আপনি জানেন, এ কাজের জন্য কী পরিমাণ প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়ে থাকে- মেজবান উত্তর দেয়- আমাদের কোন মেয়েই এতোটা চতুর নয়।
সে যাই হোক, এখানকার মুসলমানরা সামরিক প্রশিক্ষণ না গ্রহণ করুক, এটা জরুরী বলে স্বীকার করেন তো? বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করে।
আপনি কী নির্দেশ নিয়ে এসেছেন? মেজবান জিজ্ঞেস করে। নির্দেশ খুবই স্পষ্ট- বৃদ্ধ জবাব দেয়- রামাল্লায় সালাহুদ্দীন আইউবীর পরাজয় হয়েছে। কিন্তু এই পরাজয় তার কোন ক্ষতি করতে পারেনি। ইতিমধ্যে তিনি সব সামলে নিয়েছেন। তিনি ফৌজ প্রস্তুত করে ফেলেছেন। আমাদের গোয়েন্দারা কায়রো থেকে যে খবরাখবর প্রেরণ করছে, তা সুখকর নয়। সালাহুদ্দীন আইউবী কায়রো ত্যাগ করতে যাচ্ছেন। কিন্তু এখনো জানা যায়নি তিনি কোন্ দিকে রওনা হবেন এবং কোথায় আক্রমণ চালাবেন। এদিকে তার ভাই আল-আদিল দামেশক থেকে সাহায্য পেয়ে গেছেন। তিনি সম্রাট বল্ডউইনকে এমনভাবে পরাজিত করেছেন যে, এতো সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও তিনি পুনর্গঠিত হতে পারেননি। আপনি তো জানেন, সালাহুদ্দীন আইউবী গেরিলা ও কমান্ডো যুদ্ধ লড়ে থাকেন। আমাদের ফৌজের রসদ তার থেকে নিরাপদ থাকে না। হেমসের মুসলমানরা যদি তার গেরিলাদের জন্য আস্তানা করে দেয়, তাহলে এরা রসদ ও অগ্রসরমান সেনাদলের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়াবে।
এমনি পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেয়েদের দ্বারা মুসলমানদের মাঝে ফাটল ধরানো এবং তাদের চরিত্র ধ্বংসের কৌশল ব্যর্থ প্রমাণিত হবে। এসব কাজের জন্য স্থান-কাল স্বতন্ত্র হয়ে থাকে। সব ক্ষেত্রে সকল কৌশল কার্যকরী হয় না। আমি আমাদের সেই অফিসারদের জন্য বিস্ময় প্রকাশ করছি, যারা এখানে একটি মেয়েকে প্রেরণ করেছিলেন।
তাহলে কী করা যায়?
একদম ভিনিস- মেজবান তার ডান হাতটা তরবারীর ন্যায় ডানে-বাঁয়ে দুলিয়ে বললো- পুরো নগরটাকে মানুষজনসহ একদম নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। তখন আমরাও এখানে থাকতে পারবো না। আমরা প্রথমে আমাদের স্ত্রী সন্তান ও সহায়-সম্পদ এখান থেকে সরিয়ে ফেললো। আমি আশা করি, খৃষ্টান ম্রাট আমাদেরকে অন্যত্র পুনর্বাসিত হওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করবেন এবং আমাদের আর্থিক ক্ষতি পূরণ করে দেবেন। আমি ইহুদী। হাইকেলে সুলাইমানীর জন্য আমি আমার ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দিতে প্রস্তুত আছি।
কিন্তু নগরী ধ্বংসের ব্যবস্থা কী হবে?-বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করে- এ কাজের জন্য তো সেনাবাহিনীর প্রয়োজন।
ফৌজ আছে- ইহুদী বললো- সম্রাট বউইনের ফৌজের অবস্থান এখান থেকে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মাইল দূরে। আপনি সম্ভবত জানেন না, এই ফৌজ পিছপা হওয়ার পথের সমস্ত মুসলিম বসতি ধ্বংশ করে দিয়েছে। তাদের দ্বারা হেস ধ্বংস করানো যাবে। আমি আই রওনা হয়ে যায় এবং সম্রাট বুউইনকে বলবো, আমাদের এই নগরীটি তার বাহিনীর জন্য কতটুকু বিপজ্জনক।
নগরী ধ্বংস করা তো উদ্দেশ্য নয়- বৃদ্ধ লো- আমাদের উদ্দেশ্য তো হচ্ছে এখানকার একজন মুসলমানকেও বেঁচে থাকতে দেয়া যাবে না।
আর মেয়েদেরকে ফৌজ তুলে নিয়ে যাবে।
সকলে একমত হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, মেজবান ইহুদী আজ রাতেই সম্রাট জ্বল্টইনে ছাউনীর উদ্দেশ্যে রওনা হবে।
ইহুদী রওনা হয়ে যাওয়ান্ন সময় এক অশ্বারোহীকে নগরীতে প্রবেশ করতে দেখে। লোকটি অপরিচিত। খতীবের বাড়িটি দেখা যাচ্ছে। আরোহী খতীবে বাড়ির সম্মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। সে ঘোড়র পিঠ থেকে নেমে খতীবের গৃহের দরজায় করাঘাত করে। খতীব বেরিয়ে এসে লোকটির সঙ্গে হাত মেলান এবং তাকে ভেতরে নিয়ে যান।
লোকটি কায়রোর দূত। ইহুদী বললো।
ঈশার নামাযের পর। মুন্সল্পীরা চলে গেছে। পাঁচ-ছয়জন লোক খতীবের কাছে বসে আছে। তাদের মধ্যে অশ্বারোহী আগন্তুকও আছে। খতীব একজনকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করতে বললেন।
আমার বন্ধুগণ!- খতীব বললেন- আমাদের এই বন্ধু আল-আদিলের তফ থেকে সংবাদ নিয়ে এসেছে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী অতি তাড়াতাড়ি কায়রো থেকে রওনা হবেন। আপনারা সবাই সৈনিক এবং গেরিলা অপারেশনে দক্ষ। আপনাদের করণীয় কী বলা প্রয়োজন মনে করি না। প্রশিক্ষণ ও মহড়া জোরদার করুন। আল-আদিল এ সংবাদও প্রেরণ করেছেন যে, খৃস্টান সম্রাট বল্ডউইনের যে বাহিনী হামাত থেকে পালিয়ে গিয়েছিলো, তারা আমাদের কাছাকাছি কোথাও ছাউনি ফেলে অবস্থান করছে। তাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে এবং তাদের গতিবিধির সংবাদ আল-আদিলকে পৌঁছাতে হবে। তিনি নির্দেশ প্রদান করেছেন, আমরা খৃস্টামদের এই বাহিনীর উপর গেরিলা আক্রমণ চালাবো এবং কমান্ডো অভিযান অব্যাহত রাখবো, যাতে তারা স্থির হয়ে বসতে না পারে। সেই সঙ্গে আল-আদিল এ-ও বলেছেন, এই বাহিনী মুসলমানদের বহু জনপদ ধ্বংস করে দিয়েছে। সৈন্য স্বল্পতার কারণে তিনি তাদের ধাওয়া করতে পারেননি। তিনি আরো বলেছেন, বন্ডউইনের বাহিনী যদি পেছনে নিজ অঞ্চলে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাদের খাটাবে না। আমি আশঙ্কা করছি, লোকটা ক্ষিপ্ত হয়ে হেমস নগরীকে ধ্বংস করে দেবে। তিনি আমাদেরকে প্রশিক্ষণ ও মহড়া জোরদার করার আদেশ প্রদান করেছেন। হতে পারে, সুলতান আইউবী কোনদিকে আক্রমণ চালালে বল্ডউইন তাদের উপর পেছন কিংবা পার্শ্ব থেকে আক্রমণ করবেন। তখন আমাদেরকে বল্ডউইনের পেছন অংশের উপর গেরিলা হামলা চালাতে হবে এবং তাকে এখানেই আটকে রাখতে হবে।
