আর আজ খৃস্টানরা আল্লাহর ভূখণ্ডে এই প্রত্যয় নিয়ে এসেছে যে, তারা ফিরে যাবে না। এই ভূখণ্ডকে তারা করায়ত্ত্ব করার সিদ্ধান্ত নিলো কেন? তারা চাচ্ছে, আল্লাহ পাক যে ইসলামকে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিকট প্রেরণ করেছিলেন, তাকে এখানেই নিশ্চিহ্ন করে দেবে। মনে রেখো মুসলমান! ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যে পাথরকে মোমে পরিণত করে দেয়। আমাদের ধর্মের মূলনীতিগুলো সহজে মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যায়। কারণ, এটি মানব স্বভাবের সম্পূর্ণ অনুকূল জীবনব্যবস্থা। হাক্কুল ইবাদ (মানবাধিকার) এমন একটি মৌল বিধান, মানবজাতিকে একমাত্র ইসলামই উপহার দিয়েছে। ইসলাম একটি ধর্মই নয়- এটি একটি মতবাদ। ইসলাম বিশ্ব মানবতার পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা।
ক্রুশের ধ্বজাধারীরা জানে, ইসলাম যদি বিস্তার লাভের সুযোগ পেয়ে যায়, তাহলে পৃথিবী নামক এই গ্রহটি ইসলামের ছায়াতলে চলে আসবে এবং ক্রুশের নাম-চিহ্ন মুছে যাবে। এ কারণেই ক্রুসেডাররা তাদের পূর্ণ সমর শক্তি নিয়ে এখানে এসেছে। তারা ইসলামের উৎসমুখ বন্ধ করে দিতে এসেছে। ইহুদীদের সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়েছে, বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করে তাদের হাতে তুলে দেবে, যাতে ইহুদীরা আমাদের প্রথম কেবলা মসজিদে আকসাকে হাইকেলে সুলায়মানীতে পরিণত করতে পারে। এটি ইহুদীদের একটি প্রাচীন স্বপ্ন, যাকে বাস্তবায়িত করার জন্য তারা অস্থির হয়ে আছে। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা তাদের রূপসী মেয়েদেরকে এবং তাদের ধন-সম্পদ খৃস্টানদের হাতে তুলে দিয়েছে। এই নারী আর অর্থই আমাদের সারিতে গাদ্দার জন্ম দিয়েছে।
আমি তোমাদেরকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর পয়গাম শোনাচ্ছি। তোমরা তাকে হৃদয়ে অঙ্কন করে নাও। ইসলামের সৈনিক সালাহুদ্দীন আইউবী তাঁর ফৌজ ও জাতিকে বলে রেখেছেন, চলমান লড়াই দুটি বাহিনীর যুদ্ধ নয়, এটি প্রথম কেবলা ও হাইকেল সুলাইমানীর যুদ্ধ। আজ যদি আমরা বাতিলকে চিরতরে খতম করতে না পারি, তাহলে বাতিল একদিন আমাদের ধর্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। আমাদের আত্মা দেখবে, ইতিহাস দেখবে, ফিলিস্তীন ইহুদীদের দখলে আর মসজিদে আকসা হাইকেলে সুলাইমানীতে পরিণত হচ্ছে।
হেমসের মুসলমানগণ! তোমরা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজের সৈনিক নও বটে; তবে অবশ্যই আল্লাহর সৈনিক। তোমাদের উপর জিহাদ ফরজ করে দেয়া হয়েছে। কুরআন নির্দেশ দিয়েছে, নিজের মাতৃভূমি ও ধর্মের সুরক্ষার জন্য ঘোড়া ও অস্ত্র প্রস্তুত রাখো এবং জিহাদের প্রস্তুতিতে নিয়োজিত থাকো। তবে মনে রেখো, তোমাদের শত্রুরা তোমাদের বিরুদ্ধে শুধু রণাঙ্গনেই যুদ্ধ করে না। তাদের যুদ্ধক্ষেত্র আরো আছে। তারা অপপ্রচারের মাধ্যমে তোমাদের উপর তাদের বাহিনীর ভীতি ও ইসলামী ফৌজের বিরুদ্ধে কুধারণা সৃষ্টি করছে। তারা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরকে সুন্দরী মেয়ে আর সোনার চাকচিক্য দ্বারা নিজেদের অনুগত বানিয়ে নিচ্ছে। এই দুটি বস্তু মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। এই দুয়ের সঙ্গে যখন মদ যোগ হয়, তখন মুসলমান তার ঈমানকে ঈমানের শত্রুর পায়ের উপর অর্পণ করে। এমনটি অতীতে হয়েছে, বর্তমানেও হচ্ছে। খৃস্টানরী আমাদেরকে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে আমাদের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। আমাদের কতক আমীর খৃস্টানদের কাছে ঈমান নীলাম করে সালতানাতে ইসলামিয়া ও মুসলিম উম্মাহর এই ক্ষতিটা করেছে। কিন্তু তাদের পাপের শাস্তি ভোগ করেছে জাতি, দেশ ও সেনাবাহিনী। যারা অন্যের মাঝে গৃহযুদ্ধ বাধায়, তারা দেশের জনগণ ও সেনাবাহিনীকে আবেগে ফেলে একদলকে অপর দলের বিরুদ্ধে উস্কে দেয় এবং একদল দ্বারা অপর দলকে খুন করায়। আর নিজেরা প্রাসাদে বসে ফুর্তি করে। তোমরা স্মরণ রেখে, এই পাথরগুলো সব যদি সোনা হয়ে যায় আর সেগুলো তোমাদের দান করা হয়, তবুও জিহাদের প্রতিদান হবে না। জিহাদের পুরস্কার লাভ করে আত্মা। আত্মা ঘরা-জহরতে খুশি হয় না। জিহাদের পুরস্কার আল্লাহর হাতে। তোমরা যদি আল্লাহর পথে জীবন বিলিয়ে দাও, তবু জীবিত থাকবে। তোমরা দৈহিক সুখ-ভোগকে লক্ষ্য স্থির করো না। এই দৈহিক সুখ-ভোগকে যে-ই লক্ষ্য বানিয়েছে, সে-ই আপন ঈমানদার ভাইয়ের গলা কেটেছে, জাতির গলায় ছুরি চালিয়েছে। কুরআন তোমাদেরকে আত্মিক শান্তিতে ধন্য করতে চায়।
এভাবে খতীব হেমসের মুসলমানদের ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত করে রাখেন। তারই তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনা মোতাবেক সামরিক প্রশিক্ষণ চলছে। তিনি স্বয়ং তরবারী ও খঞ্জর চালনায় অভিজ্ঞ। হেসে এই প্রশিক্ষণ পুরোদমে চলছে। সকলের হৃদয়ে একটিই সুর অনুরণিত হচ্ছে- জিহাদ জিহাদ জিহাদ চাই, জিহাদ করে বাঁচতে চাই।
হেমস নগরীতে তিনটি মসজিদ আছে। এই মসজিদগুলো জিহাদের আলোচনায় মুখরিত থাকে। কিন্তু এখানকার খৃস্টান ও ইহুদী অধিবাসীরা সহানুভূতিশীল সেজে দুঃসংবাদ শুনিয়ে শুনিয়ে মুসলমানদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা করছে। সাধারণ মুসলমানগণ মসজিদের খতীব ও ইমামদের নিকট এসব সংবাদের সত্যতা জিজ্ঞেস করছে এবং উদ্বেগ প্রকাশ করছে। কুশ ও চাঁদ-তারার যুদ্ধের সঠিক ও বাস্তব চিত্র জেনে হেমসের মুসলমানদের কৌতূহল নিবারণের জন্য খতীব তাবরিজ নামক এক যুবককে দামেশক পাঠিয়ে দিয়েছে।
