খতীব এক ব্যক্তিকে বল্ডউইনের ফৌজের অবস্থান ও গতিবিধি দেখে আসার জন্য প্রেরণ করেছেন। এ সময় তাবরিজ ও দিরা নগরীতে প্রবেশ করে। তাবরিজ দিরাকে পিঠে করে নিয়ে এসেছে। পথে পানি পাওয়া গিয়েছিলো বটে, কিন্তু খাবার জোটেনি। দিরা খৃস্টানদের রাজকন্যা। পায়ে হেঁটে সফর করায় অভ্যস্ত নয়। তাবরিজ রাতের জন্য কোথাও বিরতি দিতে চাচ্ছিলো না। তাই দিরাকে পিঠে তুলে নিয়ে অবশিষ্ট পথ অতিক্রম করে এসেছে। নিজ গৃহের সম্মুখে এসে তাবরিজ দিরাকে পিঠ থেকে নামিয়ে তাকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। ঘরের লোকদের বিশ্বাস হচ্ছে না, তাবরিজ জীবিত আছে। তার ঘোড়াটা আগেই ঘরে পৌঁছিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তাবরিজ পরিজনকে ঘটনার বিস্তারিত শোনায়।
দিরার জানা আছে, তার গন্তব্য ইহুদী ব্যবসায়ীর ঘর। মেয়েটি এখনই সেখানে পৌঁছে যেতে চাচ্ছে। পিতার চিন্তায় উদগ্রীব সে। তার আশা, পিতা হয়তো জীবনে রক্ষা পেয়ে পৌঁছে গেছেন। তাবরিজের ইহুদীর ঘর জানা ছিলো। সে মেয়েটিকে পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্য রওনা হয়।
দুজনে পথ চলছে। অন্ধকার পথ। এক স্থানে দিরা হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায় এবং তাবরিজকে জড়িয়ে ধরে। মেয়েটি তাবরিজের প্রতি হৃদতা ও ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে শুরু করে।
আমাদের গন্তব্য আলাদা- তোমার এক আমার আরেক- দিরা ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললো- কিন্তু কোন এক দোরাস্তায় আমরা আবার মিলিত হবো। আমি আমার আত্মার সঙ্গে সম্পর্কহীন ছিলাম। এখন তা পেয়ে গেছি। ভালোবাসা কী বস্তু আমি জানতাম না। তুমি আমাকে তা দিয়েছে। আমি হৃদয়ে তোমার স্মরণ নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তুমি আমাকে ভুলে যাবে।
না দিরা!-তাবরিজের মানসিক অবস্থা দিরার চেয়েও বেশি নড়বড়ে। বলতে শুরু করে- আমি তোমাকে ভুলতে পারবো না। তুমি এতোদিন যাবত একটি মিথ্যা ধর্মের অনুসরণ করে এসেছে। অবশিষ্ট জীবন ইসলামের ছায়াতলে কাটিয়ে দাও। আমি তোমার অপেক্ষা করবো। আমার হৃদয়ে এখন অন্য কোন নারী স্থান পাবে না। এখন তো তুমি এই নগরীতেই অবস্থান করবে। সময়-সুযোগ মতো সাক্ষাৎ হবে। তবে সাবধান থাকতে হবে কেউ যেনো না দেখে ফেলে।
তাবরিজ আমানতের খেয়ানত করেনি। সফরকালেই মেয়েটি তার অনুরক্ত হয়ে গিয়েছিলো। পরে সে তাবরিজের হৃদয়কে জয় করে নিয়েছিলো। এখন তাবরিজ মেয়েটিকে ইহুদী ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছে।
তাবরিজ দিরাকে নিয়ে ইহুদীর গৃহে পৌঁছে যায়। দিরার পিতা দাবিদার বৃদ্ধ খৃস্টান ইহুদীর ঘরে বসা। দিরাকে দেখে লোকটি আনন্দে আপ্লুত হয়ে ওঠে। বৃদ্ধ উঠে এগিয়ে এসে মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে। ইহুদী ব্যবসায়ী ঘরে ছিলো না। সিদ্ধান্ত অনুসারে সে সম্রাট বল্ডউইনের সেনা ছাউনির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে। বৃদ্ধের পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও তাবরিজ দিরাকে পৌঁছিয়ে দিয়ে আর বিলম্ব করেনি। সেখান থেকেই মসজিদে চলে আসে। মসজিদের দরজা বন্ধ ছিলো। তাবরিজ বিশেষ পদ্ধতিতে দরজায় করাঘাত করে। দরজা খুলে গেলে তাবরিজ ভেতরে ঢুকে পড়ে।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী এক বছরের মধ্যে বাহিনী প্রস্তুত করে ফেলেন। তিনি বেশি অপেক্ষা করলেন না। যে রাতে, হেসের ইহুদী ব্যবসায়ী সেনা অভিযান পরিচালনা করে হেসের মুসলমানদের ধ্বংস করার আবেদন নিয়ে সম্রাট বল্ডউইনের নিকট রওনা হয়ে গিয়েছিলো, সে রাতেই সুলতান আইউবীর ফৌজ কায়রো ত্যাগ করে। তার গন্তব্য দামেশক। বাহিনী দ্রুত এগিয়ে চলছে। সুলতান আইউবী সময় নষ্ট করতে চাচ্ছেন না। তৎকালের ঐতিহাসিকদের মতে, সুলতান আইউবী দামে অবস্থান করে সেখানকার পরিস্থিতি, বিশ্বাসঘাতক ও কুচক্রীদের সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে এবং তাদের প্রতিহত করে আল-আদিলের সঙ্গে মিলিত হতে চাচ্ছেন। তারপর সেখান থেকে সামরিক অভিযান শুরু করবেন। কিন্তু পথেই তিনি রাস্তা পরিবর্তন করে ফেলেন।
পথে ইযযুদ্দীনের এক দূতের সঙ্গে আইউবীর সাক্ষাৎ ঘটে। দূত আইউবীর নামে কায়রোতে বার্তা নিয়ে যাচ্ছিলো। সুলতান যে কায়রো থেকে রওনা হয়ে এসেছেন, সে জানে না। মধ্যপথে সে একটি বাহিনীকে এগিয়ে আসতে দেখে। পতাকা দেখে বুঝে ফেলে এটি সুলতান আইউবীর ফৌজ। দূত বাহিনীর সম্মুখে চলে যায়। সুলতান আইউবী বাহিনীর সমুখ অংশে অবস্থান করছেন।
দূত ইযযুদ্দীনের পত্রখানা সুলতান আইউবীর হাতে দেয়। ইযযুদ্দীন নূরুদ্দীন জঙ্গী মরহুমের উপদেষ্টাদের একজন। পদমর্যাদায় একজন আমীরের সমান। লোকটি নিষ্ঠাবান ঈমানদার লোক। তাই তার প্রতি জঙ্গীর, বিশেষ দৃষ্টি ছিলো। জঙ্গী তাকে যথেষ্ট মূল্যায়ন করতেন। মৃত্যুর প্রাক্কালে সুলতান জঙ্গী তাকে হাব প্রদেশে কারাহেসার নামক একটি দুর্গ দান করে তার অধিপতি নিযুক্ত করে দিয়েছিলেন। বেশকিছু অঞ্চল এই দুর্গের অধীনে ছিলো। ইবনে লাউনের প্রদেশটিও তার অন্তর্ভুক্ত ছিলো, যিনি খৃষ্টানদের সঙ্গে খৃস্টান আর মুসলমানদের সঙ্গে মুসলমান হয়ে যেতেন। খৃস্টানদের মদদে তিনি ইযযুদ্দীনের অঞ্চলে সীমান্তের উপর হানা দিতে শুরু করেন। ইযযুদ্দীন একাকী তার মোকাবেলায় পেরে উঠতে পারছিলেন না। কিন্তু হাল্ব ও মসুল থেকেও তিনি সাহায্য নিতে চাচ্ছিলেন না। কারণ, হাল্ব ও মসুলের শাসনকর্তা আল-মালিকুস সালিহ ও সাইফুদ্দীন প্রমুখ যখনই সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তখন থেকেই তিনি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেছিলেন।
