আমার কাছে মেয়ের অভাব নেই- বল্ডউইন বললেন- কিন্তু তুমিই প্রথম নারী, যে আমার হৃদয়টাকে জয় করে নিয়েছে। তুমি কাছে থাকলে আমার আত্মা শান্তি পায়। তুমি আরো কদিন আমার কাছে থাকো।
দিরা তার সম্রাটদের ভালভাবেই জানে। বল্ডউইনের উদ্দেশ্য বুঝা তার পক্ষে কঠিন নয়। সে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেয়, বিষয়টা যদি আত্মার শান্তি হয়ে থাকে, তাহলে আমি তা সেই মুসলিম যুবকের নিকট থেকেই লাভ করছি, যার গোটা পরিবারকে হত্যা করিয়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে ফিরছি। জানি না তার পরিজনকে হত্যা করিয়ে এবং সেই সংবাদ তার থেকে গোপন রেখে আমি যে পাপ করেছি, আমার হৃদয় আমার থেকে তার প্রায়শ্চিত্ত কীভাবে আদায় করবে।
তোমারও আত্মা আছে?- বল্ডউইন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন তোমার মন আছে? মুসলিম আমীরদের সঙ্গে রাত্রি যাপনকারী নারী পাপের প্রায়শ্চিত্ত আদায় করারও ভাবনা ভাবতে পারে?
আপনার সম্মুখে আমি শুধু একটি দেহ- একটি মনোহরী শরীর- দিরা বললো- আর যখন আমি তাবরিজের সম্মুখে থাকি, তখন আমি আত্মা হয়ে যাই- প্রেমপিয়াসী আত্মা।
বল্ডউইন রাজা। তিনি রাজাদের ন্যায় আদেশ করলেন- তুমি আমার সঙ্গেই থাকবে। দারোয়ানকে ডেকে বললেন- আমাদের তাঁবুতে যে মুসলমানটা থাকে, তার পায়ে শিকল পরিয়ে দাও।
বল্ডউইন যখন মাসাফার পাহাড়ী অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছে, তখন তাবরিজ শিকলপরা কয়েদী। আর দিরা বন্দী শিকল ছাড়া। রক্ষীদের নজরে দুজনই বন্দী।
বল্ডউইন বাহিনীর বিন্যাসে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অবসর হয়ে তিনি দিরাকে মানসিকভাবে যন্ত্রণা দিতে শুরু করেন। তাবরিজকে উপস্থিত করিয়ে তিনি দিরাকে তার সম্মুখে দাঁড় করিয়ে তাবরিজকে বেত্রাঘাত করতে আদেশ করেন। তাবরিজের পিঠে হান্টারের আঘাত পড়লে চীৎকার বের হচ্ছে দিরার মুখ থেকে। বল্ডউইন দিরাকে বললেন- তুমি আমার থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না। আমি তোমাকে আমার মুখের উপর কথা বলার শাস্তি দিচ্ছি।
তাবরিজ বোবা ও বধির হয়ে গেছে যেনো। তার কিছুই বুঝে আসছে না, এসব কী ঘটছে। তার বিশ্বাস হচ্ছে না, এই শাস্তি তাকে দিরা দেয়াচ্ছে। দিরার চীৎকার-আহাজারিতে সে বুঝে ফেলেছে, মেয়েটিও মজলুম।
তাবরিজ অত্যাচার সহ্য করতে থাকে।
কিন্তু একদিন দিরার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। মেয়েটি বল্ডউইনের নিকট গিয়ে তার পা ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করে বললো- আপনি যতোদিন বলবেন এবং যেভাবে বলবেন, আমি আপনার সঙ্গে থাকবো। আমি তাবরিজকে ত্যাগ করেছি।
বল্ডউইনের নির্দেশে তাবরিজের হাত-পায়ের শিকল খুলে দেয়া হলো এবং তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলো। দিরা সম্রাট বল্ডউইনের একাকীত্বের রওনকে পরিণত হয়ে যায়।
দিন কয়েক পর এক রাতে বল্ডউইন মদ ও দিরার রূপে মত্ত হয়ে দিরাকে বললো- আমি যদি সালাহুদ্দীন আইউবীকে তাবরিজের ন্যায় শিকল পরিয়ে তোমার সম্মুখে এনে দাঁড় করাই, তবে কি স্বীকার করবে না আমি এতো বৃদ্ধ নই, যতোটা তুমি মনে করছো?
আমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে বলবো, আমি রাজা বল্ডউইনের রাণী দিরা বললো- তোমার তরবারীটা আমার পায়ে রেখে দাও।
দুটা দিন অপেক্ষা করো। আমি কাজটা করে দেখাবো। বল্ডউইন বললেন।
মনে হয় পারবেন না। দিরা বললো।
তুমি দেখোনি, সালাহুদ্দীন আইউবী আমার পায়ের উপর ছাউনি ফেলে রেখেছে- বল্ডউইন বললেন- পরশু ভোরের আঁধারে আমরা তার উপর আক্রমণ চালাবো। কী ঘটছে, তা জানতে না জানতেই তিনি আমার কয়েদী হয়ে যাবেন। এখানে আমার উপস্থিতির কথা তার জানা নেই।
***
তাবরিজ এখন মুক্ত। বল্ডউইন তার ব্যাপারে এখনো কোন সিদ্ধান্ত নেননি। এখন সে রাজ অতিথি। সকালে দিরা তার তাঁবুতে প্রবেশ করে। তাবরিজ হঠাৎ চমকে ওঠে কথা বলতে শুরু করে।
কথা বলার সময় নেই- দিরা বললো- আজ আমি তোমার উপকারের প্রতিদান এবং তোমার ভালোবাসার উত্তর দিতে চাই। আমি যা বলি, তা ই করবে। আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে না। আমি অনেক পাপ করেছি। তোমার হেস ধ্বংস হয়ে গেছে। তুমি ওখানে যাবে না। তোমার জন্মভূমিটা এখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ। তোমার পরিবারের লোকদের হাড়ি ছাড়া আর কিছুই এখন অবশিষ্ট নেই।
দিরা তাবরিজকে এই ধ্বংসযজ্ঞের এবং তাকে রক্ষা করার বৃত্তান্ত শুনিয়ে বললো- তোমাদেরকে বল্ডউইনের বাহিনী থেকে প্রতিশোধ নিতে হবে। আজ এই পাহাড়ী অঞ্চল থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাও, যেনো কেউ দেখতে না পায়। সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট যাও এবং তাঁকে বলো, খৃস্টান বাহিনী তার মাথার উপর বসে আছে এবং পরশু তারা আক্রমণ করবে।
দিরা তাবরিজকে বল্ডউইনের আক্রমণের পরিকল্পনা ব্যক্ত করে বললো এখন আর আমার দিকে দৃষ্টিপাত করো না। অন্যথায় এখান থেকে নড়তে পারবে না। আমি তোমাকে বলেছিলাম, আমাদের গন্তব্য আলাদা। আজ আমরা উভয়ে আপন আপন গন্তব্য পেয়ে গেছি।
দিরা যদি হেমসের ধ্বংসলীলা এবং গণহত্যার কাহিনী না শোনাতো, তাহলে তাবরিজ ওখান থেকে এতো তাড়াতাড়ি উঠতো না। তাবরিজ চোখে অশ্রু নিয়ে দিরা থেকে আলাদা হয়ে যায়।
রাতের আঁধার নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাবরিজ চুপি চুপি হাঁটতে শুরু করে এবং সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে পার্বত্য এলাকা থেকে বেরিয়ে যায়।
তাবরিজ সুলতান আইউবীর বাহিনীর ছাউনিতে এসে বললো, আমি সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে চাই।
