দিরা বুঝে ফেলে তাবরিজের মধ্যে ধর্মীয় চেতনা আছে; কিন্তু ভাবনায় গভীরতা নেই। ইচ্ছে করলে নতুন যে কোন ছছে তাকে গড়ে নেয়া সম্ভব। দিরা তার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে শুরু করে। বললো- আমি যদি বলি, আসো আমরা সারা জীবনের সফরে একত্রে থাকি, তাহলে তুমি কী উত্তর দেবে?
তাবরিজ মেয়েটির মুখ পানে তাকায়। মুচকি একটা হাসি দিয়ে খানিকটা উজ্জীবিতের ন্যায় বললো- চলো, রওনা হই। সূর্য উঠে গেছে। দেরি করলে সমস্যায় পড়বে।
দিরা নিজের অস্তিত্বে একটি বিপ্লব অনুভব করে, যার তাৎপর্য সে অলোভাবে বুঝতে পারছে না। উঠে তাবরিজের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করে। আয় দৃষ্টি যতোটা না পথের দিকে, তার চেয়ে বেশি তাবরিজের প্রতি। গত রাতে তাবরিজকে খুন করে হেস পালিয়ে যাওয়ার চিন্তায় বিভোর ছিলো। কিন্তু এখন তারত পথ চলতে ভালো লাগছে না। যতো দীর্ঘ সময় সম্ভব ভাবরিজের সঙ্গে থাকার বাসনা বিরাজ করছে তার মনে। চলতে চলতে একবার ভাবরিজের হাত চেপে ধরে দি বললো- আস্তে হাঁটো।
না, আমাদের দ্রুত হাঁটা উচিত- তাবরিজ বললো- অন্যথায় আরো একটি রাত এসে পড়বে।
আসতে দাও- দিরা বললো- আমি দ্রুত হাঁটতে পারছি না।
এখন তাড়াতাড়ি হাঁটো- তাবরিজ বললো-পরে হাঁটতে না পারলে পিঠে করে নেবো।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ভাই আল-আদিল খৃস্টান সম্রাট বউইনকে হামাতের বাইরে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেছিলেন, যার ফলে কাউইনের বাহিনী দিশা হারিয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে পেছনে সরে গিয়েছিলো। সেই যুদ্ধের কাহিনী আপনারা পাঠ করেছেন। বন্ডইন অনেক করে তার বিক্ষিপ্ত বাহিনীকে একত্রিত করেছিলেন। খুঁজে-পেতে জীবিত সৈন্যদের একত্রিত করার পর সম্রাট বুঝতে পারেন, তার কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। এখন বেঁচে আছে অর্ধেকের সামান্য বেশি সৈন্য। তিনি দামেশক দখল করতে এসেছিলেন। তার বিপুলসংখ্যক সৈন্য আল-আদিলের কমান্ডো আক্রমণে মারা গেছে। পিছপা হয়ে পালাবার পর অনেকে বিভিন্ন উপত্যকা ও বিজন অঞ্চলে পথ হারিয়ে ফেলেছে। তাদের কতিপয়কে মুসলমান রাখাল, যাযাবর ও গ্রামবাসীরা মেরে ফেলেছে এবং তাদের অস্ত্র-শস্ত্র ও ঘোড়াগুলো কেড়ে নিয়েছে।
বল্ডউইন যখন তার অবশিষ্ট সৈন্যদেরকে হামাত থেকে দূরে এক স্থানে একত্রিত করেন, তখন তাকে অবহিত করা হলো, আপনার ফৌজের যেসব সৈন্য ও কমান্ডার দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো, তারা মুসলমানদের হাতে নিহত হয়েছে। পরাজয়ের কারণে বল্ডউইনের অবস্থা অতিশয় শোচনীয়। বল্ডউইন বেজায় ক্ষুব্ধ। এই সংবাদে তার ক্ষোভ আরো বেড়ে গেছে। তিনি নির্দেশ প্রদান করেন, যেখানেই মুসলমানদের কোন বসতি চোখে পড়বে, লুট করো, যুবতী মেয়েদের তুলে নিয়ে আসে এবং কাজ সমাধা করে গ্রামে আগুন লাগিয়ে দাও।
নির্দেশমতো বল্ডউইনের বাহিনী পুনঃপ্রস্তুতি গ্রহণ করার লক্ষ্যে পিছপা হতে গিয়ে পথের মুসলিম বসতিগুলো একের পর এক ধ্বংস করে ফেলে।
এই বাহিনীটি এখন হেমস থেকে ছয়-সাত মাইল দূরে ছাউনি ফেলে অবস্থান করছে! বল্ডউইন চেষ্টা করছেন, কোন খৃষ্টান ম্রাট তার সাহায্যে এগিয়ে আসবেন, যাতে তিনি আল-আদিল থেকে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পারেন এবং নিজের শাসন ক্ষমতাকে যাকে তিনি ক্রুশের শাসন বলে দাবি করতেন- দামেশক পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয় বায়িত করতে পারেন। এ সুবাদেই তিনি অপর এক খৃষ্টান সম্রাট রেজিনান্ট অফ শাইতুনের নিকট গিয়েছিলেন।
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর দিরার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে বৃদ্ধ খৃষ্টান ও তার সঙ্গীরা রাতভর পথ চলতে থাকে এবং সকাল বেলা হেমস গিয়ে পৌঁছে। কাফেলার অন্যান্য লোকেরাও পৌঁছে গেছে। তাদের একজনও হেমসের অধিবাসী নয়। তাদের গন্তব্য আরো সম্মুখে। তাবরিজের শোস্তাদের সঙ্গে। তারা ঘোড়াটা এক মসজিদের ইমামের হাতে তুলে দিয়ে বললো, এটির মালিক হেমসের এক ব্যক্তি। লোকটি জলস্রোতে ঘোড়া থেকে পড়ে ডুবে গেছে এবং ঘোড়াটা তীরে উঠে এসেছে। ইমাম সাহেব ঘোড়াটা বুঝে নেন। কিছুক্ষণ পরই জানা গেলো ঘোড়াটা কার। ঘোড়া তাবরিজের ঘরে পৌঁছিয়ে দেয়া হলে ঘরে মাতম শুরু হয়ে যায়।
হেসে এক ইহুদী ব্যবসায়ীর বাড়ি ছিলো। অত্যন্ত ধনশালী মানুষ। যে লোকটি নিজেকে দিরার পিতা বলে দাবি করতো, সে সঙ্গীদেরসহ এই ইহুদীর ঘরে উপবিষ্ট। সে সংবাদ জানায়, দিরা পানিতে ডুবে মারা গেছে।
শুনে সকলে আক্ষেপ করতে থাকে। কিন্তু আক্ষেপে তো আর তাদের সমস্যার সমাধান হবে না। বৃদ্ধ ইহুদী মেজবানকে জিজ্ঞেস করে, হেমসের মুসলমানদের তৎপরতা ও পরিকল্পনা কী?
খুবই ভয়ঙ্কর- মেজবান উত্তর দেয় তাদেরকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এই নগরী সুলতান আইউবীর কমান্ডো সেনাদের আস্তানায় পরিণত হতে যাচ্ছে। মুসলমানদের বড় মসজিদের খতীব শুধু খতীবই নয়, ফৌজের কমান্ডার এবং প্রশিক্ষক মনে হচ্ছে।
আচ্ছা, নোকটাকে খুন করে ফেললে কী লাভ হবে? বৃদ্ধ খৃস্টান জিজ্ঞেস করে।
কোন লাভ হবে না-ইহুদী উত্তর দেয়- বরং ক্ষতি হবে। আমাদের উপর মুসলমানদের সন্দেহ সৃষ্টি হবে এবং তারা আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেবে। জানেন তো, এই নগরী মুসলমানদের শাসনাধীন এলাকা।
এখানকার ইহুদী-খৃষ্টান পরিবারগুলোর মেয়েরা কি কিছু করতে পারে না? বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করে।
