আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা একটি কক্ষে অচেতন পড়ে আছে। তার মুমূর্য অবস্থা। তার প্রেমিকা মেয়েটি এক কক্ষে মেঝেতে পড়ে আছে। তার বুকে একটি খঞ্জর বিদ্ধ হয়ে আছে। আমি আত্মহত্যা করেছি বলেই মেয়েটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
এলাকাবাসী ঘটনাটা টের পেয়ে গেছে। তারা দরবেশের আস্তানার বাইরে ভিড় জমায়। পরস্পর কানাঘুষা চলছে।
দরবেশকে বের করে জনতার সম্মুখে দাঁড় করানো হলো। তাকে বলা হলো, আসল পরিচয় নিজ মুখে শোনাও। জনতাকে বলো, কী উদ্যেশ্যে মিসরের ফৌজ ও সুলতান আইউবীর দুর্নাম রটনা করছে।
দরবেশ সত্য সত্য বলে দেয়। মানুষ তার যে পরিচয় জানে, সব ভুয়া। আসল পরিচয়, সে খৃস্টানদের চর এবং নাশকতার হোতা। ইদানিংকার দেশময় অপপ্রচারের মূল নায়ক।
এক মেয়ে মারা গেছে। অপর মেয়েকে জনতার সম্মুখে উপস্থিত করা হলো এবং বলা হলো, এই মেয়েটি মুসলমান নয়- খৃস্টান। জনতাকে আরো অবহিত করা হলো, রামাল্লা থেকে আশার পথে পার্বত্য এলাকায় আগুনের কাছে যে পানি ও খেজুর পড়ে ছিলো, সেগুলো এদেরই লোকেরা রেখেছিলো।
আলী বিন সুফিয়ান তাঁর পাতাল কক্ষে ধৃত দরবেশ ও সাঙ্গপাঙ্গদের থেকে যেসব তথ্য লাভ করেছেন, তাতে জানা গেলো, লোকটি রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে আসা নতুন সৈন্যদেরকে ফন্দি করে দলে ভিড়িয়ে নিয়েছিলো। সঙ্গে তার নিজেরও লোক ছিলো। এরা বিভিন্ন মসজিদ ও নানা লোক সমাগমের স্থানে মিসরের ফৌজের বিরুদ্ধে কথা বলতো। উদ্দেশ্য ছিলো, দেশের জনগণ ও ফৌজের মাঝে সংশয় ও ঘৃণার প্রাচীর দাঁড় করানো। এই মিশনে মিসরের প্রশাসনের জনাকয়েক কর্মকর্তা এবং ক্ষমতাচ্যুৎ আব্বাসী খেলাফতের গোপন কর্মীরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলো। মোটকথা, দুশমনের পরিচালিত এই অভিযানে স্বার্থপূজারী ঈমান বিক্রেতা মুসলমানও অংশীদার ছিলো।
যখন দেশের সেনা বাহিনী ও জনগণের মাঝে ঘৃণা সৃষ্টি হয়ে যাবে, তখন বুঝে নিও সালতানাতে ইসলামিয়ার পতন শুরু হয়ে গেছে- সুলতান আইউবী বললেন। তিনি নির্দেশ জারি করেন। দেশের সমস্ত মসজিদের ইমামদেরকে রামাল্লার পরাজয়ের প্রকৃত কারণ অবহিত করার ব্যবস্থা করো। ইমামগণ বিষয়টি দেশের মানুষকে অবহিত করবেন। কাউকে দায়ী কিংবা অভিযুক্ত করে যদি কেউ শান্তি লাভ করে থাকে, তাহলে সব দায় দায়িত্ব আমার উপর চাপাও। ফিলিস্তিনের রণাঙ্গনে জীবন দিয়ে আমি জাতির সেই লোকগুলোর গুনাহের কাফফারা আদায় করবো, যারা ক্ষমতার নেশায় আমার ফৌজ ও ফিলিস্তীনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তখন আমার রক্তের প্রতিটি ফোঁটা চীৎকার করে করে জানান দেবে, রামাল্লার পরাজয়ের জন্য ফৌজ দায়ী ছিলো না এবং মিসরের একজন ফৌজও কোনো অনৈতিক কাজে জড়িত ছিলো না।
[ষষ্ঠ খণ্ড সমাপ্ত]
৭.১ একই গন্তব্যের মুসাফির
কই গন্তব্যের মুসাফির
হালবের উত্তরে আজকের সিরিয়া ও লেবাননের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত ক্ষুদ্র একটি শহর। নাম হেমস। যুদ্ধ এখনও গ্রাস করেনি বলে শহরটি শান্ত। খৃষ্টান সৈন্যরা মাঝে-মধ্যে তার আশপাশ দিয়ে অতিক্রম করছে। শহরটির কোল ঘেঁষে বয়ে চলছে ছোট্ট একটি নদী। সে কারণেই শহরটি সৈন্যদের বিচরণ থেকে নিরাপদ রয়েছে। অধিবাসীদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা এতো বেশি। ফলে এটি মুসলমানদের নগরী বলেই পরিচিত। অল্প কটি খৃষ্টান পরিবারও আছে। আছে কটি ইহুদী পরিবারও। তবে ব্যবসা বাণিজ্য ইহুদী-খৃস্টানদের দখলে। বাণিজ্যের সুবাদে তাদের দূর-দূরান্ত অঞ্চলে যাওয়া-আসা আছে। তারা বহিঃজগতের যে খবরাখবর নিয়ে আসে, হেসের মানুষ তা-ই সত্য বলে বিশ্বাস করে। তারা ক্রুসেডার ও ইসলামী বাহিনীর যুদ্ধের সংবাদ নিয়ে আসে। তাতে মুসলমানদের পরাজয়ের উল্লেখই বেশি থাকে। খৃষ্টান বাহিনী সম্পর্কে তারা ভীতিকর কথাবার্তাই শুনিয়ে থাকে।
তাদের উদ্দেশ্য, মুসলমানদের উপর খৃস্টান বাহিনীর আতঙ্ক বিরাজিত থাকুক এবং অন্তত এই নগরীর কোন মুসলমান ইসলামী বাহিনীতে অংশগ্রহণ না করুক। কিন্তু তার ক্রিয়া হচ্ছে উল্টো। মুসলমানগণ ীত হওয়ার পরিবর্তে উল্টো প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করেছে। আইন করে বা নিষেধাজ্ঞা জারি করে তাদের এই সামরিক প্রস্তুতি রুখবার শক্তি কারো নেই। এখানে খৃস্টানদের শাসন চলে না।
হেমসের মুসলমানগণ অশ্বচালনা, বর্শা ছেঁড়া, তরবারীচালনা ও তীরন্দাজির প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন করছে। এই প্রশিক্ষণ মেয়েরাও গ্রহণ করছে। তাদের নেতা নগরীর বড় মসজিদের খতীব, যার সকল ইলম ও আমল জিহাদের জন্য নিবেদিত। তিনি প্রথম কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাস শত্রুমুক্ত করার এবং খৃস্টানদেরকে আরব দুনিয়া থেকে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে মুসলমানদের প্রস্তুত করছেন।
আর এই যুদ্ধটা কেন লড়া হচ্ছে?- খতীব তাঁর ভাষণে ব্যাখ্যা প্রদান করছেন- খৃস্টানরা আরব দুনিয়ার উপর দখলদারিত্ব কায়েম করে নিজেদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে আর আমরা পৃথিবীতে আল্লাহর রাজত্ব কায়েম করার জন্য জান-মালের কুরবানী দিয়ে চলেছি। তারা আরব দুনিয়াকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করলো কেন তার একমাত্র কারণ, মহান আল্লাহর মহান পয়গাম আরবদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেই বার্তা আরবদের উপর কর্তব্য আরোপ করে দিয়েছে যে, হেরা গুহায় বসে প্রিয়নবীর প্রাপ্ত এই বার্তা আমরা সমগ্র মানবতার নিকট পৌঁছিয়ে দেবদ। তারিক ইবনে যিয়াদ রোম উপসাগরের মিসরীয় তীরে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহকে বলেছিলেন- তুমি যদি আমাকে সাহস ও দৃঢ়তা দান করে, তাহলে আমি তোমার নাম সমুদ্রের ওপারে নিয়ে যাবে। সে সময় তার বক্ষ থেকে ঈমানী চেতনার যে শিখা উত্থিত হয়েছিলো, তা-ই তাঁর ঘোড়াকে সমুদ্রে নামিয়ে দিয়েছিলো। নৌকায় করে তার বাহিনী ইউরোপের কূলে পৌঁছে যায়। যিয়াদপুত্র তারিক আদেশ দিলেন- নৌকাগুলোতে আগুন ধরিয়ে দাও। আমরা ফিরে যাওয়ার জন্য আসিনি।
