তোমার চেয়ে সেই ঘোড়াটি আমার বেশি প্রিয় ছিলো, যাকে নদীতে ছেড়ে দিয়ে তোমাকে ডুবে মরা থেকে রক্ষা করেছি। ভাবরিজ বললো।
আমার দাম বিশ-পঞ্চাশটি ঘোড়ার চেয়েও বেশি- মেয়েটি অস্ফুট ও কম্পিত কণ্ঠে বললো- আমার বিশ্বাস, তুমি আমার ন্যায় রূপসী মেয়ে কখনো দেখোনি। তুমি আমার শ্লীলতা বিনষ্ট করে আমাকে বিক্রি করে ফেলবে। তোমার হাতে আমি অসহায়। তোমাকে ঠেকাবার কেউ নেই।
আছে- তাবরিজ উত্তর দেয়- তোমার থেকে আমাকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য আল্লাহ আছেন। এ যাবত তিনিই ঠেকিয়ে রেখেছেন। অন্যথায় তোমার ন্যায় একটি সুন্দরী যুবতীকে এভাবে হাতে পেয়ে কোন পুরুষ ঠিক থাকতে পারে না। আমি পারলাম কীভাবে? আমি তোমাকে সেই উত্তাল নদীর গ্রাস থেকে রক্ষা করেছি, যাতে শক্তিশালী প্রাণী উট পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। তারপর এখানে মাথার উপর ছাদ আর জ্বলন্ত আগুন পেয়ে গেলাম। এসব অলৌকিক ব্যাপার নয় কি? আমি আল্লাহর সমীপে দুআ করেছি। আল্লাহ কেবল সেই ব্যক্তিকে সাহায্য করেন, যার নিয়ত স্বচ্ছ। দুটি বালক এই আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। ওরা ফেরেশতা ছিলো। আমি আমার ধর্মের আলোকে কথা বলছি। তুমি এ কারণে ভয় পাচ্ছে যে, তোমার ধর্ম মিথ্যা। আর এই জন্য যে, তোমার দৃষ্টি তোমার দেহের উপর নিবদ্ধ, যা অতিশয় আকর্ষণীয়। আর তোমার চোখে আছে শুধুই তোমার মুখাবয়ব, যেটি অত্যন্ত সুন্দর। বিপরীতে আমার দৃষ্টি হচ্ছে আমার আত্মার প্রতি, যা তোমার দেহ অপেক্ষা বেশী আকর্ষণীয় এবং তোমার চেহারার চেয়ে অধিক সুন্দর। আমি জানি, কিছুক্ষণ পর তুমি আমাকে তোমার দেহটা সপে দিয়ে বলবে, বিনিময়ে আমাকে গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দাও। কান খুলে শুনে নাও সুন্দরী! আমি আমার আত্মাকে নাপাক হতে দেবো না। তুমি বলেছে, আমি তোমার ন্যায় রূপসী মেয়ে আর দেখিনি। এ কথা বলে তুমি আমার যৌনতাকে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করো না।
তাবরিজের বক্তব্যের এতোই ক্রিয়া যে, মেয়েটির মুখ বন্ধ হয়ে যায়। সে অবাক ও বিহ্বল দৃষ্টিতে তাবরিজের প্রতি তাকিয়ে থাকে। তাবরিজের বক্তব্যে মেয়েটি পরিষ্কার নিষ্ঠা ও প্রত্যয় আঁচ করছে।
আগুনের কাছে চলে আসো- তাবরিজ আগুনের উপর ধরে জামাটা শুকাতে শুকাতে বললো। মেয়েটি উঠে এমন ধারায় আগুনের কাছে এসে বসে, যেনো তার মধ্যে আদেশ অমান্য করার কোনই সাহস নেই। তাবরিজ জামার এক কোণটা মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো-ধরো, আগুনের উপর ধরে রাখো। নিজে অপর প্রান্তটা ধরে জামাটা আগুনের উপর নাড়াতে লাগলো। মেয়েটির জামাও ভেজা। তাবরিজ বললো শুকানোর পর এটি পরিধান করে তোমারটা এভাবে শুকিয়ে নিও।
না- মেয়েটি সন্ত্রস্ত হয়ে বললো- আমি গায়ের পোশাক খুলবো না।
গায়ের চামড়াটাও খুলে আগুনে রাখবে- তাবরিজ বললো- আমার কর্তব্যের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করো না মেয়ে। আমি তোমাকে প্রমাণ দেব, মুসলমানরা জংলী, নাকি খৃস্টানরা। আমি জানি, তুমি কতটুকু পবিত্র। এখন তুমি আমার আশ্রয়ে রয়েছে। আমি তোমাকে কোন শক্ত কথা বলতে পারি না। তুমি নারী। অসহায় নারীর প্রতি হাত না বাড়ানো আমার ধর্মের নির্দেশ।
আচ্ছা, আমাকে তুমি ঢেউয়ের মধ্য থেকে কীভাবে তুলে এনেছো? মেয়েটি জিজ্ঞেস করে- অন্যরা কি নদী পার হতে পেরেছে।
তাবরিজ মেয়েটিকে ঘটনার বিস্তারিত শুনিয়ে বললো, অন্যদের ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।
এতোক্ষণে মেয়েটির ভয় সম্পূর্ণ দূর না হলেও কিছুটা কমেছে। শারীরিক অবস্থাও ভালো হতে চলেছে। তাবরিজের প্রশ্নের জবাবে সে বললো আমি আমার বৃদ্ধ পিতার সঙ্গে হেস যাচ্ছিলাম। যে এলাকায় আমাদের বাড়ি, সেটি মুসলিম শাসিত। মুসলমানদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে আমরা হেমূল চলে যাচ্ছি। ওখানে আমাদের প্রভাবশালী আত্মীয় আছে।
মেয়েটি তার পিতার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করে।
***
কাফেলার সব কজন সদস্য নদীর গ্রাস থেকে বেরিয়ে গেছে। একেকজন একেক স্থানে গিয়ে কূলে ভিড়েছে। তারা পরস্পর ডাকাডাকি করে একত্রিত হতে শুরু করেছে।
এখন তারা সবাই একত্র। নেই শুধু তাবরিজ আর খৃস্টান মেয়েটি। ময়েটি যে উটের পিঠে আরোহী ছিলো, সেটির কোন সন্ধান পানা যায়নি। তারিজের ঘোড়া কূলে এসে ঠেকেছে। ঘোড়টি দূরে এক স্থানে পঁড়িয়ে আছে। কাফেলার এক সদস্য ঘোড়াটা ধরে নিয়ে আসে। সকলে নিশ্চিত হয়ে যায়, হেসের সুদর্শন ও তাগড়া যুবক ঘোড়া থেকে পড়ে ভুলে গেছে।
তাবরিজ উড়ে এসে জুড়ে বসা মানুষ। তদুপরি মুসলমান। তার জন্য কারো দুঃখ নেই। দুঃখ মেয়েটির জন্য। মেয়েটির বৃদ্ধ পিতা, দুজন খৃষ্টান ও এক ইহুদী মেয়েটির জন্য মুষড়ে পড়েছে। তারা সম্মুখপানে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে নদীর কূলে কূলে অনুসন্ধান করার কথা ভাবছে। অন্যরা অভিমত ব্যক্ত করে, প্রয়োজন নেই। মেয়েটি ডুবেই গেছে। তবু চারজন ঘোড়ার পিঠে আরোহন করে নদীর কূল ঘেঁষে চলতে শুরু করে। সে সময়ে তাবরিজ মেয়েটিকে নদী থেকে তুলে উপরে এনে পেটের পানি বের করছিলো। ওখানে নদীর বাঁক ছিলো। ছিলো টিলাও। সে কারণে মেয়েটির অনুসন্ধানকারীরা তাবরিজ ও মেয়েটিকে দেখতে পায়নি। বাঁক ঘুরে যখন তারা ওখানে পৌঁছে, ততক্ষণে তাবরিজ মেয়েটিকে পিঠে করে গুহায় পৌঁছে গেছে। অনুসন্ধানকারীরা সম্মুখে চলে যায়। তারপর সূর্য অস্ত্র গেলে তারা মেয়েটির আশা ত্যাগ করে ব্যথিত মনে হেসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
