***
যুদ্ধের সঠিক চিত্র সংগ্রহ করে হেস ফিরে আসছে তাবরিজ। সংবাদ সংগ্রহের জন্য তাকে দামেশক পর্যন্ত যেতে হয়নি। পথেই তার কাজ হয়ে গেছে। খৃস্টান বাহিনী হামাত থেকে বহু দূরে ছাউনি ফেলে অবস্থান করছিলো। তাবরিজ তাদের দেখে ফেলে। দূর থেকে পতাকা দেখে চিনে ফেলে, ওরা খৃস্টান সৈন্য। তাবরিজ অগ্রসর হতে থাকে। পথে দুজন উজ্জ্বারোহীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ঘটে। তারা মুসলমান। তাবরিজ তাদের থেকেও জানতে পারে, ওরা খৃষ্টান বাহিনী। উল্লারোহীরা আরো জানায়, এই বাহিনী মুসলমানদের হাতে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এসেছে। তাবরিজ তারে বললো, আমি হেমস থেকে জানতে এসেছি, ফান বাহিনী কোন্ অবত এসে গেছে এবং আরবের রুটি খাল করছে।
ঐ যে পাহাড়গুলো দেখতে পাচ্ছে জোহরা একটি পার্বতময় এলাকার প্রতি ইঙ্গিত করে বললো- এই পথটিই তোমাকে পর্বতমালার অভ্যন্তরে নিয়ে যাবে। ওখানে গেলেই আমাদের ফৌজ দেখতে পাবে। দামেশৃক এখনো অনেক দূর। বাহিনীর যে কোন একজন সৈনিককে জিজ্ঞেস করলেই তুমি সবকিছু জানতে পারবে। আমরা শুধু এটুকু জানি, রামাল্লায় যে যুদ্ধ হয়েছিলো, তাতে মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্ত ও পরাজিত হয়ে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে গেছে। তারপর খৃস্টানদের সঙ্গে হামাতের দুর্গের সন্নিকটে লড়াই হয়েছে, যাতে খৃষ্টানরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পলায়ন করেছে। তুমি সম্মুখে চলে যাও। তবে কোন খৃষ্টান সৈন্যের কাছে ঘেঁষবে না। তারা যখনই টের পাবে তুমি মুসলমান, সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে হত্যা করে ফেলবে।
দিবসের শেষ বেলা। তাবরিজ হামাতের পার্বত্য এলাকায় ঢুকে পড়েছে। ভেতরে সুপরিসর একটি উপত্যকা। সম্মুখ দিক থেকে জনাকয়েক অশ্বারোহী এগিয়ে আসে। তাবরিজ মাঝপথ দিয়েই হাঁটছে। এক আরোহী ছুটে এসে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো- পথছাড়ো মিয়া! প্রধান সেনাপতি আসছেন।
তাবরিজ সামান্য সরে দাঁড়ায়। আরোহী তাকে আরো দূরে সরে যেতে বলছে। প্রধান সেনাপতি ও তাঁর সহকর্মীরা দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছেন।
প্রধান সেনাপতি সুলতান আইউবীর ভ্রাতা আল-আদিল। এসে পৌঁছেই তিনি দেখতে পান তার এক ব্ৰক্ষীসেনা একজন পথিকের সঙ্গে ক্ষুব্ধ ভাষায় কথা বলছে। বোধ হয় পথিক পথ ছাড়ছিলো না। আল-আদিল নিকটে এসে দাঁড়িয়ে যান। তাবরিজকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কে? রক্ষীর সঙ্গে বচসা করছো কেন?
তাবরিজ জবাব দেয়, আমি হেমস থেকে জানতে এসেছি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনী কী অবস্থায় আছে এবং খৃষ্টান বাহিনী কী পরিমাণ সাফল্য অর্জন করেছে। সে আল-আদিলকে জানায়, হেসের মুসলমানরা সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে এবং সুলতান আইউবীর ফৌজের অপেক্ষা করছে। আমাদের বোনরাও যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। প্রকুত শিশু-কিশোর-বৃদ্ধরাও।
আলী বিন সুফিয়ানের নায়েব হাসান ইবনে আবদুল্লাহ আল-আদিলের সঙ্গে আছেন। তিনি তাবরিজকে গভীর দৃষ্টিতে নিরীক্ষা করছেন। তাবরিজ শত্রুপক্ষের চর হতে পারে। তবে তার সরলতা প্রমাণ করছে লোকটা গুপ্তচর নয়। তবু সন্দেহ করা আবশ্যক। গোয়েন্দারা এর চেয়েও বেশী সরলতা প্রকাশ করতে পারে।
তোমাদের খতীবের নাম কী? হাসান ইবনে আবদুল্লাহ জিজ্ঞেস করেন।
তাবরিজ খতীবের নাম বলে। তকালের অপ্রকাশিত লিপিতে খতীবের নামটা স্পষ্ট উল্লেখ নেই। প্রকাশিত কোন ইতিহাস গ্রন্থেও হেসের এই খতীবের নাম পাওয়া যায় না। তাই অগত্যা আমরা তাকে খতীব বলেই ডাকবো।
হাসান ইবনে আবদুল্লাহ আল-আদিলকে বললেন, আমি নিশ্চিত হয়েছি লোকটি আমাদেরই। তার কথা-বার্তায় বুঝা যাচ্ছে, সে আন্তরিকতার সঙ্গেই নিজ দায়িত্ব পালন করছে।
আল-আদিলের নির্দেশে তাবরিজকে মেহমান হিসেবে তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হলো। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ রাতে তাবরিজকে নিজ তাঁবুতে তলব কমে এবং খতীবের নামে একখানা পত্র লিখে দেন
পরিস্থিতি অত্যন্ত সঙ্গীন। তবে এতোটা নয়, যতোটা আপনারা শুনেছেন। জনগণকে বলুন, তারা যেনো তা-ই বিশ্বাস করে, যা তারা নিজ চোখে দেখে এবং যা ইমামগণ মসজিদে মসজিদে বলে থাকেন। এদিক ওদিকের কথা-বার্তায় যেনো তারা কান না দেয়, সত্য বলে বিশ্বাস না। কমে। আপনারা একটি মহা-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন। এলাকার ইহুদী-খৃষ্টানদের প্রতি দৃষ্টি রাখুন আর সতর্ক থাকুন, যেনো তারা আপনাদের তৎপরতা জানতে না পারে। আপনাদের তৎপরতা ও কর্মসূচী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোপন রাখতে হবে।
হাসান ইবনে আবদুল্লাহ খতীবের নামে এমন একটি বার্তা প্রেরণ করেন, যা হেসের মুসলমানদের জন্য উদ্দীপক। কিন্তু তাতে তিনি উল্লেখ করেননি, সেসব কিরূপ তৎপরতা, যেগুলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোপন রাখতে হবে। ব্যাপার হলো, হেমসের মুসলমানদেরকে সুলতান আইউবীর নির্দেশ মোতাবেক সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছিলো। উদ্দেশ্য ছিলো, যখনই প্রয়োজন হবে, তারা খৃস্টান বাহিনীর উপর পেছন থেকে গেরিলা অপারেশন চালাবে। তবে উপরে উপরে খৃস্টানদের অনুগত থাকবে। এ লক্ষ্যে হেসে তিন-চারজন অভিজ্ঞ কমান্ডো প্রেরণ করে রাখা হয়েছে, যারা সেখানে পরিকল্পনা মোতাবেক প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছে। খতীব তাদের কমান্ডার।
পরদিন সকালে তাবরিজ হেমূসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়।
***
যুগটা কাফেলাবদ্ধ হয়ে সফর করার। আবার কেউ একাকীও সফর করে। একাকী সফরকারীরা পথে দুচারজন লোক দেখলে গন্তব্য এক হলে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এভাবে এক একটি কাফেলার রূপ ধারণ করে এবং ধীরে ধীরে কাফেলার বহর বাড়তে থাকে।
