হঠাৎ মেয়েটি মুদিত চক্ষেই নড়ে ওঠে এবং আপনা-আপনি উপুড় হয়ে যায়। পৈটে সপ পড়লে মুখ দিয়ে নদীর ঘোলা পানি বের হতে শুরু করে। তাবরিজ মেয়েটির কটিতে হাত রেখে চাপ দেয়। এবার আরো খানি বেরিয়ে আসে। উদ্দীপ্ত তাবরিজ এবার আরো জোরে চাপ দেয়। মেয়েটর পেট পানিশূন্য হয়ে যায়।
আকাশ মেঘমুক্ত হতে শুরু করেছে। বৃষ্টির জোর কমে গেছে। মেঘের ফাঁক গলে কিছু আলোও পৃথিবীতে এসে পড়ছে। তাবরিজ মেয়েটিকে সোজা করে শোয়ায়। মেয়েটি পলকের জন্য সামান্য চোখ খুলে আবার বন্ধ করে ফেলে। তাবরিজের শরীরটা অবশ হয়ে গেছে। নিজের ঘোড়াটা নদীতে ছেড়ে দিয়ে এসেছে। এখন আর তার পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না। ঘোড়ার পরিণতি কী ঘটেছে, তাবরিজ জানে না। হয়তো মরে গেছে, নয়তো পানিতে জীবিত ভাসছে।
তাবরিজের ক্লান্তি কমে এসেছে। শরীরটা এখন মোটামুটি চাঙ্গা। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা অস্ত গেলো বলে। তার মনে পড়ে যায় রাত আসছে। এখন একটা আশ্রয় খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু আশা আছে, অঞ্চলটা যেহেতু পাহাড়ী, তাই কোথাও না কোথাও একটা গুহা পেয়ে যাবে। জীর্ঘ পথের পথিকরা মাটির টিলা এবং বালুকাময় প্রান্তরে গুহা তৈরি করে রাখে, যা অন্য পথিকদেরও কাজে আসে।
***
তাবরিজ মেয়েটিকে পিঠে তুলে নিয়ে দুটি টিলার মধ্যদিয়ে হাঁটতে শুরু করে। আশ্রয় পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকলেও আশা আছে তার। যুবক মনে মনে আল্লাহর নিকট দুআ করতে করতে এগিয়ে চলে। বেশকিছু সময় হেঁটে ডান-বাম ঘুরে একটি প্রশস্ত স্থানে গিয়ে পৌঁছে। তাবরিজ দেখতে পায়, একটি টিলার কোল ঘেঁষে তিন-চারটি উট দাঁড়িয়ে আছে। উটগুলোর পিঠে যিন নেই। কাজেই এগুলো কোন মুসাফিরের বাহন নয়।
তাবরিজ উটগুলোর নিকটে পৌঁছে যায়। এবার সে মানুষের কথা বলার শব্দ শুনতে পায়। শব্দটা যেদিক থেকে ভেসে আসে, তাবরিজ সেদিকে তাকায়। টিলার অভ্যন্তরে একটি উঁচু ও সুপরিসর গুহা দেখতে পায়। ভেতরে তের-চৌদ্দ বছর বয়সের দুটি বালক দাঁড়িয়ে আছে। বোধ হয় ওরা বৃষ্টির ককুল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গুহায় ঢুকে আশ্রয় নিয়েছে।
তোমরা নদী থেকে বেরিয়ে এসেছে বুঝি?- এক ছেলে বললো এখানে এসে পড়ো, বেশ ভালো জায়গা।
জায়গাটা সত্যিই চমৎকার। প্রশস্ত কক্ষের ন্যায়। ভেতরটা একেবারে শুকনো-ঝরঝরে। কোন মুসাফির দল কিংবা ধারে-কাছের কোন রাখাল নিপুণভাবে কেটে কেটে কক্ষটি তৈরি করেছে। ছেলে দুটো ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে। তাবরিজ মেয়েটিকে পিঠ থেকে নামিয়ে গুহার মেঝেতে শুইয়ে দেয়। মেয়েটির এখনো জ্ঞান ফেরেনি। গুহার একদিকে কতগুলো শুষ্ক ঘাস ও গাছের শুকনো ডালের স্তূপ পড়ে আছে।
তোমরা এখানে কী করছো? তাবরিজ ছেলে দুটোকে জিজ্ঞেস করে।
আমাদের বাড়ি নদীর ওপারে- এক ছেলে উত্তর দেয়- মাঝে-মধ্যে আমরা উট নিয়ে এখানে আসি। ঘাস ওখানেও প্রচুর আছে। কিন্তু এখানে খেলতে আসি আর চরাবার জন্য উটগুলোও সাথে নিয়ে আসি। এক জায়গায় নদীটা বেশ চওড়া। ওখানে পানি কম- এক হাঁটুর বেশি থাকে না। আমরা ওখান দিয়ে আসা-যাওয়া করি। আজো আসলাম আর বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। আমরা এখানে আগুন জ্বালিয়ে খেলছি।
এখন বাড়ি যাবে কীভাবে?- তাবরিজ জিজ্ঞেস করে- নদী তো পানিতে ভরে গেছে। নদী এখন উত্তাল।
এই নদীর জোর বেশিক্ষণ থাকে না- এক ছেলে নিরুদ্বেগ কণ্ঠে বললো- আমরা যেখান দিয়ে আসা-যাওয়া করি, সেখানে নদী উত্তাল হয় না। পানি ছড়িয়ে যায় বলে বেশি স্রোত হয় না।
বৃষ্টি থেমে গেছে। সূর্য অস্ত্র যাচ্ছে। বালক দুটি উট নিয়ে চলে গেছে। তাবরিজ তাদের কোন সহায়তা কামনা করেনি। এও ভাবেনি, ওদেরকে বলে মেয়েটিকে নিয়ে ওদের গ্রামে চলে যাবে কিনা।
ছেলেদের চলে যাওয়ার পর তাবরিজ নিভু নিভু আগুনে শুকনো ডাল ছুঁড়ে দেয়। আগুন জ্বলে ওঠে। তাবরিজ গায়ের টাখনু পর্যন্ত লম্বা ভিজা কাপড়টা খুলে আগুনের উপর ধরে শুকাতে শুরু করে। মনে মনে শোকর আদায় করছে তাবরিজ। এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে তার জন্য আগুন জ্বালাতে আল্লাহ এই ছেলেগুলোকে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
ইত্যবসরে মেয়েটি চোখ মেলে তাকায়। তার চেহারায় ভীতির ছাপ। মেয়েটি এদিক-ওদিক দৃষ্টিপাত করে। তাবরিজকে দেখামাত্র মুখটা আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তাবরিজের ঊর্ধ্বাংশ নগ্ন। নদীর ঘোলা পানি তার মাথার চুল ও চোহরাকে ভয়ঙ্কর বানিয়ে রেখেছে।
ভয় পেও না- তাবরিজ মেয়েটিকে বললো আমাকে চেনো না? আমি তোমার সফর সঙ্গী ছিলাম।
কিন্তু তুমি মুসলমান- মেয়েটি উঠে বসে। তার সর্বাঙ্গে ভীতির ছাপ। বললো- তোমার উপর ভরসা রাখা আমার উচিত হবে না। আমাকে চলে যেতে দাও।
যাও- তাবরিজ বললো- পারলে চলে যাও।
মেয়েটি উঠে দাঁড়ায়। চলে যাওয়ার জন্য সম্মুখে পা বাড়ায়। গুহার বাইরে এক পা রেখে বাইরে রাতের ঘোর অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পায় না। ভেতরে আলো জ্বলছে। মেয়েটি মোড় ঘুরিয়ে তাবরিজের দিকে তাকায়। শুকনো বৃক্ষ ডালের আগুনে তাবরিজকে একজন রহস্যময় মানুষ বলে মনে হলো। তাবরিজও মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটি পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। ভেতর দিকে এক-দুপা এগিয়ে এসে লুটিয়ে পড়ার মতো করে বসে পড়ে এবং অসহায়ের ন্যায় তাবরিজের মুখপানে তাকিয়ে থাকে।
