হেমসের ইহুদী ব্যবসায়ীযে হেমন্সকে ধ্বল করার জন্য সম্রাট বল্ডউইনের নিকট নিয়েছিলো। ফিরে এসেছে। বল্ডউইনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়নি। তিনি তার খৃস্টান বন্ধুদের নিকট সাহায্যের আবেদন করতে গিয়েছেন। তার সেনাপতিরা ইহুদীকে বললো, আমরা সম্রাটের নির্দেশ ব্যতীত কিছু করতে পারি না। তবে কাজ হবে।
ইহুদী ফিরে আসার পর তাকে জানানো হলো, দিরা জীবিত ফিরে এসেছে এবং তাবরিজ নামক এক মুসলমান তাকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে। খৃস্টান ও ইহুদীরা তাবরিজকে নগদ পুরস্কার পেশ করে। কিন্তু তাবরিজ এই বলে প্রত্যাখ্যান করে যে, জামি আমার ব্য পালন করেছি।
ইহুদী ব্যবসায়ী দিরাকে অকর্মণ্য মনে করছে। কারণ, নগরী ধ্বংস করার আয়োজন সম্পন্ন হয়ে গেছে। সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, দিরাকে হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু দিরা চতুর মেয়ে। বললো, আমি খতীবকে ঘায়েল করবো এবং যেসব মুসলমান সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে, তাদের মাঝে ফাটল ধরাবো। সে আরো বললো, এখানকার মুসলমানদের পরিকল্পনা জ্ঞাত হওয়ার জন্য আমাকে প্রয়োজন।
দিরাকে হেসেই রেখে দেয়া হলো। কিন্তু কেউ জানে না, তার এই থাকার আগ্রহ একমাত্র তাবরিজের জন্য।
দিরা তাবরিজের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে থাকে। রাতে নগরী থেকে। অনেক দূরে চলে যাচ্ছে এবং দীর্ঘসময় বসে থাকছে। দিরা উঁচু স্তরের একটি সুন্দরী খৃষ্টান মেয়ে। তার মোকাবেলায় তাবরিজের কোন মর্যাদাই নেই। দিরা আমীর-উজীর ও রাজা-বাদশাহদের প্রাসাদে বসবাস করার মতো মেয়ে। দামেশকে প্রশাসনের দুজন পদস্থ কর্মকর্তাকে সে তার অনুগত বানিয়ে ফেলেছিলো এবং তাদের দ্বারা এমন সব ষড়যন্ত্র পাকিয়েছিলো, যার জন্য সুলতান আইউবীকে দামেশকের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হয়েছিলো। কিন্তু জলেসের ভীতি আর তাবরিজের চরিত্র তাকে এমন এক ধাক্কা দিয়েছে যে, মেয়েটির ব্যক্তি সত্ত্বায় আত্মা ও আবেগ জেগে ওঠেছে। দিরা তাবরিজের পূজা করতে শুরু করে দিয়েছে এবং তাবরিজ তার ভালবাসার জালে আটকা পড়েছে।
একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তাবরিজ- দিরা বলল- খতীব এবং অন্যান্য যারা তোমাদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করছে, তারা কোথা থেকে এসেছেন?
তাবরিজ উত্তর দিতে শুরু করলে দিরা বলে ওঠে- রাখো, ওসব বাদ দাও তাবরিজ! তাতে আমাদের কিছু আসে-যায় না। যার যা খুশি করুক। এমন সুন্দর রাতটাকে আমি বুদ্ধের আলোচনা দ্বারা কলঙ্কিত করবো কেন!
দিরা দুমুখো চরিত্রের মেয়েতে পরিণত হয়ে যায়। যখন তাবরিজের সঙ্গে থাকে, তখন নিষ্পাপ ও পবিত্র মেয়ের রূপ ধারণ করে। তখন তার মনেই থাকে না সে গুপ্তচর। গুপ্তচরবৃত্তির মানসে তাবরিজকে খতীব ও তার সহযোগীদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেও শেষ পর্যন্ত তাবরিজকে জবাব দিতে বারণ করে দেয়। আবার এই দিরাই যখন ইহুদী ব্যবসায়ীর ঘরে গিয়ে বসে, তখন সে মুসলমানদের ধ্বংস সাধন বিষয়ে কথা বলে।
***
দেড়-দুই মাস সময় চলে গেছে। একদিন সন্ধ্যায় দিরা তাবরিজের ঘরে গিয়ে তার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। কথার ফাঁকে দিরা তাবরিজকে বিশেষ ভঙ্গিতে ইশারা করে, যার মর্ম তাবরিজ বুঝে ফেলে। তাবরিজ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সাঁঝের আঁধার গম্ভীর হওয়া মাত্র তাবরিজ তাদের সাক্ষাতের নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে যায়। দিরাও এসে পৌঁছে। দিরা তাবরিজকে নগরী থেকে দূরে নিয়ে যায়। মেয়েটি কেমন যেনো আতঙ্কিত। তাবরিজ তার ভীতির কারণ জানতে চায়। কিন্তু দিরা কোন উত্তর দেয় না। হঠাৎ একটি শব্দ তাদের কানে ভেসে আসে। কে যেন দিরাকে ডাকছে। তাবরিজ জিজ্ঞেস করে, কে. ডাকছে? দিরা সন্ত্রস্ত কণ্ঠে উত্তর দেয়, আমার লোকেরা আমাকে খুঁজছে। চলো, আরো দূরে চলে যাই। বলেই তাবরিজকে টেনে দ্রুতপায়ে আরো দূরে চলে যায়। দিরাকে কে যেন এখনও ডাকছে।
এসব ডাকাডাকিতে কান দিও না তো তাবরিজ!- দিরা বিরক্তি প্রকাশ করে বললো- আমি যখন তোমার সঙ্গে থাকি, তখন অন্য কারো আওয়াজ শুনতে চাই না।
সম্মুখে ছোট-বড় অনেকগুলো টিলা। তাবরিজ খানিকটা বিস্ময়ের সঙ্গে দিরার সঙ্গে হাঁটতে থাকে। দিরা এক স্থানে দাঁড়িয়ে যায়। এখানে কারো শব্দ এসে পৌঁছাচ্ছে না। হঠাৎ তাবরিজ চমকে উঠে কান খাড়া করে বললো- কেমন একটা শোরগোলের মতো শোনা যাচ্ছে! তুমিও শুনতে চেষ্টা করো। মনে হচ্ছে, অনেক লোকজন একসাথে চীৎকার করছে আর ঘোড়া ছুটাছুটি করছে।
কিছু না, তোমার কান বাজছে- দিরা অট্রহাসি হেসে বললো বাতাসের তীব্র ঝাপ্টা টিলার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে অতিক্রম করছে। এটা সেই বাতাসের শব্দ।
নিজের সুকোমল বাহু আর রেশমী চুলের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিরা তাবরিজের চোখ, কান ও বিবেক কজা করে নেয়। তাবরিজ দিরার ব্যাখ্যা মেনে নেয়, এই শব্দ বাতাসের, যা দূর থেকে আসা শোরগোলের ন্যায় শোনা যাচ্ছে। কিন্তু তার জানা নেই, এই হৈ-হুঁল্লোড় তার অঞ্চলের মানুষদের এবং সেখানে সেই প্রলয় ঘটে গেছে, যা ইহুদী ব্যবসায়ী ঘটাতে চেয়েছিলো। ঘটনাটা দিরা জানে। এই প্রলয়ের শব্দ তাবরিজের কানে পৌঁছুক, দিরার তা কাম্য নয়।
প্রথমবার ফিরে আসার পর ইহুদী ব্যবসায়ী আবারো বল্ডউইনের নিকট গিয়েছিলো। হেমসের মুসলমানরা কী করছে এবং কিভাবে খৃস্টান বাহিনীর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, ইহুদী বল্ডউইনকে তা অবহিত করে আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করে। মুসলমান বল্ডউইনের প্রিয় শিকার। তিনি ইহুদীর প্ররোচনা ও প্রস্তাবনায় উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন। আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তিনি ইহুদীকে দিনক্ষণ জানিয়ে দেন। তিনি বলে দেন, সে রাতে হেসের ইহুদী ও খৃস্টানরা যেন আগে-ভাগে এলাকা থেকে সরে যায়। কাজটা করবে তারা রাতে। দিনে এলাকা ত্যাগ করতে গেলে মুসলমানরা সন্দেহ করে ফেলবে, কিছু একটা সমস্যা আছে। ইহুদী ফিরে এসে যখন তার লোকদেরকে পরিকল্পনা জানালো, তখন দিরা বললো, আমি তাবরিজ এবং তার পরিবারকে রক্ষা করতে চাই।
