ভোরে সূর্যোদয়ের আগে ইবনে লাউনকে সুলতান আইউবীর সম্মুখে দাঁড় করানো হয়। সুলতান দুর্গটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ার আদেশ প্রদান করেন। এ কাজের জন্য তার এই বাহিনী যথেষ্ট ছিলো না। ইযযুদ্দীনও সুলতানের সঙ্গে আছেন। সুলতান আইউবীর পরামর্শ মোতাবেক ইবনে লাউন চতুর্দিকে এই নির্দেশসহ দূত প্রেরণ করেন, যেনো সকল সৈন্য অস্ত্র সমর্পণ করে দুর্গের নিকটে এসে জড়ো হয়। ইতিমধ্যে সুলতান আইউবী ইবনে লাউনের সঙ্গে সন্ধির শর্তাবলী ঠিক করে নেন। একটি শর্ত হলো, ইবনে লাউন তার অর্ধেক বাহিনীকে সুলতান আইউবীর হাতে তুলে দেবেন। আরেকটি হলো, ইবনে লাউন সুলতান আইউবীকে বাৎসরিক কর প্রদান করবেন। এরূপ আরো কতিপয় শর্তের ভিত্তিতে চুক্তি সম্পাদিত হয়, যা ইবনে লাউনকে একজন অথর্ব শাসকে পরিণত করে।
ইবনে লাউনের বাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করে দুর্গের নিকট এসে সমবেত হয়। সুলতান আইউবী তাদের আদেশ করেন, দুৰ্গটা এমনভাবে ধ্বংস করে দাও, যেনো এখানে দুর্গের কোন চিহ্ন না থাকে। পরাজিত বাহিনীটি সঙ্গে সঙ্গে দুর্গ ধ্বংসের কাজ শুরু করে দেয় এবং সুলতান আইউবী তার বাহিনীকে মাসাফা নামক একটি পল্লীর নিকট নিয়ে যান। তিনি হাবের বাহিনীকে ফেরত পাঠিয়ে দেন এবং নিজ বাহিনীকে বিশ্রামের জন্য দীর্ঘ সময় প্রদান করেন। ইবনে লাউনের যে অর্ধেক বাহিনীকে নিয়েছিলেন, তাকে তিনি ইযুদ্দীনকে দিয়ে দেন। কিন্তু সুলতান আইউবীর জানা ছিলো না, তার বাহিনীর ছাউনি যে পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত, তার ভেতরে, ও চূড়ায় বল্ডউইনের বাহিনী এসে পৌঁছেছে এবং তার উপর ব্যাঘ্রের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। সুলতান ইিউবী সেই এলাকাটিতে খোঁজ-খবর নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। সেখানে কোন শত্রু বাহিনীর আগমন ঘটতে পারে, তা তাঁর ধারণা ছিলো না।
প্রায় সকল ঐতিহাসিক বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে, সুলতান আইউবী ইযুদ্দীনের পয়গামের ভিত্তিতে কেন নিজের এতো বিশাল পরিকল্পনা পরিবর্তন করে ইবনে লাউনের ন্যায় একজন অগুরুত্বপূর্ণ শাসকের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান পরিচালনা করলেন! সে যুদ্ধে তিনি জয়লাভ করেছেন বটে; কিন্তু যে পরিমাণ সময় ও সৈন্য নষ্ট হয়েছে, তার মূল্যও অনেক ছিলো। আরনল নামক এক ঐতিহাসিক লিখেছেন, সুলতান আইউবী আশপাশের সমস্যাগুলোকে দূর করতে চাচ্ছিলেন। তৎকালের ইতিহাসবেত্তাগণ যাদের মধ্যে আসাদুল আসাদী উল্লেখ্যযোগ্য লিখেছেন, ইযযুদ্দীনের বার্তা পাঠ করে সুলতান আইউবী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।
মোটকথা, সমর বিশেষজ্ঞরা সুলতান আইউবীর এই অভিযানকে যৌক্তিক বলে মেনে নেননি। তারা লিখেছেন, সুলতান আইউবী জানতেন, নিকটেই কোথাও ম্রাট বল্ডউইনের ফৌজ অবস্থান করছে, যারা তার উপর অতর্কিত আক্রমণ করে বসতে পারে। সুলতান আইউবীর ফৌজ যখন পর্বতমালার পাদদেশে ছাউনি স্থাপন করছিলো, ঠিক তখন বল্ডউইন তার বাহিনীকে যুদ্ধ বিন্যাসে পাহাড়ের অভ্যন্তরে ও উপরে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকগণ এর জন্যও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে, বল্ডউইন সময়মতো আক্রমণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু কোন ঐতিহাসিকই বলতে পারেননি, এটা তার রাজকীয় নির্বুদ্ধিতা নাকি অপারগতা ছিলো। তিনি যদি তখনই আক্রমণ করতেন, তাহলে সুলতান আইউবীর সেই পরিণতিই ঘটতো, যা রামাল্লায় ঘটেছিলো- পরাজয় আর পিছুহটা।
***
এখানে ছাউনি স্থাপনের পরও সুলতান আইউবী জানতে পারলেন না, ম্রাট বল্ডউইন তার মাথার উপর বসে পঁাঁতে ধার দিচ্ছেন। উপর থেকে বল্ডউইনের পর্যবেক্ষকরা সুলতান আইউবীর তাবুর প্রতি নজর রাখছে এবং বল্ডউইনকে আইউবী বাহিনীর গতিবিধির সংবাদ অবহিত করছে। সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা ব্যবস্থার দুর্বলতার এটিই বোধ হয় প্রথম ঘটনা।
তাবরিজও আইউবীর এই বাহিনীর সঙ্গে আছে। দিরা এখনো বলেনি তাকে সঙ্গে করে কেন নিয়ে এসেছে। মেয়েটি সম্ভবত তাকে খৃস্টান ধর্মে দীক্ষিত করে গুপ্তচর বানাতে চাচ্ছে। তার মধ্যে দুটি চরিত্র সমানভাবে কাজ করছে- এক. কুশের অফাদারি। দুই. তাবরিজের ভালবাসা। তাবরিজকে নিয়ে বল্ডউইনের কোন ভাবনা না থাকলেও দিরার প্রতি তার দুর্বলতা রয়েছে। দিরা অতিশয় রূপসী মেয়ে। একদিন দিরা বল্ডউইনকে বললো, আমাকে সম্মুখের ছাউনিতে পাঠিয়ে দিন। কিন্তু বল্ডউইন তাকে ধরে রাখেন।
একদিন বল্ডউইনের গোয়েন্দারা সংবাদ প্রদান করে, সুলতান আইউবীর ফৌজ তালখালেদ অভিমুখে রওনা হয়েছে। বল্ডউইনের কল্পনায় ছিলো না, সুলতান আইউবী ইবনে লাইনের উপর আক্রমণ করতে যাচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার বাহিনীকে মাসাফার পার্বত্য অঞ্চল অভিমুখে রওনা হওয়ার আদেশ প্রদান করেন। তার পরিকল্পনা হলো, তিনি সুলতান আইউবীকে এই পার্বত্য অঞ্চলে টেনে এনে লড়াবেন। এই পরিকল্পনা অনুসারেই তিনি তার সৈন্যদের পাহাড়ের উপযুক্ত এলাকা এবং গোপন স্থানে ছড়িয়ে দেন। আউইবীর জন্য বিশাল এক ফাঁদ পাতেন বল্ডউইন।
বল্ডউইনের এই আদেশ শুনে দিরা বললো, আমি আপনার নিকট আশ্রয় নিতে এসেছিলাম। তাবরিজের বৃত্তান্ত শুনিয়ে দিরা অবহিত করেছিলো, কেন সে তাবরিজকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে। এখন যখন বল্ডউইন যুদ্ধ করার জন্য যাচ্ছেন, তো দিরার তার সঙ্গে থাকায় কোন লাভ নেই। কিন্তু বল্ডউইন দিরাকে ছাড়তে নারাজ।
