মিগনানা মারিউস এমন নির্লিপ্তের মত বসে আছে, যেন আসলেই কোন কথা তার কানে ঢুকছে না। আলী বিন সুফিয়ান মুবীকে বললেন, ঠিক আছে, সুলতানের বৈঠক শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। বৈঠক শেষ হলে আমি তার সঙ্গে আপনার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করবো। একথা বলেই তিনি দ্রুতপদে বাইরে বেরিয়ে যান।
ফিরে আসেন অনেক বিলন্থে। এসে বললেন, আপনারা আরেকটু বসুন, আমি সুলতানের নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে আসছি। আলী বিন সুফিয়ান সুলতান আইউবীর কক্ষে প্রবেশ করেন; কথা বলেন অনেকক্ষণ। তারপর বেরিয়ে এসে মুবীকে বললেন, ঠিক আছে, এবার পিতাকে নিয়ে আপনি সুলতানের কক্ষে চলে যান; সুলতান আপনাদের অপেক্ষায় বসে আছেন। বলেই তিনি তাদেরকে সুলতান আইউবীর কক্ষটা দেখিয়ে দেন। সুলতান আইউবীর কক্ষে প্রবেশ করার সময় তারা গভীর দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকায়। সুলতানকে হত্যা করার পর পালাবার পথটা-ই দেখে নিলো বোধ হয়।
***
কক্ষে সুলতান আইউবী একাকী দাঁড়িয়ে। তিনি মিগনানা মারিউস ও মুবীকে। বসালেন। মুবীর প্রতি তাকিয়ে বললেন–তোমার বাবা কি জন্মগতভাবেই বোৰা ও বধির?
জি, মুহতারাম সুলতান! এটা তার জন্মগত ত্রুটি। জবাব দেয় মুবী।
সুলতান আইউবী বসছেন না। কক্ষময় পায়চারী করছেন আর কথা বলছেন। তিনি বললেন–তোমার আর্জি-ফরিয়াদ আমি শুনেছি। তোমাদের ব্যথায় আমিও ব্যথিত। এখানে আমি তোমাদের জমিও দেবো, বাড়িও দেবো। শুনেছি, তুমি নাকি আরো কিছু বলতে চাও? বলল, কী সে কথা?
আল্লাহ আপনার মর্যাদা বুলন্দ করুন। আপনি নিশ্চয় শুনেছেন যে, আমাকে কেউ বিয়ে করছে না। মানুষ আমাকে হেরেমের চোষা হাডিড আর নিংড়ানো ছোবড়া, চরিত্রহীনা, বেশ্যা বলে আখ্যা দেয়। তারা বলে, আমার পিতা নাকি আমাকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এখন আপনি আমাকে জমি-ঘর তো দেবেন ঠিক, কিন্তু আমার একজন স্বামীরও প্রয়োজন, যিনি আমার ইজ্জত-সম্ভ্রমের সংরক্ষণ করবেন। অভয় দিলে আপনার নিকট আমি এ আর্জিও পেশ করবো যে, বিয়ের ব্যবস্থা করতে না পারলে আপনি-ই আমাকে আপনার হেরেমে রেখে দিন। আপনি আমার বয়স, রূপ-যৌবন ও দেহ-গঠন দেখুন। বলুন, আমি কি আপনার যোগ্য নই?
একথা বলেই মুবী এক হাত মিগনানা মারিউসের কাঁধে রেখে অপর হাত নিজের বুকে স্থাপন করে এবং চোখে সুলতান আইউবীর প্রতি ইঙ্গিত করে।
মিগনানা মারিউস দু হাত একত্র করে সুলতান আইউবীর প্রতি বাড়িয়ে ধরে, যেন সে বলছে, আপনি দয়া করে আমার মেয়েটাকে বরণ করে নিন।
আমার কোন হেরেম নেই বেটী! আমি রাজ্য থেকে হেরেম, পতিতালয় এবং মদ উৎখাত করছি। বললেন সুলতান আইউবী।
কথা বলতে বলতে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী নিজের পকেট থেকে একটি মুদ্রা, বের করলেন এবং হাতে নিয়ে মুদ্রাটি নাড়াচাড়া করছেন আর আমি নারীর ইজ্জতের মুহাফিজ হতে চাই বলতে বলতে দুজনের পিছনে চলে যান এবং হঠাৎ মুদ্রাটি হাত থেকে ফেলে দেন। টন করে একটা শব্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে মিগনানা মারিউস চকিতে পেছন ফিরে তাকিয়েই অমনি মুখ ফিরিয়ে নেয়।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী নিজের কোমরবন্ধ থেকে একটি খঞ্জর বের করে আগাটা মিগনানা মারিউসের ঘাড়ে তাক করে ধরে মুবীকে বললেন লোকটা আমার ভাষা বুঝে না। একে বলল, হাত থেকে অস্ত্র ফেলে দিতে। তোমার বাবাকে বলল, যেন একটুও নড়াচড়া না করে। অন্যথায় তোমরা দুজন এক্ষুনি লাশে পরিণত হরে।
ভয়ে-বিস্ময়ে মুবীর চোখ দুটো কোঠর থেকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু তারপরও মেয়েটি অভিনয়ের পরাকাষ্ঠা দেখাবার চেষ্টা করে এবং বলে আমার বাবাকে ভয় দেখিয়ে আপনি আমাকে কজা করতে চাচ্ছেন কেন? আমি তো নিজেই নিজেকে আপনার সামনে পেশ করে দিলাম। ..।
সুলতান আইউবীর খঞ্জরের আগা মিগনানা মারিউসের ঘাড়েই ধরা। সে অবস্থায়ই তিনি বললেন–যুদ্ধক্ষেত্রে যখন তুমি আমার মুখোমুখি হয়েছিলে, তখন আমার ভাষা বলোনি। এখন এতো দ্রুত আমার ভাষাটা শিখে ফেললে তুমি ……….! একে এক্ষুণি অস্ত্র ফেলতে বলো।
মুবী তার ভাষায় মিগনানা মারিউসকে কি যেন বললো। সাথে সাথে সে চোগার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একটি খঞ্জর বের করলো। লম্বায় ঠিক সুলতান আইউবীর খঞ্জরের সমান। সুলতান আইউবী হাত থেকে তার খঞ্জরটা নিয়ে নেন এবং ঘাড়ে তাক করে নিজের খঞ্জরটা সরিয়ে ফেলে বললেন–অপর ছয়টি মেয়ে কোথায়?
আপনি আমাকে চিনতে ভুল করেছেন মহামান্য সুলতান! আমার সঙ্গে আর কোন মেয়ে নেই। আপনি কোন্ মেয়েদের কথা বলছেন? কম্পিত কণ্ঠে বললো মুবী।
সুলতান আইউবী বললেন–আল্লাহ আমাকে চোখ দিয়েছেন, মেধাও দিয়েছেন। একবার কাউকে দেখলে তার চেহারাটা আমার হৃদয়পটে অঙ্কিত হয়ে যায়। অর্ধেকটা নেকাবে ঢাকা তোমার এই মুখাবয়ব এর আগেও আমি দেখেছি। তোমরা যে কাজে এসেছে, তার যোগ্যতা ও ক্ষমতা তোমাদের নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে সে মেধা দেননি। সরাইখানায় তোমরা দুজন ছিলে স্বামী-স্ত্রী। এবানে এসে হয়েছে পিতা-কন্যা। বাইরে ঘোড়ার নিকট দণ্ডায়মান তোমাদের সঙ্গীটিও তোমাদের ভৃত্য নেই। লোকটি এখন আইউবীর বন্দী।
কৃতিত্বটা আলী বিন সুফিয়ানের। মুবী তাঁকে বলেছিলো, তারা সরাইখানায় এসে উঠেছে। দুজনকে নিজের কক্ষে বসিয়ে রেখে বের হয়েই ঘোড়ায় চড়ে ছুটে গিয়েছিলেন সেখানে। মুবী ও মিগনানা মারিউসের আকৃতির বিবরণ দিয়ে জিজ্ঞেস করলে কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা দুজন স্বামী-স্ত্রী। সঙ্গের লোকটি তাদের ভূত্য। তারা আরো জানায়, এখানে উঠে লোক দুটো বাজার থেকে কিছু কাপড় ক্রয় করে এনেছিলো। তন্মধ্যে মেয়েটির বোরকার ন্যায় চোগা এবং জুতাও ছিলো।
