এখন সুলতান আইউবী উক্ত অঞ্চলেরই কোন এক স্থানে ছাউনি ফেলে অবস্থান করছেন। খৃষ্টানরা তাদের গুপ্তচরদের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করছে, আইউবীর পরবর্তী অগ্রযাত্রা কোন্ দিকে হবে।
***
নবেম্বর ১১৮১ মোতাবেক রজব ৫৭৭ হিজরীর ঘটনা। আল-মালিকুস সালিহর বোন শামসুন্নিসা হাল্ব থেকে দামেশকে মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে। মেয়েটি যখন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তার বয়স ছিলো ৮-৯ বছর। এখন সে পনের বছরের তরুণী। আল-মালিকুস সালিহর বয়স সতের-আঠার। শামসুন্নিসার সঙ্গে রক্ষী সেনারা আছে। খাদেমা নূরুদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রীকে সংবাদটি জানায়। কিন্তু তিনি মেয়েকে সাক্ষাৎ দিতে অস্বীকৃতি জানান। খাদেমাও নারী। সে রোজি খাতুনকে মত করার জন্য বললো- মেয়েটা এতোদূর থেকে এতোদিন পর আসলো। আপনি তাকে ভেতরে ডেকে এনে বলে দিন, সে যেনো চলে যায়। স্নেহ বলতে একটা কথা তো আছে খালাম্মা!
আমার স্নেহ মরে গেছে। রোজি খাতুন বললেন।
এমন সময় এক তরুণী রোজি খাতুনের নামায কক্ষে প্রবেশ করে। মেয়েটার মাথার চুল, মুখমণ্ডল ও পরিধানের পোশাকে ধূলির স্তর জমে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, দীর্ঘ সফর করে এসেছে। রোজি খাতুন তার প্রতি দৃষ্টিপাত করে জিজ্ঞেস করেন- তুমি কে?
মেয়েটি নীরব দাঁড়িয়ে আছে। খাদেমা এক ধারে সরে গেছে। রোজি খাতুন ধীরে ধীরে সামনের দিকে অগ্রসর হন। তার বাহুদ্বয় আপনা-আপনি প্রসারিত হচ্ছে। মুখ থেকে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এলো- তুমি আমার কন্যা, আমার শামসুন্নিছা। রোজি খাতুন ধীর পদবিক্ষেপে সম্মুখপানে অগ্রসর হচ্ছেন আর ক্ষীণ গলায় বলছেন- তুমি এতো বড় হয়ে গেছে! শামসুন্নিসা দরজা ঘেঁষে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে।
এখন মা-মেয়ের মধ্যখানে ব্যবধান দু-তিন পা। রোজি খাতুন থেমে যান। তার প্রসারিত বাহু গুটিয়ে আসে। এতোক্ষণ ঠোঁটে যে মুচকি হাসির আভা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, তা উবে গেছে। দু-তিন পা অগ্রসর হওয়ার স্থলে দু-তিন পা পিছিয়ে যান। হাসি হাসি দাঁতগুলো রাগে কড়মড় করতে শুরু করে। মায়ের হৃদয়সাগরে মমতার যে ঢেউ উত্থিত হতে শুরু করেছিলো, তা মিলিয়ে যায়।
তুমি এখানে কেন এসেছো? মা চাপা অথচ রোষান্বিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন।
মা!- শামসুন্নিছা দুবাহু প্রসারিত করে সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বললো- আমি আপনার সঙ্গে মিলিত হতে এসেছি। আমি বারো দিনের পথ তিন দিনে অতিক্রম করে এসেছি মা!
কিন্তু কেন এসেছো? রোজি খাতুন উচ্চকণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন এবং বললেন- কাছে এসো না, দূরে দাঁড়িয়ে উত্তর দাও। আমি ক্রুসেডারদের ছায়ায় লালিত একটি মেয়েকে আমার কাছে ঘেঁষতে দিতে পারি না।
মা! আগে আমার দুটো কথা শোনো- শামসুন্নিছা অতিশয় মিনতির স্বরে বললো- আমার গায়ের ধুলোবালি দেখো।
এই ধুলা থেকে আমি মুজাহিদীনে ইসলামের রক্তের ঘ্রাণ পাচ্ছি রোজি খাতুন বললেন- সেই মুজাহিদদের রক্ত, যারা আমার পুত্রের বাহিনীর হাতে শহীদ হয়েছে। এটা গৃহযুদ্ধের রক্ত।
মা!- শামসুন্নিছা সম্মুখে এগিয়ে এসে মায়ের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে। শামসুন্নিছা কাঁদছে আর বলছে- ভাইয়া মৃত্যুশয্যায় শায়িত মা। হয়তো এতোক্ষণে মারা গেছে। তিনি মা মা করে আপনাকে ডাকছেন। ভাইয়া বড় কষ্টে আছেন মা। তিনি আমাকে আপনাকে নিতে পাঠিয়েছেন। বলেছেন, তুমি মাকে নিয়ে আসো। আমি তার থেকে দুধের দাবি আর গুনাহ মাফ করাবো।
আমি তার দুধের দাবি ক্ষমা করতে পারি- রোজি খাতুন বললেন- কিন্তু তার সেই খুন কে ক্ষমা করবে, যা সে মুসলমানের সন্তান হয়ে মুসলমানদের ঝরিয়েছে? মা স্বীয় পুত্রের গাদ্দারীর অপরাধ ক্ষমা করতে পারেন না।
ভাইয়া আপনার একমাত্র পুত্র মা- শামসুন্নিছা বললো- তিনি আপনার মহান স্বামীর একমাত্র স্মৃতি।
কিন্তু সে পিতার মহত্ত্ব-মর্যাদাকে ক্রুসেডারদের পায়ের তলে নিক্ষেপ করেছে। রোজি খাতুন বললেন।
তিনি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে সন্ধি করে নিয়েছেন শামসুন্নিছা বললো- এখন আর তাদের আপসে কোন যুদ্ধ হবে না।
তুমি কি আমাকে কসম খেয়ে বলতে পারবে, তার কাছে কোন খৃস্টান নেই- রোজি খাতুন গর্জে ওঠে মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন- তার হেরেমে কি কোন ইহুদী-খৃস্টান মেয়ে নেই? এখন সে আঠার বছর বয়সের যুবক। তার নীচের ঘোড়াও অনুভব করতে পারে পিঠের আরোহী একজন পুরুষ। তুমি যদি আমাকে নিশ্চয়তা দিতে পারো, আমার পুত্রের দরবার থেকে খৃস্টানদের অশুভ ছায়া সরে গেছে, তাহলে বারো দিনের যে দূরত্ব তুমি তিন দিনে অতিক্রম করে এসেছো, সে পথ আমি দেড় দিনে অতিক্রম করে আমার মুমূর্ষ পুত্রের নিকট পৌঁছে যাবো।
ভাইয়ার এখন কোন নারীর প্রতি চোখ তুলে তাকাবারও শক্তি নেই মা- শামসুন্নিছা বললো- আপনি তার জন্য দুআ করুন।
আমি দুআ করবো না- রোজি খাতুন বললেন- অভিশাপও দেবো না।
আবেগে রোজি খাতুনের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। তবু থামছেন না। থামতে পারছেন না। বললেন- আমি কাউকে বদ দুআ দেই না। কিন্তু কোন মায়ের আহ মহান আল্লাহ উপেক্ষা করেন না। আমার ছেলে ক্ষমতার লোভে খৃস্টানদের ক্রীড়নক হয়ে হাজার হাজার মুসলমানকে শহীদ করেছে। কিয়ামতের দিন আমি তাদের মা, স্ত্রী ও কন্যাদের সম্মুখে লজ্জিত হতে পারবো না। আমার হৃদয় উজাড়করা মমতা তাদের জন্য নিবেদিত। খুনী পুত্রের প্রতি আমার একবিন্দু মমতা নেই।
