তাবরিজ ফজর নামায আদায় করছে। তাবরিজের নামায পড়ার দৃশ্যটাই দেখে ফেলেছে খৃস্টান মেয়ে দিরা।
দিরা পরিধানের পোশাকটা ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নেয়। রাতে না ঘুমানোর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিদ্রা তাকে জড়িয়ে ধরেছিলো। ঘুম ভাঙ্গার পর সর্বপ্রথম তাবরিজের কথা মনে পড়ে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে গাটা ছমছম করে ওঠে। কিন্তু মেয়েটি বুঝতে পারে, যে অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েছিলো সেই অবস্থায়ই জেগেছে। সব ঠিক আছে তার।
মেয়েটি তাবরিজকে মহান আল্লাহর দরবারে সেজদাবনত দেখতে পায়। পরিস্থিতিটা আগাগোড়া স্বপ্ন বলে মনে হলো তার কাছে। দিরা জানতো, মুসলমান জংলী জাতি। কিন্তু তাবরিজের মতো একজন সুঠাম দেহের অধিকারী যুবকের তার মতো এক রূপসী যুবতীর প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপই নেই! এ কেমন জংলীপনা! তাবরিজকে স্বপ্ন জগতের মানুষই মনে হচ্ছে তার।
দিরা পবিত্র মেয়ে নয়। শৈশব থেকেই তাকে চরিত্রহীনতা ও শয়তানি কর্মের প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে। রূপ এবং দেহের আকর্ষণকে জাদুর ন্যায় ক্রিয়াশীল বানানোর বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। যৌবনে পদার্পন করা পর্যন্ত যৌনতা আর অসচ্চরিত্রতা স্বভাবে পরিণত হয়ে গেছে। কিন্তু মানব স্বভাবের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, যতোই চেষ্টা করা হোক না কেন মানুষের সৃষ্টিগত মৌলিকত্ব ধ্বংস করা যায় না। মানুষ অনৈতিকতা ও আদর্শহীনতার যতোই গভীরে নিমজ্জিত হোক, কোন দিন সুযোগ পেলে তার আসল রূপটা ভেসে ওঠে। মানুষ সুপথে ফিরে আসে। দিরা যেভাবে মৃত্যুর মুখে চলে গিয়েছিলো, সেখান থেকে উদ্ধার লাভের পর এখন তার মন-মস্তিষ্কে নতুন ভাবনা জাগতে শুরু করেছে। মেয়েটি জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে নিরাপদে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু ভয় এখনো কাটেনি। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে তাবরিজ ভীতি। এই মুসলমান যুবকটির ব্যাপারে তার অন্য কোন ভয় নেই। একটিই ভয়, লোকটি যদি যাযাবর কিংবা বেদুইন হয়ে থাকে, তাহলে তাকে কারো নিকট বিক্রি করে দেবে। মেয়েটি বিক্রি হওয়ার পরের কষ্টদায়ক জীবনের ভয় করছে।
রাত কেটে গেছে। তাবরিজ মেয়েটির এই মনোহারী দেহটার প্রতি কামনার দৃষ্টিতে একবারের জন্যও তাকায়নি। মেয়েটি অবচেতনের মতো ঘুমিয়ে পড়েছিলো। তারপরও তাবরিজ তার থেকে দূরে থেকেছে। সকালে যখন পূর্ব আকাশে সূর্য উদিত হয়, ততোক্ষণে মেয়েটির সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। বিদূরিত হয়েছে তাবরিজের ভয়ও। রাত, নাগাদ মেয়েটি তাবরিজকে বেরসিক, অনুভূতিহীন ও মৃতপ্রাণ কাপুরুষ মনে করছিলো। কিন্তু লোকটাকে তার গভীর দৃষ্টিতে দেখতে ইচ্ছে হলো। তাবরিজের ঠোঁট দুটি নড়ছে। দিরার মনে হচ্ছে, লোকটা সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলছে। তার তাবরিজের একটি উক্তি মনে পড়ে যায় আল্লাহ কেবল তাদেরকে সাহায্য করেন, যাদের নিয়ত ও আত্মা পবিত্র।
তৎক্ষণাৎ দিরার মনে পড়ে যায়, তার নিয়ত তো পবিত্র নয়। তারিজের জাতির জন্য সে আপাদমস্তক একটি প্রতারণা। মেয়েটি রাতে এই সিদ্ধান্ত ঠিক করে রেখেছিলো, নিজেকে তাবরিজের হাতে তুলে দিয়ে বলবে, তুমি যা খুশি করো, বিনিময়ে আমাকে হেস পৌঁছিয়ে দাও।
আর আত্মা? দিরা জীবনে এই প্রথমবার অনুভব করলো, তার দেহ আত্মা থেকে বঞ্চিত। আর থেকেও যদি থাকে, তা অপরাধ-অশ্লীলতার আবর্জনায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু মরে যায়নি। দিরার উপর দিয়ে যে ঝড় অতিক্রান্ত হয়েছে, তাতে তার আত্মা জেগে ওঠেছে, যা এখন তাকে লজ্জিত করে চলছে। তাবরিজের দেহাবয়বটা এখন তার কাছে অন্য রকম মনে হচ্ছে। তাবরিজকে ফেরেশতা বলে মন হচ্ছে। ফেরেশতা না হলে খোদার সঙ্গে কথা বলতে পারে নাকি। দিরার চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে শুরু করে। অশ্রু যতোই ঝরছে, মনে হচ্ছে, ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্বটা তাবরিজের অস্তিত্বের মধ্যে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
তাবরিজ দুআর জন্য হাত উত্তোলন করে। বোধ হয় সে ভুলে গেছে, গুহায় আরো একজন মানুষ আছে। তাবরিজ কণ্ঠ ছেড়ে দিয়ে দুআ করছে —
মহান আল্লাহ! তুমি আমাকে সব রকম পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত থাকার হিম্মত দান করো। আমাকে তুমি এমন পবিত্রতা ও সচ্চরিত্র দান করো, যেনো তোমার এই সুন্দর আমানতটা কোন প্রকার খেয়ানত ব্যতীত গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দিতে পারি। তোমার এই বান্দা দুর্বল, অসহায়। তুমি আমাকে শয়তানের মোকাবেলা করার সাহস দান করো।
তাবরিজ আকাশের ফেরেশতা নয়- মাটির মানুষ, রক্ত-মাংসের মানুষ। লোকটি আল্লাহর নিকট মানবীয় দুর্বলতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছে। দুআ শেষ করে মুখে হাত বুলিয়ে পেছনে ঘুরে তাকায়। দিরা তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটির গণ্ড বেয়ে অশ্রু ঝরছে। তাবরিজ কিছুক্ষণ মেয়েটির প্রতি তাকিয়ে থাকে। মেয়েটিও মূর্তির ন্যায় তার প্রতি তাকিয়ে আছে।
বাইরে যাও- তাবরিজ দিরাকে বললো- ওদিকে পরিস্কার পানির ঝরনা আছে। হাত-মুখ ধুয়ে এসো। তাবরিজ নিজের মাথায় জড়ানো মোটা কাপড়ের হাত দুয়েক লম্বা রোমালটা নামিয়ে দিরাকে দিতে দিতে বললো- ভালোভাবে হাত-মুখ ধুয়ে মাথার চুলগুলোও ঝেড়ে-মুছে নাও। জলোচ্ছাসে নিপতিত হওয়ার আগে তুমি যে অবস্থায় ছিলে, আমি ঠিক সেইরূপ তেমাকে তোমার স্বজনদের হাতে পৌঁছিয়ে দিতে চাই।
