দিরা তাৰরিজের হাত থেকে রোমালটা নিয়ে এমনভাবে বেরিয়ে যায়, যেনো একজন বোবা ও বধির শিশু কারো ইঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করেছে। তাবরিজের সঙ্গে যে খাদ্য-পানীয় ছিলো, তা ঘোড়ার সঙ্গে বাঁধা ছিলো। এখন তার কাছে খাওয়ার কিছুই নেই।
তাবরিজ দিরার অপেক্ষায় বসে আছে।
***
দিরা হাত-মুখ ধুয়ে আসে। দেখে তাবরিজ হঠাৎ চমকে ওঠে, যেনো নতুন কাউকে দেখছে। এতোক্ষণ দিরার মাথার চুলগুলো মাটিমাখা ও এলোমেলো ছিলো। আপন রূপটা তার চাপা ছিলো। ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হওয়ার পর এখন মেয়েটির আসল রূপ ফুটে উঠেছে। এখন তাবরিজ তাকে চিনতেই পারছে না। এমন যাদুকরী চুল মাথায় নিয়ে ফিরছে দিরা, যা তাবরিজ কল্পনাও করেনি। এমন রূপ অতীতে কখনো কল্পনাও করতে পারেনি তাবরিজ। দিরার সুদর্শন মুখাবয়ব এবং মনোহরী আখিযুগল তাবরিজকে হতবাক করে দেয়। তাবরিজ সেই তাবৱিজের হাত থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে, যে খানিক আগে আল্লাহর দরবারে দণ্ডায়মান ছিলো। সে অনেক কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে বললো- খাওয়ার কিছু নেই। আমাদের উপোস করেই সফর করতে হবে। চলো রওনা হই। বলেই তাবরিজ দাঁড়াতে উদ্যত হয়।
দিরা তার কাঁধে হাত রেখে বললো- একটু বসো, আমি তোমাকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করতে চাই, কিছু জানতে চাই।
সারাটা রাত তাবরিজ মেয়েটির জন্য মহা এক আতঙ্ক হয়ে ছিলো। কিন্তু এখন তার মানসিক অবস্থা এমন, যেনো মেয়েটি তার উপর জয়ী হয়ে গেছে। তাবরিজ কিছু না বলে উঠতে উঠতে বসে পড়ে।
আচ্ছা, তুমি যখন খোদার সঙ্গে কথা বলছিলে, তখন কি তুমি খোদাকে দেখতে পাচ্ছিলে? দিরার প্রথম প্রশ্ন।
আমি আল্লাহকে দেখি না- তাবরিজ উত্তর দেয়- আমি আলেম নই, তাই বলতে পারবো না দেখা না দিয়েই আল্লাহ কীভাবে নিজের অস্তিত্বের অনুভূতি দান করে থাকেন। আমি শুধু এটুকু জানি, আল্লাহ আমার কথা ও দুআ শোনেন।
তুমি কি নিশ্চিত, যিনি আমাকে উত্তাল নদীর নিমজ্জন থেকে রক্ষা করেছেন, তিনি খোদা-ই ছিলেন? দিরা জিজ্ঞেস করে।
খতীব আমাদেরকে বলেছেন, আত্মা যদি পবিত্র হয়, তাহলে আল্লাহ যে কোন বিপদে-সমস্যায় সাহায্য করে থাকেন- তাবরিজ উত্তর দেয়- আমি যদি এই নিয়তে তোমাকে রক্ষা করার চেষ্টা করতাম যে, তুমি অতিশয় রূপসী মেয়ে। মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে আমি তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবো, তাহলে আমিও তোমার সঙ্গে ডুবে মরতাম।
কিন্তু আমার আত্মা তো পবিত্র নয়- দিরা ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললো আল্লাহ আমাকে কেন সাহায্য করেছেন? তিনি আমাকে কেন নিমজ্জন থেকে রক্ষা করেছেন?
হেমস গিয়ে খতীবকে জিজ্ঞেস করবো- তাবরিজ উত্তর দেয়- আমার অতো জ্ঞান নেই।
আচ্ছা, তুমি আমার দেহটাকে এভাবে উপেক্ষা করলে কেন? দিরা জিজ্ঞেস করে।
একজন নারী হিসেবে তুমি আমার যে আচরণের ভয়ে শঙ্কিত ছিলে, আমি যদি তা-ই করতাম, তাহলে আমি তোমার খঞ্জর থেকে রক্ষা পেতাম না– তাবরিজ উত্তর দেয়- আমার হাতে তুমি আল্লাহর আমানত। আর… তাবরিজ চুপ হয়ে যায়। খানিক পর অলক্ষ্যে বলে ওঠে- তুমি অতিশয় সুন্দর এক আমানত। চলে রওনা হই।
তাবরিজ অস্থির মনে উঠে দাঁড়াতে উদ্যত হয়। দিরা তাকে ধরে রাখে। তাবরিজ বললো- আমাকে নিজের কাছে বসিয়ে রেখো না দিরা। এমন কঠিন পরীক্ষায় আমাকে ফেলো না বোন! তুমি আমাকে মহান আল্লাহর সমীপে অবনত থাকতে দাও।
তোমার আল্লাহর কসম- দিরা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললো- আমাকেও তোমার আল্লাহর সম্মুখে অবনতমস্তক হওয়ার যোগ্য বানিয়ে দাও। তুমি অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। তুমি খোদার দূত।
দিরার চোখে অশ্রু এসে যায়।
তুমি কাঁদছো কেন? তাবরিজ জিজ্ঞেস করে।
আমি একটি পাপী মেয়ে- দিরা উত্তর দেয়- খোদা আমার প্রতি রুষ্ঠ। আমার উট যখন আমাকেই স্রোতের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলো, তখনও আমার খোদার কথা মনে আসেনি। আমি মনে করতাম, দেহটাই সব। এই দেহটা আমাকে রক্ষা করতে হবে। পরে নদীর গ্রাস থেকে রক্ষা করে তুমি যখন আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলে, তখনও আমার একই ভাবনা ছিলো, তোমার থেকে আমার দেহটা রক্ষা করতে হবে। নিজের শরীরটা রক্ষা করার লক্ষ্যেই আমি তোমাকে খুন করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমি ব্যর্থ হলাম। আমি নদীর তরঙ্গ থেকেও বেঁচে গেলাম, তোমারু থেকেও রক্ষা পেয়ে গেলাম। কিন্তু তোমার ইবাদত আর দুআ আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, আমাকে রক্ষাকারী শক্তি অন্য কিছু ছিলো। বলল, সেই শক্তিটা কী? কোথায়?
এটি আল্লাহর শক্তি- তাবরিজ উত্তর দেয়- এটি আত্মার পবিত্রতার সুফল।
আমার গোটা জীবন একটি পাপ।
স্পষ্ট বুঝিয়ে বলো- তাবরিজ বললো- তুমি কি নর্তকি? আমীর উজিদের কাছে থাকো? আমি শুনেছি, এ ধরনের মেয়েরা খুবই সুন্দরী হয়ে থাকে। তোমার মতো রূপসী মেয়ে আমি কখনো দেখিনি।
দিরার মুখে কথা নেই। চোখে অশ্রু নেমে এসেছে। হঠাৎ জায়গা থেকে সরে তাবরিজের ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়। কিন্তু তাবরিজ দূরে সরে বসে। দিরা বললো- আমাকে ভয় পাচ্ছো? ঝড়-জুলোচ্ছাসের ভীতি এখনো আমাকে তাড়া করে ফিরছে। তুমি আমাকে তোমার কাছে রাখ।
না- তাবরিজ এক বিস্ময়কর হাসি হেসে বললো- তুমি আমার এতো কাছে এসো না। আমি বিচ্যুৎ হয়ে যাবো।
দেখছে তো আমি কতো বড় গুনাহগার- দিরা বললো- তুমি এ কারণে আমার থেকে দূরে থাকতে চাচ্ছে যে, তুমি বিচ্যুৎ হয়ে যাবে। আমি বহু মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছি।
