তাবরিজ এসেছিলে একাকী। ফেরার সময় পথে ক্ষুদ্র একটি কাফেলা পেয়ে যায়, যার গন্তব্যও হেস নগরী। কাফেলায় ইহুদী ব্যবসায়ীও আছে। দুটি খৃস্টান পরিবার উটের উপর সওয়ার। কিছু লোক পায়ে হেঁটে চলছে।
তাবরিজ এই কাফেলায় যুক্ত হয়ে যায়। কাফেলা এগিয়ে চলছে। দীর্ঘ পথ। পথে দুরাত অবস্থান করতে হয়। তৃতীয়দিন সফরের শেষ দিন। মধ্যরাতের পর কাফেলার হেস পৌঁছে যাওয়ার কথা। সম্মুখে একটি নদী। নদীটি তেমন বড় নয়। গভীরতা বড়জোর এক কোমর। মানুষ তার মধ্যদিয়ে অনায়াসেই চলাচল করে থাকে।
সফরের শেষ দিন। সূর্য মাথার উপর উঠে এসেছে। কাফেলা দেখতে পায়, দিগন্ত আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে। কাফেলা চলার গতি বাড়িয়ে দেয়। তারা চেষ্টা করছে, বর্ষণ শুরু হওয়ার আগে আগেই গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। না পারলেও কোন পাহাড়ী এলাকায় ঢুকে লুকানোর স্থান খুঁজবে। আর যদি সম্ভব হয়, তাহলে ফুলে উঠার আগেই নদী পার হয়ে যাবে।
ভাবতে না ভাবতে গোটা আকাশ ঘোর কালো মেঘে ছেয়ে যায়। সঙ্গে দমকা বাতাস। এলাকাটা পাহাড়ী। তারা যখন নদীর কূলে গিয়ে পৌঁছে, ততক্ষণে মেঘ দুনিয়াটাকে ঘোর তমশাচ্ছন্ন করে ফেলেছে এবং এমন মুষলধারায় বর্ষণ শুরু হয়ে গেছে যে, চোখ খুলে হাটা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কাফেলার এক বৃদ্ধ খৃষ্টান বললো, নদী ফুঁসছে। তবে এখনো অতিক্রম করা সম্ভব। তাড়াতাড়ি পার হয়ে যাও।
বৃদ্ধের সঙ্গে উটের উপর বসা একটি সুন্দরী যুবতী। খৃস্টান মেয়ে। কাফেলা নদীর কিনারায় পৌঁছে গেছে। নদীর পানি ঘোেলা হয়ে গেছে। গতিতে উচ্ছ্বাসের জোশ সৃষ্টি হয়ে গেছে। গভীরতা এখনো বাড়েনি। মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছে। সময়টা সকাল হলেও মেঘ প্রকৃতিতে সন্ধ্যার পরিবেশ সৃষ্টি করে ফেলেছে। আকাশে সূর্য দেখা যাচ্ছে না। যেন দিবসের কর্তব্য পালন করে যথা সময়ে অস্তমিত হয়ে গেছে। একজন তার ঘোড়াটা নদীতে নামিয়ে দেয়। কয়েক পা এগুতেই চীৎকার করে বলে ওঠে- এসে পড়ো। পদাতিকরাও আসো। পালি গভীর নয়।
কেউ দেখলে না উজানের দিকে থেকে পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে তীব্র ৩য় জলোস খেয়ে আসছে। পাহাড়ী অংশের জােল জব্র হয় থাকে। উপর থেকে এফন খলধারায় বৃষ্টি নামছে, যেনো আকাল চালনি হয়ে গেছে, পানি আটকে রাখতে পারছে না। কাফেলার উট-ঘোড়াগুলো বেহ এইই অনুভব করছিলো। এমন একটি নদী অতিক্রম করা যে প্রাণীগুলোর পক্ষে কোন ব্যাপার ছিলো না, তারা এখন নদীতে বেয়াড়ার ন্যাচরণ করছে। আর এতে যেনো তাদের মন সায় দেয় না। অথচ পানি এখনো গভীর নয়।
হঠাৎ নিতাই হঠাৎ নদীটি পানিতে ভরে যায়। পর্বতসম ও বিশাল কিশা তে এসে আঘাত হানতে শুরু করে। পানি গভীরতর হয়ে যায়। মণীর পাড় উলটে নি উপরে উঠে আসে- আরো উপরে। কাফেলার পদাতিক সদস্যরা সাঁতার কাটতে শুরু করে। উটগুলো চীৎকার জুড়ে দোকালো নদীতে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। নদীর অপর পার দূরে নয়। কি তীব্র স্রোত কাউকে আড়াআড়ি এগুতে দিচ্ছে না। কাফেলার সকল সদস্য আশআপন জীবন রক্ষার চেষ্টা করছে।
খৃষ্টান মেয়েটির চীৎকার শোনা গেলো। তাবরিজ নিকটেই কোথাও আছে। মেয়েটির চীৎকার তার কানে আসে। তাবরিজ দেখতে পায়, মেয়েটি যে উটের পিঠে সওয়ার ছিলো, সেটি স্রোতের মোকাবেলা করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। তার পা উপড়ে গেছে এবং তীব্র স্রোত তাকে ফেলে দিয়েছে। তার পিঠের উপর বসা মেয়েটি নদীতে ছিটকে পড়ে যায়। পানির স্রোত-উচ্ছ্বাসের অবস্থা হলো, কখনো ঢেউ উপরে উঠে ঠায় দাঁড়িয়ে গিয়ে পড়ে যাচ্ছে, আবার কখনো ঘূর্ণিপাকের রূপ ধারণ করছে। হৈ খুল্লোড়, আর্তচীৎকার এতো তীব্র আকার ধারণ করেছে যে, কেউ কারো শব্দ শুনতে পাচ্ছে না। তাবরিজ যদি নিকটে না থাকতো, তাহলে মেয়েটির চীৎকারও কেউ শুনলে না। তাবরিজ ঘোড়ার পিঠে সওয়ার। ঘোড়াটা স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না বটে, তবে স্রোত-ঢেউয়ের মোকাবেলা করে চলেছে। নিজ মেয়েটিকে পানিতে ছিটকে পড়তে দেখে নিজের ঘোড়াটা স্রোতের অনুকূলে ছেড়ে দেয়। কিন্তু ঘোড় তেমন দ্রুত সাঁতার কাটতে পারছে না।
তাবরিজ খোঁড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে দ্রুতগতিতে সাঁতার কেটে মেয়েটির পেছনে চলে যায়। একটি ঢেউ মেয়েটিকে উপরে তুলে ফেললে তাবরিজ তাকে দেখে ফেলে। তাবরিজের তরুণ বাহুতে শক্তি আছে। সে এগিয়ে গিয়ে মেয়েটিকে ধরে ফেলে। মেয়েটি এখনো তুবলি বটে; কিন্তু সেসাঁতরাতে পারছে না। তাকে সামলে রাখা তারিজের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।উত্তাল নদীতে নিম আর একটি মেয়েকে বানোর জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করছে তাবরিজ। এরই মধ্যে সাত দেয়াকে অনেক দূর ভসিয়ে নিয়ে গেছে। তাবরিজ মেয়েটিকে নিজের পিঠের উপর গুলি নিয়ে কূলের দিকে সঁতরাতে শুরু করে। কিন্তু স্রাতের তোেড় মেয়েটি তাবর্নিজের পিঠ থেকে ছিটকে যায়। মেয়েটির এখন চৈতনা নেই। যদি মুসলিম যুবক তাবরিজের দেহে শক্তি আর হৃদয়ে মানবোধ না খাকত, তাহলে মেয়েটিকে ছেড়ে দিয়ে সে নিজের জীবন রক্ষারই চেষ্টা করলে।
কাফেলা যে স্থান থেকে নদীতে অবতরণ করেছিলো, তার থেকে অন্তত দুমাইল দুরে তাবরিজ মেয়েটিকে নিয়ে কূলে ভিড়ে। স্কুলে শিকৃত প্রস্তর। তাবরিজ মেয়েটিকে উপরে তুলে মাটিতে শুইয়ে দেয়। মেয়েটি জীবিত। অবে অচেতন। অচেতন মানুষের চৈতন্য ফিরিয়ে আনতে কী করতে হয়, তাবরিজ জানে না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মেয়েটির প্রতি তাকিয়ে থাকে।
