারা বলতে লজ্জাবোধ করছে, তারা যে সন্তানদেরকে ইসলামের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রেরণ করেছিলো, তারা আপসে যুদ্ধ করে মারা গেছে। সেই মায়েদের দায়িত্ব কে বহন করবে? আমার ছেলে!
তখন তো তিনি অনেক ছোট ছিলেন মা।
তাহলে আমার কাছেই থাকতো- রোজি খাতুন বললেন- আমি যা বলি শুনতো। যখনই তার শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছিলো, আমার নিকট ফিরে আসতো। হাবকে সুলতান আইউবীর হাতে অর্পণ করে দিতে। তাতে সে করেনি।… তুমি চলে যাও। ইসলামের মায়েরা যদি মমতার জালে আটকা পড়ে যায়, তাহলে আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার মতো কেউ থাকবে না। আমি মমতাকে গলাটিপে মেরে ফেলেছি। আমার দেহ শহীদ হয়ে গেছে।
মায়েরা কি গর্ভজাত কন্যাদেরকে এভাবে বিদায় করে দেয়! বলো মা, বলো! শামসুন্নিছা বললো।
তুমি আমার কাছে থাকো- রোজি খাতুন মেয়েকে বললেন- তবে শর্ত থাকবে, আমার সামনে কখনো ভাইয়ের নাম উচ্চারণ করবে না।
এটা সম্ভব নয় মা! এটা সম্ভব নয়- শামসুন্নিছা বললো- যে, ভাইটি তার বোনকে অপত্য স্নেহে লালন-পালন করে বড় করেছে, সে তার নাম মুখে নেবে না কেন মা!
তাহলে সেই ভাইয়ের কাছেই চলে যাও- রোজি খাতুন বললেন তুমি খৃস্টানদের ছায়ায় বড় হয়েছে। এখানকার মেয়েদের দেখো, তারা ইসলামের জন্য জান কুরবান করতে প্রস্তুত। আমি যখন তাদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করি, তাদের রাগ-ধমক দেই, তখন ভয় লাগে কেউ বলে বসে কিনা, নিজের মেয়ের খবর নেই, আমাদেরকে ধমকায়। তুমি কি এই নোংরা বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারবে যে, আমার ছেলে খৃস্টানদের সঙ্গে মদপান করে এবং তার হেরেমে খৃস্টান ও ইহুদী মেয়েরা আছে?
শামসুন্নিছা মস্তক অবনত করে ফেলে। অভিযোগটা সে অস্বীকার করতে পারলো না।
যাও, হাত-মুখ ধুয়ে মায়ের ঘরে কিছু খেয়ে চলে যাও- রোজি খাতুন বললেন- ফিরে গিয়ে যদি আমার ছেলেটাকে জীবিত পাও, তাহলে বলবে, মা তোমার দুধের দাবি ক্ষমা করে দিয়েছেন; কিন্তু শহীদের রক্তের দাবি ক্ষমা করেননি। তাকে বলবে, তোমার বুকে যদি খৃষ্টানদের তীর বিদ্ধ হতো আর তুমি সালতানাতে ইসলামিয়ার পতাকাতলে জীবন কুরবান করে দিতে, তাহলে তোমার মা উড়ে এসে পৌঁছে যেতেন এবং তোমার মৃতদেহ বুকে করে দামেশক নিয়ে যেতেন এবং গর্বভরে বলতেন, এই আমার শহীদ পুত্রের মাজার। এখন আমি কী বলবো? মায়ের গর্ব তো পুত্র কেরে নিয়ে গেছে।
শামসুন্নিছা অনেকক্ষণ যাবত নীরব দাঁড়িয়ে থাকে। তার মাথাটা অবনত। পরক্ষণে যখন সে মাথা উঠায়, ততোক্ষণে উভয় গণ্ডদেশে ধূলির যে স্তর জমাট হয়েছিলো, তার মধ্যদিয়ে অশ্রুর নদীর ন্যায় রাস্তা হয়ে গেছে। হঠাৎ মেয়েটি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে হাঁটু গেড়ে বসে মায়ের আঁচল ধরে চুমো খেয়ে চোখের সঙ্গে লাগায়। সচেতন মেয়ে শামসুন্নিছা মাকে বুকে জড়িয়ে ধরেনি। কারণ, মায়ের নিষেধ আছে, খৃস্টানদের ছায়ায় লালিত মেয়ে যেনো তার কাছে না ঘেঁষে। শামসুন্নিছা খৃষ্টানদের ছায়ায় লালিত মেয়েই বটে। এই মহাসত্য শান্নিছা অস্বীকার করতে পারে না। শামসুন্নিছা উঠে দাঁড়িয়ে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বললো- তিনি আমার ভাই, আমার শৈশবের সঙ্গী। তিনি বোধ হয় বাঁচবেন না। আমি তার কাফন দাফনের পর আপনার কাছে ফিরে আসবো মা।
কী জন্য? রোজি খাতুন নিরতিশয় কঠিন ও তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন।
আমি এমন একটি পুত্রসন্তান জন্ম দেবো, যে আল্লাহর পথে শহীদ হবে- শামসুন্নিছা বললো- আপনার পুত্রের বিনিময়ে আমি এমন একটি পুত্রের জন্ম দেবো, যার কবরের উপর স্বস্নেহে হাত বুলিয়ে আপনি গর্বের সাথে বলবেন, এটি আমার নাতির মাজার।… আমি ফিরে আসবো মা। আমি ফিরে আসবো। আপনি আমার বিয়ের ব্যবস্থা করে রাখুন। আমি চোখ বন্ধ করে এসেছিলাম। এখন চোখ খুলে ফিরে যাচ্ছি। আমাকে অনুমতি দিন, আমি নিজ হাতে ভাইয়ার কাফন পরাতে পারি।… বিদায় মা, বিদায়।
শামসুন্নিছা পা টিপে টিপে ধীরে ধীরে স্বভয়ে ঘরে প্রবেশ করেছিলো। এখন বের হয়ে গেলো বুক ফুলিয়ে, ঘাড় উঁচু করে লম্বা পদক্ষেপে।
রোজি খাতুন মেয়ের প্রতি তাকিয়ে থাকেন। তিনি উঠে দরজার দিকে এগিয়ে যান। তাঁর মুখ থেকে চীৎকার বেরিয়ে এলো মেয়েটি আমার। তিনি দরজাটা সামান্য ফঁক করে বাইরের দিকে তাকান। বাইরে থেকে শামসুন্নিছার কণ্ঠ ভেসে আসে। মেয়েটি গর্জন করে বলছে- ইবনে আজর। সকল আরোহীকে ডাকো। জলদি করো। হাল্ব অভিমুখে রওনা হও। তাড়াতাড়ি করো।
