তোমার হাতে আমি অসহায়- দিরা ক্ষীণ কণ্ঠে বললো- শিকার মারার আগে তার সঙ্গে যে আচরণ করা হয়, তুমি আমার সঙ্গে সেই পশুসুলভ আচরণ করো না।
বলছি, ভেজা পোশাকটা খুলে ফেলল। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেই তাবরিজ বাইরে বেরিয়ে যায়।
তাবরিজ আড়ালে চলে গেছে। সেখান থেকে দিরাকে দেখা যায় না। দিরা সামান্য এগিয়ে গিয়ে তাকায়। তাবরিজ গুহার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গুহার অভ্যন্তরে প্রজ্বলমান আগুন এতো বেশী জ্বলছে যে, আলোটা তাবরিজের পিঠে গিয়ে পড়েছে।
দিরা বুকের ভেতর হাত ঢুকায়। ভেতরে কোমরের সঙ্গে কাপড় বাঁধা আছে। সেই বস্ত্রের মধ্যে খঞ্জর লুকানো। খঞ্জরটা বের করে দিরা পা টিপে টিপে সম্মুখে এগিয়ে যায়। তাবরিজ সম্পূর্ণ অসতর্ক দাঁড়িয়ে আছে। দিরা তার থেকে মাত্র এক পা দূরে। মেয়েটি খঞ্জরটা ডানদিকে নিয়ে তাবরিজের ডান পাজরে সেঁধিয়ে দেয়ার লক্ষে আঘাত হানে। তাবরিজ বিদ্যুতিতে মোড় ঘুরিয়ে দিদার ডান হাতটা ধরে ফেলে এতো জোরে মোচড় দেয় যে, দিরা ঘুরে যায় এবং তার হাত থেকে খঞ্জরটা পড়ে যায়।
তাবরিজ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো, তার কয়েক পা সামনেই আরেকটি টিলা। আগুন তাবরিজের পেছনে। তাবরিজ সম্মুখের টিলার গায়ে নিজের ছায়া দেখতে পায়। মেয়েটি আঘাত হানতে উদ্যত হলে তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ছায়ার ডান বাহু ডানে বিস্তৃত হয়ে যাওয়া মাত্র তাবরিজ খঞ্জরের ছায়াটা স্পষ্ট দেখে ফেলে। দিরা তাবরিজের পাজরে আঘাত হেনে তার পেটটা ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েছিলো। ছায়ার নড়াচড়া দেখে তাবরিজ পেছন দিকে ঘুরে গিয়ে মেয়েটির হাতের কব্জি ধরে ফেলে। মেয়েটির হাত থেকে খঞ্জরটি তুলে নেয়। তাবরিজ খঞ্জরের আগাটা মেয়েটির দিকে তাক করে ধরলে মেয়েটি হাঁটু গেড়ে তার সম্মুখে বসে পড়ে এবং হাতজোড় করে অনুনয় করতে শুরু করে যা বলবে শুনবো; আমাকে খুন করো না।
অন্য কোন কথা নেই। বলছি গায়ের ভেজা পোশাকটা খুলে আমার জামাটা পরে নাও- তাবরিজ আদেশের ভঙ্গিতে বললো- দেখেছে তো, আমাকে খুন করার সাধ্য তোমার নেই। আমার চোখ তো সামনেই আছে, পেছনে নয়। তাহলে তোমার আক্রমণটা দেখলাম কীভাবে? আত্মার চোখে দেখেছি। ইচ্ছা করলে কি আমি আমার সামনে তোমাকে পোশাক খোলাতে পারি না। কিন্তু আমি তোমাকে উলঙ্গ দেখতে চাই না। নাও, কাপড়টা বদলে নাও।
তাবরিজ পুনরায় বেরিয়ে গিয়ে পূর্বের স্থানে দাঁড়িয়ে থাকে। দিরা গুহার এক কোণে চলে যায়। তাড়াতাড়ি করে গায়ের ফ্রকটা খুলে। তারপর সেমিজটাও খুলে ফেলে তাবরিজের জামাটা পরিধান করে। দিরার সর্বাঙ্গ ঢেকে যায়। এবার তাবরিজকে ডাক দিয়ে বললো- কই এসে পড়ো।
তাবরিজ ভেতরে প্রবেশ করে। দিরার ফ্রকটা আগুনের উপর ধরে শুকাতে শুরু করে। দিরা লুকিয়ে লুকিয়ে তাবরিজকে দেখতে থাকে। তাবরিজ কোন কথা বলছে না। তার নীরবতা দিরাকে অস্থির করে তুলছে। তার বিশ্বাস হচ্ছে না, এই তাগড়া সুদর্শন যুবকটা তাকে ক্ষমা করবে। এখন তো খঞ্জর তার হাতে।
তাবরিজ চুপচাপ দিরার পোশাক শুকাতে থাকে। শুকিয়ে গেলে ফ্রকটা মেয়েটির হাতে দিয়ে বললো, পরে নাও। বলেই তাবরিজ গুহা থেকে বেরিয়ে যায়। মেয়েটি আবারও সভয়ে পোশাক পরিবর্তন করে তাবরিজকে ভেতরে ডেকে আনে।
তোমার কাছেই রাখো- তাবরিজ খঞ্জরটা দির দিকে ছুঁড়ে মেরে বললো- ঘুমিয়ে পড়ো। সকালে রওনা হবো।
তুমি আমাকে ধোঁকা দিচ্ছো- দিরা বললো- নাকি তুমি অনুভূতিহীন ও মৃত মানুষ?
আমি অনুভূতিহীন মৃত কিনা প্রমাণ করবো তোমার বাহিনীর সামনে তাবরিজ উত্তর দেয়- আমার অন্তরে তোমার বিরুদ্ধে কোন শত্রুতা নেই। আমি তোমাদের সেই সম্রাটদের শত্রু, যারা আমার মাতৃভূমি দখল করতে এসেছে এবং যারা আমাদের প্রথম কেবলা দখল করে আছে।
তোমাদের ভুল তথ্য দিয়ে উত্তেজিত করা হচ্ছে- দিরা বললো- তুমি অশিক্ষিত গ্রাম্য মানুষ। যাকে তুমি প্রথম কেবলা বলছে, ওটা ইহুদীদের উপাসনালয়। ওটা হাইকেলে সুলায়মানী। সালাহুদ্দীন আইউবী তার সাম্রাজ্য বিস্তৃত করতে চাচ্ছেন। তিনি তোমাদের ন্যায় সহজ-সরল যুবকদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলতে বলে বেড়াচ্ছেন- ওটা প্রথম কেবলা, ওটা মসজিদ।
আমরা আমাদের খতীব ছাড়া আর কারো কথা শুনে না- তাবরিজ বললো- তুমি শুয়ে পড়ো। আমি তোমার কোন কথা শুনবো না।
আমার ঘুম আসছে না- দিরা বললো- তোমাকে আমার ভয় লাগছে। আচ্ছা, তোমাদের খতীব হেমসেরই লোক, নাকি অন্য কোথাও থেকে এসেছেন?
তিনি হেমসেরই নাগরিক- তাবরিজ উত্তর দেয় এবং জামাটা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়ে।
দিরার গুপ্তচরবৃত্তি এবং চরিত্র ধ্বংসের প্রশিক্ষণ আছে। দামেশকে তাকে এ লক্ষ্যেই পাঠানো হয়েছিলো। আর এখনো একই উদ্দেশ্যে হেমস যাচ্ছিলো। মেয়েটি হেমসের খতীব এবং সেখানকার মুসলমানদের তথ্য নেয়ার জন্য অনেক প্রশ্ন করছে। কিন্তু তাতে তাবরিজের কোন আগ্রহ নেই। এসব আলাপচারিতায় অনীহা প্রকাশ করে চলেছে সে। মেয়েটি চেষ্টা করছে, যাতে চোখে ঘুম না আসে। কিন্তু এক সময় তার দুচোখের পাতা বুজে আসে। দিরা ঘুমিয়ে পড়ে।
***
সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেলে দিরা চোখ দুটো কচলাতে কচলাতে ধড়মড় করে উঠে বসে। বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। দিরা অর্ধ মুদিত ফ্যাল ফ্যাল চোখে এদিক-ওদিক তাকায়। দেখে, তাবরিজ বিশেষ এক ভঙ্গিতে নিজ মাথাটা মাটিতে ঠেকিয়ে রেখেছে। কিছুক্ষণ পর মাথা তুলে বসে। আবার মাথা মাটিতে ঠেকায়। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে যায়।
