এখন কি তোমার হৃদয়ে আমার ভালোবাসা নেই?- গোয়েন্দা জিজ্ঞাসা করে- তুমি এখন আমার দেশে। আমার সঙ্গে আসো। এখানে আমি তোমাকে ধোকা দেবো না।
আছে- মেয়েটি উত্তর দেয়- তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা এখনো আছে। কিন্তু কর্তব্য তার উপর বিজয়ী হয়ে গেছে। এটা তোমার অপরাধ। তোমার ভালোবাসার খাতিরে আমি গোয়েন্দাগিরি পরিত্যাগ করার সংকল্প নিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি আমার সংকল্পকে দলিত করে আমাকে গুপ্তচরবৃত্তির নোংরামিতে ডুবিয়ে দিয়েছে। তিনটি বছর কেটে গেছে। এই দীর্ঘ সময়টায় আমি নিজেকে জঘন্যরূপে নাপাক করে ফেলেছি। ইসলামের প্রতি ঘৃণা আমার আত্মায় মিশে গেছে। এখন আর প্রেম নয়। এখন তুমি আমার বন্দি। আমি আমার জাতিকে ধোকা দিতে পারি না। আমি যে লোকটির সঙ্গে এসেছি, তাকে বলে দিয়েছি, তুমি গুপ্তচর। তাকে আমি আক্রার সব ঘটনা খুলে বলেছি। বারান্দা দিয়ে অতিক্রম করার সময় যদি আমি তোমাকে না দেখে ফেলতাম, তাহলে আমরা সকলে গ্রেফতার হয়ে যেতাম। তোমাকে আমিই ধরিয়েছি।
তোমাদের যে লোকটি পীর সেজেছে, সে মুসলমান না খৃস্টান? গোয়েন্দা জিজ্ঞাসা করে।
জেনে কী করবে? মেয়েটি পাল্টা প্রশ্ন করে।
গোয়েন্দাগিরি অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে- গোয়েন্দা বললো- মৃত্যুর প্রাক্কালে আরো তথ্য জানতে চাই আর কি। এই ভেদ তো এখন আর বাইরে নিতে পারবো না।
মুসলমান- মেয়েটি বললো- মুসলমানদের দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত ওস্তাদদেরও ওস্তাদ।
কক্ষের দরজা খুলে যায়। কলো দাড়িওয়ালা দরবেশ এক ব্যক্তির সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করেই মেয়েটিকে বললো- তোমার কথা-বার্তা শেষ হয়ে থাকলে বেরিয়ে যাও।
মেয়েটি গোয়েন্দার প্রতি গভীর দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে বেরিয়ে যায়।
দরবেশ গোয়েন্দাকে বললো- শুধু এটুকু বলল, আমার ভেদ কার কার জানা আছে। তুমি কি আলী বিন সুফিয়ানকে বলে দিয়েছে, আমি সন্দেহভাজন?
না- গোয়েন্দা জবাব দেয়- আমি গোয়েন্দা বটে; কিন্তু এখানে গোয়েন্দাগিরি করার জন্য আসিনি।
দরবেশের হাতে হান্টার (চামড়ার চাবুক) ছিলো। সে পূর্ণ শক্তিতে গোয়েন্দাকে প্রহার করতে করতে বললো- আমি সত্য কথা শুনতে চাই।
কক্ষের দরজাটা সজোরে খুলে যায়। মেয়েটি ভেতরে প্রবেশ করে। সে দরবেশের উভয় হাত ধরে বিনয়ের সাথে বললো- একে মেরো না, সব বলে দেবে।
না, আমি কিছুই বলবো না। গোয়েন্দা বজ্রকণ্ঠে বললো।
দরবেশ আবারো প্রহার করতে উদ্যত হয়। মেয়েটি ছুটে গিয়ে গোয়েন্দার সম্মুখে দাঁড়িয়ে যায়। চীৎকার করে বলে ওঠে- মেরো না। এর দেহের আঘাত আমার হৃদয়ের জখমে পরিণত হবে।
তুমি কি একে রক্ষা করতে চাচ্ছো? অপর ব্যক্তি গর্জে ওঠে জিজ্ঞেস করে।
না- মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বললো- লোকটি যদি কোনো তথ্য না দেয়, তাহলে তরবারীর এক আঘাতে এর মাথাটা দেহ থেকে আলাদা করে ফেলো। নির্যাতন দিয়ে হত্যা করো না।
মেয়েটিকে টেনে বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো। গোয়েন্দার উপর অত্যাচার শুরু হয়ে যায়। সারাটা রাত তাকে শয্যায় পিঠ লাগাতে দেয়া হলো না। তাকে বহু কিছু জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে। নির্যাতনের পর নির্যাতন চলছে; তবু কোন তথ্য দিচ্ছে না।
রাতের শেষ প্রহর। মেয়েটি তার কক্ষে প্রবেশ করে। গোয়েন্দা অর্ধ অচেতন অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। দরবেশের লোকেরা তরবারীর আগা দ্বারা তার শরীরে খোঁচাচ্ছে। দেখে মেয়েটি তার গায়ের উপর শুয়ে পড়ে চীৎকার করতে শুরু করে- এ আমি সহ্য করতে পারবো না। আমি তোমাকে বলে দিয়েছি, এটা আমার জীবনের প্রথম ও শেষ ভালোবাসা। এর কষ্ট আমার কষ্ট। লোকটি তার কর্তব্য পালন করছে আর আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের জন্য এটুকুই যথেষ্ট। একে তোমরা প্রাণে মেরে ফেলো- নির্যাতন করো না।
গোয়েন্দা অর্ধ অচেতন অবস্থায় নিজ গায়ের উপর পড়ে থাকা মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে অস্ফুট স্বরে বললো- তুমি চলে যাও। পাছে আমি আমার কর্তব্য থেকে ছিটকে না পড়ি। এই অত্যাচার আমার কর্তব্যেরই অংশ। তুমি তোমার ধর্মের জন্য জীবন উৎসর্গ করো আর আমাকে আমার দীনের জন্য জান কুরবান করতে দাও।
মেয়েটি পাগলের মতো হয়ে গেছে। তাকে পুনরায় টেনে-হেঁচড়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো।
দরবেশ আদেশ করে– এই হতভাগীকে একটি কক্ষে আটকে রাখো।
***
দিনের অর্ধেকটা কেটে গেছে। আলী বিন সুফিয়ান তার গোয়েন্দার ফিরে আসার অপেক্ষায় অস্থির হয়ে ওঠেছেন। তার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা উত্তরোত্তর বেড়ে চলছে। সেই রাতে গেলো; এখনো ফিরলো না কেন! গতকাল তিনি শুভ্র শশ্রুমন্ডিত যে লোকটিকে পাকড়াও করেছিলেন, কয়েদখানায় রাতে নির্যাতনের মাধ্যমে তার থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে, কালো দাড়িওয়ালা দরবেশটা কে, তার আসল পরিচয় কী এবং তার মিশন কী।
দিবসের শেষ বেলা আলী বিন সুফিয়ান একটি কমান্ডো সেনাদল প্রস্তুত করেন। এখন তার প্রবল ধারণা, তাঁর প্রেরিত গোয়েন্দা ধরা পড়ে গেছে। আস্তানাটি যে শত্রুর নাশকতাকারী গোয়েন্দাদের আড্ডাখানা, তা এখন প্রমাণিত।
আলী বিন সুফিয়ান-এর কমান্ডোরা এতো দ্রুততার সঙ্গে এসে পৌঁছে যে, এলাকাবাসি কিছুই বুঝে ওঠতে পারেনি। তারা ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে বানরের ন্যায় লাফিয়ে লাফিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। পলকের মধ্যে ভেতরের সবগুলো লোককে ধরে ফেলে।
