তাই সুলতান আইউবী কখনো নিজের হেফাজতের কথা ভাবেননি। কিন্তু গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ান এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ সজাগ। খৃষ্টানদের কোন ষড়যন্ত্র যেনো সফল হতে না পারে, তার জন্য তিনি সুলতান আইউবীর চারদিকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার আয়োজন করে রেখেছিলেন।
আজ কক্ষে বসে সুদানীদের ব্যাপারে নায়েবদের নির্দেশনা দিচ্ছেন সুলতান। হঠাৎ নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রান্তসীমায় এসে দাঁড়িয়ে যায় দুটি ঘোড়া। আরোহী দুজন মিগনানা মারিউস ও মুবী। তারা ঘোড়ার পিঠ থেকে অবতরণ করে। এগিয়ে এসে ঘোড়ার বাগ হাতে নেয় পিছনে পিছনে হেঁটে আসা আরেকজন লোক। নিরাপত্তা কমাণ্ডারের সঙ্গে কথা বলে মুবী। বলে, সঙ্গের লোকটি আমার পিতা। আমরা সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছি। মিগনামা, মারিউসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে কথা বলে কমাণ্ডার। সে সাক্ষাতের হেতু জানতে চায়। না শোনার ভান করে নিপ দাঁড়িয়ে থাকে লোকটি। পাশের থেকে মুবী বলে–ইনি বধির ও বোবা। এর সাথে কথা বলে লাভ নেই। সাক্ষাতের উদ্দেশ্য আমি সরাসরি সুলতানকে কিংবা ঊর্ধ্বতন অফিসারকেই জানাবো।
কক্ষের বাইরে টহল দিচ্ছিলেন আলী বিন সুফিয়ান। মিগনানা মারিউস ও মুবীকে দেখে তিনি এগিয়ে আসেন। আসোলামু আলাইকুম বলে সালাম দিলে ওয়ালাইকুমুস সালাম বলে জবাব দেয় মুবী। কমাণ্ডার তাঁকে বললেন, এরা সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে চায়। আলী বিন সুফিয়ান মিগনানা মারিউসকে সাক্ষাতের কারণ জিজ্ঞেস করেন। মুবী বললো, ইনি আমার পিতা। কানে শুনেন না, কথা বলতে পারেন না। আলী বিন সুফিয়ান বললেন, সুলতান এ মুহূর্তে কাজে ব্যস্ত। অবসর হলে হয়তো সময় দিতে পারেন। তার আগে আমাকে বলল, তোমরা কেন এসেছে; দেখি আমি-ই তোমাদের সমস্যার সমাধান করতে পারি। কিনা। হোট-খাট অভিযোগ শোনবার জন্য সুলতান সময় দিতে পারেন না। সংশ্লিষ্ট বিভাগ জনতার অনেক সমস্যার সমাধান দিয়ে থাকে।
কেন, সুলতান কি একটি নির্যাতিত নারীর ফরিয়াদ শুনবার জন্য সময় দিতে পারবেন না? আমার যা কিছু বলার, তাঁর কাছে-ই বলবো। বললো মুবী।
আমাকে না বলে আপনি সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন না। বলুন, আপনার ফরিয়াদ আমি-ই সুলতানের কাছে পৌঁছিয়ে দেবো। প্রয়োজন মনে করলে তিনি-ই আপনাদের ডেকে নেবেন। একথা বলে-ই আলী বিন। সুফিয়ান তাদেরকে নিজের কক্ষে নিয়ে যান।
উত্তরাঞ্চলের একটি পল্লী এলাকার নাম উল্লেখ করে মুবী বললো–দু বছর আগে সুদানী বাহিনী এ অঞ্চল দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলো। তাদের দেখার জন্য মহল্লার নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোররা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে আমিও বেরিয়ে আসি। হঠাৎ এক কমাণ্ডার ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে আমার নিকটে এসে জিজ্ঞেস করে, তোমার নাম কী? আমি আমার নাম জানালে তিনি আমার পিতাকে ডেকে পাঠান। আড়ালে নিয়ে গিয়ে বাবাকে কানে কানে কী যেন বললেন। দূর থেকে এগিয়ে গিয়ে একজন বললো, ইনি তো বোবা ও বধির। শুনে কমাণ্ডার চলে গেলেন। . সন্ধ্যার পর আমাদের ঘরে এসে উপস্থিত হলো চারজন সুদানী সৈনিক। কোন কথা না বলে তারা আমাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে কমাণ্ডারের হাতে অর্পণ করে। কমাণ্ডারের নাম বালিয়ান। তিনি আমাকে সঙ্গে করে আনেন এবং তার হেরেমে আবদ্ধ করে রাখেন। আরো চারটি মেয়ে ছিলো তার কাছে। আমি তাকে বললাম, আপনি সেনাবাহিনীর একজন কমাণ্ডার। আমাকে যখন নিয়েই এলেন, তো বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দিন। কিন্তু তিনি আমার কথা শুনলেন না। বিয়ে ছাড়াই আমাকে স্ত্রীর মতো ব্যবহার করতে শুরু করলেন।
দুটি বছর তিনি আমাকে সঙ্গে রাখলেন। সুদানীদের সাম্প্রতিক বিদ্রোহের পর তিনি পালিয়ে গেছেন। পরে মারা গেছেন, না জীবিত আছেন জানি না। আপনার সৈন্যরা তার বাড়িতে প্রবেশ করে এবং আমাদের সব কটি মেয়েকে এই বলে বের করে দেয় যে, যাও তোমরা এখন মুক্ত।
আমি আমার বাড়িতে চলে গেলাম। আমার পিতা আমাকে বিয়ে দিতে চাইলেন; কিন্তু কেউ আমাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করার জন্য এগিয়ে এলো না। মানুষ বলছে, আমি হেরেমের চোষা হাড়, চরিত্রহীনা, বেশ্যা। সমাজ আমাকে এক ঘরে করে রেখেছে। এখন জীবন নিয়ে বেঁচে থাকাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার।
নিরূপায় হয়ে বাস্তুভিটা ত্যাগ করে ইনি আমাকে নিয়ে সরাইখানায় এসে উঠেছেন। শুনলাম, সুলতান নাকি সুদানীদের জমি ও বাড়ি দিয়ে পুনর্বাসিত করছেন। আমাকে আপনি আপনাদের-ই কমাণ্ডার বালিয়ানের রক্ষিতা বা স্ত্রী মনে করে একখণ্ড জমি এবং মাথা গোঁজার জন্য একটি ঘর প্রদান করুন। অন্যথায় আত্মহত্যা কিংবা পতিতাবৃত্তি ছাড়া আমার আর কোন পথ থাকবে না।
সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ছাড়া-ই যদি আপনি জমি-বাড়ি পেয়ে যান, তবু কি আপনার সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে হবে? বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
হ্যাঁ, তারপরও আমি সুলতানকে এক নজর দেখতে চাই। একে আপনি আমার আবেগও বলতে পারেন। আমি সুলতানকে শুধু এ কথাটা জানাতে চাই যে, তার সালতানাতে নারীরা তামাশার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। বিত্তশালী ও শাসক গোষ্ঠীর কাছে বিয়ে এখন প্রহসন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি নারীর সম-সতীত্ব রক্ষা করুন এবং হৃত মর্যাদা ফিরিয়ে আনুন। একথাগুলো সুলতানকে জানাতে পারলে হয়তো আমার মনে শান্তি আসবে।
