তাবরিজকে সুলতানের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়া হলো। সুলতান আইউবী ধৈর্যের সাথে তার কাহিনী শোনেন এবং তার থেকে বল্ডউইনের ফৌজ ও তার পরিকল্পনার তথ্য জ্ঞাত হন। তিনি তৎক্ষণাৎ তার সালারদের তলব করে তাদেরকে জরুরী নির্দেশনা প্রদান করেন।
সম্রাট বল্ডউইন তৃতীয় রাতে সুলতান আইউবীর ছাউনি এলাকায় আক্রমণ করেন। কিন্তু সেখানে তাঁবুর সারি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। তাঁবুতে সৈন্য নেই। হঠাৎ আকাশে সলিতাওয়ালা তীরের স্ফুলিঙ্গ উড়তে এবং তাঁবুগুলোর উপর এসে পড়তে শুরু করে। তাঁবুগুলোতে শুকনো ঘাস ভরে তাতে তরল দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। নিক্ষিপ্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গগুলো এসে নিক্ষিপ্ত হওয়ামাত্র ভয়ানক অগ্নিশিখায় পরিণত হয়ে যায়।
এই অবস্থা দেখে বল্ডউইন আক্রমণের জন্য আরো সৈন্য প্রেরণ করেন। তাদের উপর ডান ও বাঁ-দিক থেকে তীর এসে আঘাত হানতে শুরু করে। রাত পোহাতে না পোহাতে বল্ডউইনের উপত্যকায় লুকিয়ে থাকা সৈন্যদের উপর আক্রমণ হয়ে যায়। এবার বল্ডউইন বুঝতে পারে, সে সুলতান আইউবীর উপর অসতর্ক অবস্থায় আক্রমণ চালাতে পারেনি। বরং সে নিজেই আইউবীর ফাঁদে এসে পড়েছে।
বল্ডউইন একটি উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে নিজ বাহিনীর পরিণতি দেখতে শুরু করেন। পেছন থেকে শাঁ করে তার প্রতি একটা তীর ধেয়ে আসে। কিন্তু তীরটি তার দুজন দেহরক্ষীর গায়ে বিদ্ধ হয়। তিনি পালিয়ে নীচে নেমে এলে সম্মুখ থেকে সুলতান আইউবীর সৈনিকরা ছুটে আসে।
বল্ডউইন একটি সরু পথে পালিয়ে যায়। ১১৭৯ সালের অক্টোবর মাসের এই যুদ্ধে বল্ডউইন বন্দী হওয়া থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়ে যান। সুলতান আইউবী রামাল্লার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়ে নেন। তার বাহিনীর মনোবল ও আত্মবিশ্বাস চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আর তাবরিজ ও দিরা ইতিহাসের আঁধারে হারিয়ে যায়।
৭.২ আল-মালিকুস সালিহ
আল–মালিকুস সালিহ
জোহর নামায আদায় করে জায়নামাযে বসে তাসবীহ ঝপ করছেন রোজি খাতুন। খাদেমা কক্ষের দরজায় দাঁড়িয়ে সমাহিত কণ্ঠে বললো খালাম্মা! আপনার মেয়ে শামসুন্নিসা আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছে। সঙ্গে আরো লোক আছে।
রোজি খাতুন প্রথমে অপলক নেত্রে খাদেমার প্রতি তাকিয়ে থাকেন। পরক্ষণে তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াতে শুরু করে।
মা-মেয়ের মাঝে যখন বিরহ ঘটে, তখন মেয়ের বয়স ছিলো ৯ বছর। এখন পনের। সংবাদ পাওয়া মাত্র মায়ের কই আমার বাছা বলে ছুটে বেরিয়ে এসে কলজেছেঁড়া ধন মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরার কথা ছিলো। কিন্তু মা কঠিন গলায় ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন- ও কেন এসেছে?
আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে খালাম্মা!- খাদেমা বললো- বোধ হয় ও আপনার কোলে ফিরে এসেছে।
রোজি খাতুন চুপ হয়ে যান। খাদেমা অপেক্ষমান দাঁড়িয়ে আছে। খানিক পর মাথা তুলে বললেন- ওকে ফিরে যেতে বলো। বলো, বিশ্বাসঘাতক ভাইয়ের নিকট চলে যাক। আমার চোখের সামনে আসবার দুঃসাহস যেনো ও না দেখায়।
আপনার ছেলে যখন ওকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন, ও তো তখন অবুঝ ছিলো মাত্র ৯ বছর- খাদেমা বললো- অবুঝ মেয়েটি কি জানতো ভাই তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।
আমি জানি, ওকে তার ভাই পাঠিয়েছে- রোজি খাতুন বললেন- কেন পাঠিয়েছে তাও বলতে পারি। আমার পুত্র গাদ্দার এবং আত্মমর্যাদাহীন। আমি মেয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবো না।
রোজি খাতুন নূরুদ্দীন জঙ্গী মরহুমের স্ত্রী। আপনারা পড়ে এসেছেন, ইসলামের অতন্দ্র প্রহরী নূরুদ্দীন জঙ্গীর মৃত্যুর পর তার আমীর-উজির ও কতিপয় আমলা তাঁর পুত্র আল-মালিকুস সালিহকে রাজার আসনে আসীন করেন। তখন তার বয়স ছিলো এগার বছর। শামসুন্নিসা তার ছোট বোন। বয়স ৯ বছর। নূরুদ্দীন জঙ্গীর শাসনকালের কতিপয় আমীর ও দুর্গপতি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাগদাদের খেলাফত থেকে মুক্ত হয়ে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। সুলতান আইউবী সে সময়ে মিসর ছিলেন। জঙ্গী মরহুম ও সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ ছিলো, তারা তাদেরকে ভোগ-বিলাসিতা করতে দিচ্ছেন না। জীবনের সকল সুখ-আহ্লাদ পরিত্যাগ করে খৃস্টানদের প্রত্যয় পরিকল্পনাকে চুরমার করে ফিলিস্তীনকে মুক্ত করা এবং সালতানাতে ইসলামিয়ার সম্প্রসারণ ঘটানোই তাদের একমাত্র ব্রত। নূরুদ্দীন জঙ্গী ও সুলতান আইউবীর এই নিরানন্দ জিহাদী জীবনধারাকে বরণ করে নিতে পারেননি তাদের এই বিলাসী আমীর-উজীরগণ।
বিদ্রোহী এই আমীরদের উপর ক্রুসেডারদের প্রভাব ছিলো বিস্তর। সে কারণে ভোগ-বিলাসিতা তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য চরিত্রে পরিণত হয়ে যায়। খৃস্টানদের প্রেরিত নারী আর সোনা-মাণিক্য তাদের ঈমান ক্রয় করে ফেলেছিলো। নূরুদ্দীন জঙ্গী মৃত্যুবরণ করেছেন। এবার এই লোকগুলো সুলতার আইউবীকে পরাজিত করে তার শাসনের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন। তারা জঙ্গী মরহুমের অর্ধেক ফৌজকে বিদ্রোহী বানিয়ে ফেলেছেন। সংবাদ পেয়ে সুলতান আইউবী মাত্র সাতশ অশ্বারোহী নিয়ে দামেশক প্রবেশ করেন। জনগণ তাঁকে স্বাগত জানায়। নগরীর বিচারক তাঁকে ফটকের চাবি দিয়ে দেন। কিন্তু দামেশকের ফৌজের বিদ্রোহী অংশটি তাঁর মোকাবেলা করে। এটা ছিলো গৃহযুদ্ধ। নূরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী সুলতান আইউবীর সমর্থক ছিলেন। তিনি তাঁর স্বামীর অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে চাচ্ছিলেন।
