এক রাতেই বিদ্রোহী বাহিনীর পরাজয় ঘটে। রাতেই আল-মালিকুস সালিহ, তার আমীর-অনুচরবৃন্দ, দু-তিনজন সালার এবং বিদ্রোহী বাহিনী দামেশক থেকে পালিয়ে হাল্ব চলে যায়। আল-মালিকুস সালিহ স্বীয় বোন শামসুন্নিসাকেও সঙ্গে নিয়ে যান। যেসব আমীর ও দুর্গপতি স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, তন্মধ্যে হাররানের দুর্গপতি গোমস্তগীন এবং মসুলের আমীর সাইফুদ্দীন অন্যতম।
আল-মালিকুস সালিহ হাবকে নিজের রাজধানী বানিয়ে নেন। পরে এই নগরীটি তার, গোমস্তগীন ও সাইফুদ্দীনের সম্মিলিত বাহিনীর হেডকোয়ার্টারে পরিণত হয়ে যায়। সকলের নিকট খৃস্টান উপদেষ্টা এসে পড়ে। তাদের সঙ্গে মদ আর এমন নারীও আসে, যারা শুধু অপরূপা সুন্দরীই নয়- গুপ্তচরবৃত্তি এবং চিন্তা-চেতনা বিধ্বংসের ওস্তাদও বটে। খৃস্টানরা তাদেরকে সহযোগিতা প্রদান করে প্রোপাগান্ডা মিশনকে এমনভাবে ব্যবহার করে যে, তাদের অন্তরে সুলতান আইউবীর বিরোধিতা ষোল কলায় পূর্ণ হয়ে যায়।
সুলতান নূরুউদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রী দামেক থেকে যান। সেখানে তিনি মেয়েদের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন। বয়সে তিনি এখনও বার্ধক্যে উপনীত হননি। দুটি মাত্র সন্তান। দুজনই অপ্রাপ্তবয়স্ক। দুজনই তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তিনি বুকে পাথর বেঁধে নেন এবং এই বলে সান্ত্বনা নেন যে, স্বামীর সঙ্গে আমার সন্তানরাও মরে গেছে। কিন্তু মাঝে মধ্যে মমতা উথলে ওঠছে এবং চোখে অশ্রু নেমে আসছে। মায়ের মন বলে কথা।
সুলতান আইউবী হাব ও হাররানে গোয়েন্দা প্রেরণ করেছেন। তারা ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর রিপোর্ট প্রেরণ করছে। ওখানে খৃস্টানরা জোরে-শোরে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
সুলতান আইউবী মিসর থেকে ফৌজ তলব করেন। দামেশকের বাহিনীর বৃহৎ অংশটি তাঁর সঙ্গে। তিনি প্রথমে বিদ্রোহী আমীরদের নিকট বার্তা প্রেরণ করেন, তোমরা ইসলামের মর্যাদার খাতিরে খৃস্টানদের হাতে খেলো না এবং তাদের সঙ্গ দিও না। এসো, আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে তাদেরকে ইসলামী দুনিয়া থেকে উৎখাত করে ইউরোপ দখল করে নেই। কিন্তু ঈমান নিলামকারী আমীরগণ সুলতান আইউবীর দূতদের লাঞ্ছিত করে বিদায় দেন। গোমস্তগীন সুলতান আইউবীর দুজন দূতকে বন্দি করে ফেলেন।
সুলতান আইউবী তাদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি হাবের উদ্দেশ্যে রওনা হন। রোজি খাতুন তাঁকে বিদায় জানানোর জন্য দামেশক থেকে অনেক দূর পর্যন্ত তার সঙ্গে যান। বিদায় জানিয়ে ফিরে আসার সময় বললেন- আমার পুত্র যদি আপনার তীর তরবারী-বর্শার আয়ত্ত্বে এসে পড়ে, তাহলে ভুলে যাবেন ও আমার সন্তান। ও বিশ্বাসঘাতক। ওর লাশ পাওয়া গেলে দাফন করবেন না। শৃগাল শকুনদের জন্য ফেলে রাখবেন।
মায়ের চোখ শুষ্ক। কিন্তু সুলতান আইউবীর দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়াতে শুরু করে। রোজি খাতুন বয়সে সুলতানের ছোট। তিনি সুলতানের প্রতি পরম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে বিগলিত কণ্ঠে বললেন- আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান করুন।
রোজি খাতুন অনেকক্ষণ পর্যন্ত বাহিনীর যাওয়া প্রত্যক্ষ করতে থাকেন।
এখান থেকেই মুসলমানদের গৃহযুদ্ধের দীর্ঘ ও খুনরাঙা যুগের সূচনা হয়। সুলতান আইউবীকে মুসলিম আমীরদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত যুদ্ধ লড়তে হয়েছিলো, আপনারা সে কাহিনী বিস্তারিত পড়েছেন। খৃস্টানদের পরিকল্পনা ছিলো, তারা নিজেরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে তাদেরকে আপসে লড়াবে এবং ঐক্যের সঙ্গে তাদের সামরিক শক্তিটাকেও নিঃশেষ করে দেবে। পাশাপাশি তারা হাসান ইবনে সাব্বাহর ঘাতকদের দ্বারা বহুবার সুলতান আইউবীর উপর সংহারী আক্রমণও করিয়েছিলো। প্রতিবারই আল্লাহ ইসলামের এই অতন্দ্র প্রহরীটাকে রক্ষা করেছেন।
তিন-চার বছর যাবত মুসলমানরা আপসে যুদ্ধ করে করে মরতে থাকে। মহান আল্লাহ প্রতিটি যুদ্ধে সুলতান আইউবীকে বিজয় দান করেন। এক যুদ্ধে নূরুদ্দীন জঙ্গীর স্ত্রীর প্রেরিত কয়েকশ মেয়েও যুদ্ধ করেছিলো এবং যুদ্ধের পট-পরিবর্তন করে দিয়েছিলো। কিন্তু সুলতান আইউবী কঠোর নির্দেশ জারি করে দেন, আগামীতে কোন নারী রণাঙ্গনে আসবে না।
সর্বশেষ যুদ্ধে সুলতান আইউবী হাল্ব পর্যন্ত পৌঁছে যান এবং হাবের প্রতিরক্ষা দুর্গ এজাজ দখল করে নেন। আল-মালিকুস সালিহ স্বীয় বোন শামসুন্নিসাকে কয়েকজন দূতের সঙ্গে সন্ধির প্রতিশ্রুতিসহ সুলতান আইউবীর নিকট প্রেরণ করেন এবং বোনের মাধ্যমে সুলতানের নিকট আর্জি পেশ করান, এজাজ দুৰ্গটা আমাদেরকে ফিরিয়ে দিন। সুলতান আইউবী জঙ্গীর মেয়েটিকে স্বস্নেহে গলায় জড়িয়ে ধরেন এবং আবেদন মঞ্জুর করে নেন। তিনি এজাজ দুর্গটি জঙ্গীর মেয়েকে দান করেন। কতিপয় শর্ত আরোপ করে আল-মালিকুস সালিহকে হাবের আধা স্বায়ত্বশাসন প্রদান করেন। তন্মধ্যে একটি শর্ত ছিলো, সুলতান আইউবীর যখন সৈন্যের প্রয়োজন হবে, আল-মালিকুস সালিহ তাঁকে সৈন্য দেবেন। গোমস্তগীনকে আল-মালিকুস সালিহ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে হত্যা করেন। বাদ বাকি আমীরগণ সুলতান আইউবীর আনুগত্য মেনে নেন।
সুলতান আইউবী কারাহেসারের শাসক ইবনে লাউনকে পরাজিত করেছিলেন। সে কাহিনী আপনারা পাঠ করেছেন। সে যুদ্ধে চুক্তি অনুযায়ী হাল্ব থেকেও ফৌজ এসেছিলো। তার অব্যবহিত পরই সুলতান আইউবী খৃস্টান সম্রাট বল্ডউইনকে- যিনি সুলতানের উপর আক্রমণ করতে এসেছিলেন অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। বল্ডউইন অল্পের জন্য বন্দি হওয়া থেকে রক্ষা পেয়ে যান এবং তার বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে।
