ইযযুদ্দীন সুলতান আইউবীর নিকট যে বার্তা প্রেরণ করেন, তার বিবরণ নিম্নরূপ
মহামান্য সুলতান! আপনার এবং সালতানাতে ইসলামিয়ার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। আমার অফাদারী সম্পর্কে আপনার কোন সংশয় নেই বলেই আমার বিশ্বাস। আমি তালখালেদের দিক থেকে খৃস্টানদের পথ বন্ধ করে রেখেছি। সমস্ত অঞ্চল এবং অগ্রযাত্রার রাস্তা আমার কমান্ডো সেনাদের দৃষ্টিতে থাকছে। খৃস্টানরা আমাকে রাস্তা থেকে হঠানোর জন্য ইবনে লাউনের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে। আপনি জানেন, আমার সীমান্ত সেই অঞ্চলের সঙ্গে লাগোয়া, যেটি মূলত আর্মেনিয়ার এলাকা। আর্মেনীয়রা আমার সীমান্ত চৌকিগুলোর উপর আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমার সৈন্য কম। খৃস্টান ও আর্মেনীয়রা দুবার মূল্যবান উপঢৌকনসহ আমার নিকট দূত প্রেরণ করেছে। তারা আমাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, যেন আমি তাদের জোটে যোগদান করি এবং আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলে তারা আমাকে হামলার হুমকি দিয়েছে। আমার স্থলে অন্য কেউ হলে নিজের ভূখণ্ড রক্ষার জন্য এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে নিতো। জায়গাটা এতই দূরে যে, প্রয়োজন হলে কারো সাহায্য নিয়ে সময় মতো পৌঁছানো সম্ভব নয়। তথাপি আমি তাদের আমন্ত্রণে সাড়া দেয়ার পরিবর্তে তাদের হুমকিকে বরণ করে নিয়েছি। এই পদক্ষেপ আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে নিয়েছি। আমি আমার দুর্গ, অঞ্চল এবং সেই সঙ্গে নিজের জীবনটাও কুরবান করে দিতে প্রস্তুত আছি। তবু আমি খৃস্টানদের সঙ্গে জোট বাঁধবো না, কাফিরদের সঙ্গে হাত মেলাবো না। আমাকে নূরুদ্দীন জঙ্গীর আত্মার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। আমাকে সেই লাখো শহীদের সম্মুখে জবাবদিহি করতে হবে, যারা প্রথম কেবলার জন্য জীবনদান করেছে। আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে আমার জানা নেই। আমি কেবল এটুকু জানি, রামাল্লার দুর্ঘটনার পর আপনি পুনর্গঠন ও অন্যান্য আয়োজন-প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আছেন। আমি এও জানি, মুহতারাম আল-মালিকুল আদিল আমাকে সাহায্য করতে পারবেন না। আমি আপনাকে আমার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা আবশ্যক মনে করছি। আপনি যদি আদেশ করেন, তাহলে আমি আমার অঞ্চল ও কারাহের দুর্গের দখল ত্যাগ করে বাহিনীসহ আপনার নিকট চলে আসবে। অন্যথায় বলুন, আমি কী করবো। কোন মূল্যেই আমি ক্রুসেডার ও আর্মেনীয়দের সঙ্গে সমঝোতা করবো না।
সুলতান আইউবী বার্তাটি পাঠ করেন। তৎক্ষণাৎ সালার ও উপদেষ্টাদের তলব করেন। বার্তাটি পড়ে তাদের শোনান এবং নির্দেশ প্রদান করে সকলকে বিস্মিত করে দেন যে, রাস্তা পরিবর্তন করো। আমরা ইবনে লাউনের অঞ্চলে আক্রমণ করবো।
একনায়কের ন্যায় আদেশ করা সুলতানআইউবীর নীতি নয়। তিনি আবেগের কাছে পরাজিত হয়ে কোন সামরিক অভিযান পরিচালনা করতেন না। কিন্তু এবারকার আদেশের পেছনে সমর কৌশলের পাশাপাশি আবেগও কার্যকর ছিলো।
কারাহেসার মুহতারাম ওস্তাদ নূরুদ্দীন জঙ্গীর স্মৃতি- সুলতান আইউবী বললেন- আর ইযযুদ্দীনের ভাষায় আমি জঙ্গী মরহুমের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি। আমি সেই লোকটিকে নিঃসঙ্গ ফেলে রাখতে পারি না, যে আমাদের লক্ষ্য ও পরিকল্পনার সঙ্গে একমত, যে আমাদের একই পথের অভিযাত্রী।
মহামান্য সুলতান!- এক সালার বললেন- আমরা যদি বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করি, তাহলে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবো।
বাস্তবতা হলো, আমাদেরকে সর্বাগ্রে দামেশক পৌঁছে সেখানকার পরিস্থিতি অনুধাবন করা আবশ্যক ছিলো- সুলতান আইউবী বললেন কিন্তু এখন যদি আমরা দামেশক চলে যাই, তাহলে ইবনে লাউন তালখালেদের উপর আক্রমণ করে বসবে এবং ইযযুদ্দীন তার হাতে পরাজয় বরণ করবে। সম্মুখে হাব। তোমরা আল-মালিকুস সালিহ এবং তার উপদেষ্টাদের সম্পর্কে ভালোভাবে জালা। আমাদের সঙ্গে তারা যে চুক্তি করেছে, তা এখনো বহাল আছে কই; কিন্তু চুক্তি লোহা প্রীর নয় যে, ভাঙ্গা যাবে না। খৃস্টানদের সঙ্গে সমঝোতা করে দেয় পুরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া বিচিত্র নয়। আমি খৃস্টানদেরকে হার দখল করতে দেবো না, আমি ইযযুদ্দীনকে নিঃসঙ্গ ছেড়ে রাখতে পারবো না।
কিছুক্ষণ পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়। অবশেষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, বাহিনী তালখালেদ অভিমুখেই এগিয়ে যাবে। সুলতান আইউৰী ইযযুদ্দীনের দূতকে মৌখিক বার্তা প্রদান করেন, ইষষুদ্দীমকে বলবে, তিনি যেনো ইবনে লাউনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার সঙ্গে বন্ধুত্বের ফাঁদ পাতেন। বলবে, আপনি বন্ধুত্বের টোপ দিয়ে আলাপ-আলোচনার শীর্মে কালক্ষেপণ করুন। তাকে এই আশ্বাসও দিন যে, আমার বাহিনীকে আপনার হাতে তুলে দেবো। আমি আমার বাহিনীকে তালখালেদ অভিমুখে রওনা হওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।
দূত বিদায় নিয়ে চলে যায়।
***
খৃস্টান গুপ্তচররা সুলতান আইউবীর গতিবিধির প্রতি নজর রাখছে এবং খৃস্টানদের নিকট সংবাদ পৌঁছাচ্ছে। তারা রিপোর্ট অনুযায়ী তাদের দুর্গ ও অঞ্চলগুলোর প্রতিরক্ষা সংহত করছে। তারা জানে, সুলতান আইউবীজ পদক্ষেপ-পরিকল্পনা সম্পর্কে আগাম কিছু বলা যায় না। খৃস্টাম হেডকোয়ার্টার যখন গোয়েন্দা মারফত সংবাদ পায়, সুলতান আইউবীর ফৌজ দামেশকের পথ ত্যাগ করে অন্যদিকে যাচ্ছে, তখন তাদের সেনাপতিরা বললো, আইউবী তার পরীক্ষিত ময়দানে যুদ্ধ করতে চাচ্ছেন।
