আমরা একে ক্রুশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা মনে করবো।বৃদ্ধ খৃস্টান বললো।
সাপের বাচ্চাকে রক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ইহুদী বললো।
এখানে মুসলমানদের দুটি পরিবার আছে, যাদের সঙ্গে আমার আন্তরিক সম্পর্ক রয়েছে- হেমসের এক খৃস্টান অধিবাসী বললো- কিন্তু আমি তাদেরকে রক্ষা করার কথা ভাবি না। আমি মুসলমানদের রক্ত চাই। কোন মুসলমানের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব থাকতে পারে, কিন্তু তারপরও সে আমার ধর্মের শত্রু।
যে লোকটি আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে এনেছে, আমি তাকে বাঁচাতে চাই। দিরা ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললো।
আমরা তাকে এতো পরিমাণ পুরস্কার পেশ করেছিলাম, যা সে কখনো স্বপ্নেও দেখেনি- ইহুদী বললো- কিন্তু সে বললো, আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি। আমরা পুরস্কার পেশ করে আমাদের দায়িত্ব আদায় করেছি। এখন সে আমাদের শত্রু, আমরাও তার শত্রু।
আমি তাকে শত্রু মনে করি না- দিরা ঝাঝালো কণ্ঠে বললো- আমি এই একজন পুরুষ পেয়েছি, যে আমার দেহের প্রতি বিন্দুমাত্র আকৃষ্ট হয়নি। তোমরা সকলে পাপী। তোমাদের মধ্যে একজন লোকও এমন আছে কি, আমার ব্যাপারে যার নিয়ত পরিচ্ছন্ন? আমার চোখে নিজের চেহারাটা দেখে জবাব দাও।
আচ্ছা, তুমি শুধু তাবরিজকে রক্ষা করো- ইহুদী বললো- কিন্তু বাঁচাবে কী করে? কী ঘটতে যাচ্ছে, যদি তুমি তাকে বলে দাও, তাহলে সে সকলকে বলে দেবে না? তুমি যদি তার পরিবারকে নগরী থেকে বেরিয়ে যেতে বলল, তাহলে কি তারা এর কারণ জিজ্ঞেস করবে না? তখন তুমি কী উত্তর দেবে? একজন মুসলমানকে উপকারের প্রতিদান দিতে গিয়ে তুমি সেই সকল মুসলমানকে সতর্ক করে দেবে, যারা আমাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাকে আনাড়ি মনে করো না- দিরা বললো- আমি ক্রুশকে ধোঁকা দেবে না।
আক্রমণের দিন সন্ধ্যায় দিরা তাবরিজের ঘরে গিয়ে তাকে বাইরে নিয়ে আসে। দিরা রাতে প্রায়ই কোথায় চলে যায়, তার লোকেরা জানে। তারা জানে, প্রেমের ধোঁকা দিয়ে দিরা তাবুরিজ থেকে তথ্য সগ্রহ করছে।
দিরা তাবরিজকে নিয়ে বেরিয়ে গেলে নগরীর ইহুদী ও খৃস্টানরা পা টিপে টিপে বের হতে শুরু করে। তারা দিরার সন্ধানে এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করে, যে তাকে ডাকতে থাকে। কিন্তু দিরা তাবরিজকে নিয়ে দূরান্তে চলে যেতে থাকে। মেয়েটি তাবরিজকে এতোটুকু দূরে নিয়ে যেতে চাচ্ছে, যেখান থেকে নগরীর হৈহুল্লোড় শোনা যাবে না। দিরার অনুসন্ধানে বের হওয়া লোকটি নিরাশ হয়ে ফিরে যায়।
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সমগ্র নগরী। খৃস্টান বাহিনীর পদাতিক সৈন্যরা পা টিপে টিপে নগরীর একেবারে নিকটে এসে পৌঁছুলে পেছন থেকে অশ্বারোহীরাও এসে পড়ে। নগরীর মুসলমানরা গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে আছে। খৃস্টান বাহিনী হঠাৎ ঝড়ের ন্যায় আক্রমণ করে বসে। খৃস্টান সৈন্যদের হাতে মশাল। অধিক আলোর জন্য তারা দুতিনটি ঝুপড়িতে অগ্নি সংযোগ করে দেয়। খৃস্টান সৈন্যরা প্রাচীর টপকে মুসলমানদের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ে। অধিকাংশ মুসলমান সজাগ হওয়ার আগেই মারা যায়। যারা সময় মতো জাগ্রত হয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে সক্ষম হয়, তারা মোকারেলা করে। অনেক মেয়ে খৃস্টানদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আত্মহত্যা করে। খৃস্টান অশ্বারোহীরা নগরীটি ঘেরাও করে রেখেছিলো। তারা কাউকে পালাতে দেখামাত্র বর্শা কিংবা তরবারীর শিকারে পরিণত করে।
এই সেই হট্টগোল ও ডাক-চীৎকার, যা তাবরিজ টিলার অভ্যন্তরে বসে এনেছিলো। তার গৃহটি ধ্বংস হয়ে গেছে। ম্রাট বল্ডউইন মুসলমানদের এই বসতিটি অধিবাসীদেরসহ ধ্বংস করে পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করেন।
আজ তুমি আমাকে এতো দূর নিয়ে এসেছো কেন?- তাবরিজ দিরাকে জিজ্ঞেস করে- আজ তুমি কথা বলছো না কেন? তুমি সন্ত্রস্ত কেন?
কারণ, তুমি আমার সঙ্গ দেবে না- সুচতুর মেয়ে দিরা বললো- আমি তোমাকে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছি। আগামীকাল ফিরে আসবো।
কোথায়?
কেন, আমার উপর কি তোমার আস্থা নেই? দিরা তাবরিজকে উভয় বাহুবন্ধনে জড়িয়ে ধরে মুখটা তাবরিজের এতো নিকটে নিয়ে যায় যে, তার বিক্ষিপ্ত রেশমী চুলগুলো তাবরিজের গণ্ডদেশ ছুঁয়ে যায়। এই সেই চুল, গুহায় থাকাবস্থায় যাকে দেখে তাবরিজ যুগপৎ রোমাঞ্চ ও বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েছিলো। এখন তো মেয়েটির ভালোবাসা তার হৃদয় জুড়ে বাসা বেঁধে বসেছে- আমরা আর কতোদিন চোরের ন্যায় এভাবে মিলিত হবো? এখন আর আমি তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারছি না। তোমার হৃদয়ে যদি আমার ভালোবাসা থাকে, তাহলে জিজ্ঞেস করো না আমি তোমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। মনে করো, সেখানে গিয়ে উপনীত হবো, যেখানে আমাদের মাঝে ধর্মের দেয়াল অন্তরায় হবে না। তুমি পুরুষ। আমাকে দেখো, আমি অবলা নারী হয়ে তোমার ভালবাসার খাতিরে কত বড় ঝুঁকি বরণ করে নিচ্ছি।
দুর্বল মূলত তাবরিজ। দিরা তার বিবেকের উপর জয়ী হয়েছে। এখন তার প্রচেষ্টা তাবরিজ নিজ অঞ্চলে ফিরে না যাক। দিরা জানে, ফিরে গিয়ে তাবরিজ তার ভিটায় ভস্মীভূত ধ্বংসাবশেষ আর স্বজনদের অগ্নিদগ্ধ লাশ ছাড়া আর কিছুই পাবে না। তখন লোকটা পাগল হয়ে যাবে। হয়তো সন্দেহের বশবর্তী হয়ে দিরাকে খুন করে ফেলবে। তাবরিজ দিরাকে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করে স্বসম্মানে হেমস এনে পৌঁছানোর বিনিময়ে এবং ভালবাসার খাতিরে তাবরিজকে খৃস্টানদের হাতে নিহত হওয়া থেকে রক্ষা করেছে। এবার তাকে নিজ গৃহ এবং স্বজনদের ধ্বংস ও করুণ পরিণতি দেখার যন্ত্রণা থেকেও বাঁচাতে চায়।
