মেয়েটি তাবরিজকে নিয়ে একদিকে হাঁটা দেয়। তাবরিজ তার সঙ্গে কথা বলে চলেছে, যেনো দিরা তাকে যাদু করেছে।
রাত পোহায়ে ভোর হলো। গোটা হেস নগরী একটি ভস্মীভূত ধ্বংসাবশেষ ছাড়া কিছুই নয়। এখানকার একজন মুসলমানও জীবিত নেই। বড় মসজিদের মিনারটি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খতীব ও সঙ্গীরা কোন প্রকার মোকাবেলা ছাড়াই শহীদ হয়ে গেছেন। এতক্ষণে দিরা তাবরিজকে নিয়ে খৃস্টান বাহিনীর সেনা ছাউনির নিকট পৌঁছে গেছে। এবার তাবরিজের মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে উঠেছে। দিরাকে জিজ্ঞেস করে, আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছো? দিরা চাপার জোরে তাবরিজকে বুঝ দিয়ে দেয়। তাবরিজকে একধারে দাঁড় করিয়ে দিরা এক কমান্ডারের সাথে কথা বলে। কমান্ডার তাকে একটি পথের নির্দেশনা প্রদান করে। দিরা তাবরিজকে নিয়ে সেদিকে চলে যায়।
দিরা সম্রাট বল্ডউইনের প্রাসাদোপম তাঁবুর নিকট গিয়ে পৌঁছে। রক্ষীরা অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হয়ে তাকে বল্ডউইনের তাঁবুতে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করে। তাবরিজকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে দিরা তাঁবুতে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পর তাবরিজকেও তাবুতে ডেকে নেয়া হয়।
বল্ডউইন তাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বললেন- এই মেয়েটি তোমাকে সঙ্গে রাখতে চাচ্ছে। আমরা তার আবদার উপেক্ষা করতে পারি না। তোমার ভয় কিংবা সন্দেহ পোষণ করার কোন কারণ নেই।
আমি আমার ধর্ম পরিবর্তন করতে পারবো না। তাবরিজ বললো।
ধর্ম পরিবর্তন করতে তোমাকে কে বলেছে দিরা বললো।
তারপর কী হবে?- তাবরিজ জিজ্ঞেস করে- এখানে অবস্থান করে আমি কী করবো? আমাকে ফিরে যেতে দাও।
তাবরিজ!- দিরা নিজের প্রতি তাবরিজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তার চোখে চোখ রেখে বললো- আমি তোমাকে বলেছিলাম, আমিও সেখানে যাবো, যেখানে তোমাকে যেতে হবে।
তাবরিজ কিছুই বুঝতে পারলো না।
***
ইযুদ্দীনের দূত সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর জবাব নিয়ে ইযযুদ্দীনের নিকট পৌঁছে গেছে। সুলতান আইউবীর নির্দেশনা মোতাবেক ইম্যুদ্দীন ইবনে লাউনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাকে নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন যে, আমি আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে এবং সালাহ বিন্দ আইউবীকে ধোকা দেবো। তিলি ইবনে লাউনকে এমন এক সবুজ বাগিচা প্রদর্শন করেন, যেনো ইবনে লাউন তার ফাঁদে পড়ে যায়। পরক্ষণেই ইবনে লাউন ইযযুদ্দীনের সাথে সাক্ষাত করার উদ্দেশ্যে করাহের এসে হাজির হয়। কারাহের একটি উচ্চ ও সবুজ-শ্যামল অঞ্চল, যার দর্শনে ইবনে লাউনের চেহারায় আনন্দের ঢেউ খেলে যায়।
দিন কয়েক পর সুলতান আইউবী বাহিনী নিয়ে কারাহেসারের সন্নিকটে এসে ছাউনি ফেলেন। বাহিনী, ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। কিন্তু তিনি বিশ্রাম নিয়ে সময় নষ্ট করতে চাচ্ছেন না। এই আশঙ্কাও ছিলো যে, আক্রমণে বিলম্ব করলে ইবনে লাউন বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে যাবে। সুলতান আইউবীর ধারণা, ইবনে লাউনের সঙ্গে তাঁর কঠিন মোকাবেলা হবে। এই আশঙ্কার ভিত্তিতেই তিনি হাবের বাহিনীকেও ডেকে এনেছেন। এরূপ পরিস্থিতিতে সহযোগিতা করবেন বলে সুলতান আইউবীর সঙ্গে আল মালিকুস সালিহের চুক্তি ছিলো।
মধ্য রাতের খানিক পর সুলতান আইউবী তার বাহিনীকে আক্রমণের জন্য রওনা হওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। আর্মেনীয়দের চৌকিগুলো কোথায় কোথায় অবস্থিত এবং কোন্ চৌকিতে কতোজন করে সৈন্য আছে, সুলতান আইউবী গোয়েন্দা মারফত সেসব তথ্য জেনে নিয়েছেন। সেনাসংখ্যা যতোই হোক না কেন তারা সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়ে আছে। ইযয়ুদ্দীনের পক্ষ থেকে আক্রমণের কোন আশঙ্কাই তাদের ছিলো না এবং সুলতান আইউবীর এতো নীরবে সেখানে পৌঁছে যাওয়া ছিলো তাদের কল্পনার অতীত।
আইউবীর এই আক্রমণ ছিলো তিনতরফা। হামলাকারী প্রতিটি গ্রুপের সঙ্গে ইযযুদ্দীনের গঠন করা গাইড ছিলো। যে গ্রুপটি কৃষ্ণসাগরের দিক থেকে আক্রমণ করেছিলো, সুলতান আইউবী ছিলেন তাদের সঙ্গে।
কৃষ্ণসাগর ইবনে লাউনের রাজ্যের সীমান্ত। ইবনে লাউন তার উপর নৌকার পুল তৈরি করে রেখেছেন। নদীর কূলে আর্মেনীয়দের দুর্গ মুখাযাতুল আহ্যানের অবস্থান। ইবনে লাউন সেই দুর্গেই অবস্থান করছেন। এই দুর্গটি জয় করতে পারলে সমগ্র এলাকার জয়ের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। সে কারণেই সুলতান আইউবী নিজের বাহিনীর এই গ্রুপের সঙ্গে থাকেন। এই গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সুলতান আইউবীর ভ্রাতুস্পুত্র ফররুখ শাহ, ফিনি বীরযোহ্মা ও যুদ্ধাভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। অপর দুটি গ্রুপ চৌকিগুলোর উপর আক্রমণ করে দুশমনের সৈন্যদেরকে হতাহত ও বন্দী করে ফেলে এবং চৌকিগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য কয়েকটি জনতিতেও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
সুলতান আইউবীর জানবীজ সৈন্যরা যখন দড়ি বেয়ে দুর্গের প্রাচীরের উপর উঠে যায় এবং মিজানিকের সাহায্যে ভারি ভারি পাথর নিক্ষেপ করে দুর্গের দরজা ভেঙ্গে ফেলে, তখন ইবনে লাউনের চোখ খোলে। দুর্গে বাহিনী ঘুমিয়ে ছিলো। টের পেয়ে জাগ্রত হয়ে ইবনে লাউন দেীড়ে দুর্গের একটি মিনারের উপর উঠে যান। তিনি দূরে আগুনের শিখা দেখতে পান। কী ঘটছে এবং তার করণীয় কী, ভাবতে না ভাবতে সুলতান আইউবীর একদল জানবাজ তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার রক্ষীরা যথাসাধ্য মোকাবেলা করে অবশেষে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। আইউবীর সৈন্যরা ইবনে লাউনকে বন্দী করে ফেলে।
