এমন মূল্যবান একটা মেয়েকে হারিয়ে ফেলার দায়ে যদি তারা আমাদেরকে মৃত্যুদণ্ড না দেয়, তাহলে মনে করবো, তারা অনেক দয়ালু হয়ে গেছে- বৃদ্ধ বললো- মেয়েটি কীভাবে ডুবলো জিজ্ঞেস করলে কী উত্তর দেবো?
বলবো, আমরা প্রবল তরঙ্গের মধ্যে নিপতিত হলে মেয়েটি খামখেয়ালী করেছে- ইহুদী বললো- আমাদের কথা অমান্য করতে গিয়ে তার এই পরিণতি ঘটেছে। জিদ ধরে বললো, আমি আলাদা উটে চড়ে একাকী নদী পার হবো। হঠাৎ একটি ঢেউ এসে তাকে আমাদের থেকে দূরে নিয়ে গেছে। তারই হঠকারিতার কারণে আমরা তাকে রক্ষা করতে পারিনি।
যা খুশি বলো- এক খৃস্টান বললো- আমাদের এ বিচ্যুতি যদি ক্ষমাও করে দেয়া হয়, তবুও কি অনুতাপের কথা নয় যে, এমন একটা দক্ষ ও কর্মঠ মেয়ে নষ্ট হয়ে গেছে? অন্য মেয়ে এনে তার স্থান পূরণ করতে এক মাসেরও বেশী সময় লেগে যাবে।
আমি কতবার পরামর্শ দিয়েছিলো, এ কাজে আমাদের দুটি মেয়ের প্রয়োজন- বৃদ্ধ বললো- হেমসের মুসলমানরা উত্তেজনায় ফেটে যাচ্ছে। কোন সন্দেহ নেই, তারা যে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে, তা সাময়িক কিংবা আবেগতাড়িত নয়। আমি গভীরভাবে তাদের প্রশিক্ষণ লক্ষ্য করেছি। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, এটা গেরিলা অপারেশন ও কমান্ডো হামলার নিয়মতান্ত্রিক প্রশিক্ষণ। আমি তাদের চারজন প্রশিক্ষক দেখেছি। তাদের কায়রো কিংবা দামেশক থেকে পাঠানো হয়েছে। লোকগুলোকে কমান্ডো মনে হচ্ছে।
তারা যদি আমাদের শাসনাধীন হতো, তাহলে আমরা দেখে নিতাম কীভাবে তারা সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। এক খৃষ্টান বললো।
তুমি কি মনে করো এখানে তারা প্রশিক্ষণ পরিপূর্ণ করতে পারবে? ইহুদী বললো- আমরা তাদের মাঝে আপসে সংঘাত বাঁধিয়ে দেবো।
এ লক্ষ্যেই তো আমি মেয়েটিকে দামেশক থেকে এনেছিলাম- বৃদ্ধ বললো- হেসে অরাজকতা সৃষ্টি করার দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। আমি এই মেয়েটির কথা বললাম। তারা বললো, তুমি মেয়েটির পিতা হয়ে যাও এবং তাকে নিয়ে হেমস চলে যাও। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে, বসতি স্থানান্তর করছি।
লোকগুলো রাতের অন্ধকারে পথ চলছে আর নিজেদের গোপন মিশন সম্পর্কে কথা বলছে। বৃদ্ধ খৃষ্টানদের অভিজ্ঞ গুপ্তচর এবং ঈমান ও চেতনা বিধ্বংসের ওস্তাদ। সে তার সঙ্গীদের বললো- মুসলমান সর্বত্র সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। দামেশকে নূরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা স্ত্রী মেয়েদেরকে যথারীতি সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। আমি সবখানে মুসলমানদের মাঝে এই জোশ দেখতে পেয়েছি। তবে হেল্স ও তার আশপাশের অঞ্চলগুলো আমাদের জন্য এতো গুরুত্বপূর্ণ যে, এসব অঞ্চলে মুসলিম গেরিলাদের ঘাঁটি গাড়ার সুযোগ না পাওয়া উচিত। আমি জানতে পেরেছি, এটি সালাহুদ্দীন আইউবীর একটি গোপন পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা সফল না হওয়া দরকার।
হেমস সীমান্তবর্তী শহর- ইহুদী বললো- যদি মুসলমানরা এখানে ঘাঁটি গেড়ে বসতে পারে, তাহলে আমাদের জন্য বিপজ্জনক হবে। এখানকার মুসলমাদেরকে বরং সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে উস্কে দিয়ে তাদেরকে দলে ভিড়িয়ে নেয়া প্রয়োজন।
এটা সম্ভব নয়- বৃদ্ধ বললো- আমাকে অবহিত করা হয়েছে, আমাদের লোকেরা নাকি অনেক গুজব ছড়িয়েছে। কিন্তু মুসলমানরা তাতে কান দিচ্ছে না। আমাকে এও বলা হয়েছে, তাদের খতীব নাকি বেশ প্রভাবশালী মানুষ এবং মুসলমানদের সামরিক প্রশিক্ষণ তারই নির্দেশনা ও পরিকল্পনা মোতাবেক চলছে। মেয়েটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর এখন আমার হেমস না যাওয়াই উচিত ছিলো। কিন্তু তারপরও এই জন্য যাবো যে, দেখতে হবে খতীব লোকটি কে এবং সে আলেম নাকি কোন সেনা কমান্ডার। আমাদেরকে হেসের খৃস্টান ও ইহুদী পরিবারগুলো থেকে দু একটি মেয়ে সংগ্রহ করতে হবে, যারা এই মিশনে আমাদের সাহায্য করবে। মেয়েদের কাজ কী, তা তোমাদের জানা আছে।
আমি তোমাদেরকে দামেশকেও বলেছিলাম, এখানকার মুসলমানরা পাকা ঈমানদার- এক খৃস্টান বললো- এ পর্যন্ত আমরা তাদের একজনকেও ক্রয় করতে পারিনি।
আমি সারা জীবন সেই নদীটির উপর অভিশম্পাত করবো, যে আমাদের দিরাকে আমাদের থেকে কেড়ে নিয়েছে।
***
আমার নাম দিরা- তবিরিজের প্রশ্নের জবাবে মেয়েটি বললো আমরা গরীব মানুষ। মুসলমানরা দামেশকে আমাদের বেঁচে থাকা অসম্ভব করে দিয়েছে। খোদা যেনো গরীবের মেয়েকে রূপ না দেন। বড় বড় আমীরগণ আমাকে ক্রয় করার চেষ্টা করেছে। একজন আমাকে অপহরণ করতে চেয়েছিলো। আমার পিতা আমাকে কাজীর নিকট নিয়ে যান। তিনি আমার ফরিয়াদ শুনেন এবং আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু সেখানকার শাসন মুসলমানদের হাতে। আমাদের ভয় দূর হয়নি। আমার পিতা দামেশক থেকে বের হয়ে যাওয়াই শ্রেয় ভাবলেন। হেসে আমাদের আত্মীয় আছে। এখন আমরা তাদের নিকট যাচ্ছিলাম। জানি না আব্বা বেঁচে আছেন কিনা। আচ্ছা, তুমি কি একটি অসহায় নিরাশ্রয় নারীর উপর দয়া করবে না?
রাত অতিক্রান্ত হতে থাকে। বৃদ্ধ খৃষ্টান- দি যাকে পিতা বলে দাবি করছে- সঙ্গীদেরসহ বহুদূর এগিয়ে গেছে।
আমার জামা শুকিয়ে গেছে- তাবরিজ জামাটা দিরার প্রতি ছুঁড়ে দিয়ে বললো- আমি বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছি। ওঠো, গায়ের ভেজা জামাটা খুলে এটা পরে নাও। লম্বা আছে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে যাবে। পরে নিজেরটা শুকিয়ে বদলে ফেলল।
