মেয়েটি মিটি মিটি হাসছে।
চেনার চেষ্টা করছে, না?- মেয়েটি বললো- এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেছো? তুমি আমার শহর থেকে রক্ষা পেয়ে বেরিয়ে এসেছিলে। কিন্তু এখন নিজ ভূখণ্ডে আমর কয়েদি হয়ে গেছে। এখন আর বেরুতে পারবে না।
গোয়েন্দা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, যাতে প্রশান্তিও আছে, উদ্বেগও আছে। গোয়েন্দার তিন বছর আগের কাহিনী মনে পড়ে যায়। তাকে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য আক্রা প্রেরণ করা হয়েছিলো। আক্রা তখন খৃস্টানদের দখলে ছিলো। সেখানে তাদের বড় পাদ্রীর আস্তানা ছিলো, যাকে ক্রুশের মহান মোহাফেজ বলে অভিহিত করা হতো। যেসব খৃস্টান সম্রাট আরব এলাকা দখল করার জন্য আসতেন, তারা অবশ্যই সেখানে যেতেন এবং বড় পাদ্রীর আশির্বাদ। গ্রহণ করতেন। সে কারণে সামরিক দিক থেকে স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। আলী বিন সুফিয়ান সেখানে গোয়েন্দা প্রেরণ করে রেখেছিলেন। তারা সেখানে খৃস্টানবেশে একটি আস্তানাও গড়ে তুলেছিলো। তাদের তিন-চারজন গোয়েন্দা শত্রুর হাতে ধরা পড়েছিলো এবং দুজন শহীদ হয়েছিলো। ফলে সেখানকার কমান্ডার আরো গোয়েন্দা চেয়ে বার্তা প্রেরণ করেছিলো। তখন নতুনভাবে যাদের প্রেরণ করা হয়েছিলো, তাদের একজন এই গোয়েন্দা, যে এখন মিসরের একটি কক্ষে শক্রর হাতে বন্দি।
লোকটির গাত্রবর্ণ, দৈহিক কাঠামো ও মুখাবয়ব অত্যন্ত সুন্দর ও আকর্ষণীয়। বুদ্ধিমত্তাও অতিশয় প্রখর ও সতর্ক। অশ্বচালনায় এতোই দক্ষ যে, সামরিক মহড়া ও সমর প্রদর্শনীতে নিজের কৃতিত্ব-যোগ্যতা দেখিয়ে দর্শকদের তাক লাগিয়ে দিতে। চরিত্রও ফুলের মতো পবিত্র। খৃস্টান নাম ধারণ করে সে আক্রা প্রবেশ করেছিলো এবং নিজের দুর্দশা ও নির্যাতনের কাহিনী শুনিয়ে বলেছিলো, আমি হাবের মুসলিম বাহিনীতে নতুন সৈনিকদেরকে অশ্বচালনা প্রশিক্ষণ দিতাম। কিন্তু মুসলিম সৈন্যরা আমার এক যুবতী বোনকে অপহরণ করে আমাকে অন্যায়ভাবে ফৌজ থেকে বের করে দিয়েছে।
খৃস্টানরা তার চাল-চলন ও বিদ্যা-বুদ্ধিতে মুগ্ধ হয়ে তাকে অশ্বচালনার প্রশিক্ষণের জন্য রেখে দেয়। কিন্তু তার শিষ্যরা সৈনিক নয়। তারা যুবতী মেয়ে এবং বড় বড় অফিসারদের পুত্র। গোয়েন্দা জানতে পারে, এই মেয়েগুলোকে মুসলমানদের বিভিন্ন অঞ্চলে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। পরে কতিপয় পুরুষকেও তার হাতে তুলে দেয়া হয়। এরা সকলে খৃস্টান গোয়েন্দা। মুসলিম গোয়েন্দা তাদের মধ্যে একাকার হয়ে যায়। খৃস্টানদের থেকে সে মোটা অংকের ভাতাও পেতে শুরু করে।
এই মেয়েটি যে এখন তার সঙ্গে কক্ষে কথা বলছে- আক্ৰায় তার শিষ্য ছিলো। মেয়েটির গুপ্তচরবৃত্তির যোগ্যতা ছিলো; কিন্তু অশ্বচালনা জানতো না। আলী বিন সুফিয়ানের এই গোয়েন্দার মেয়েটিকে ভালো লাগতে শুরু করে। প্রথমে ভালো লাগা, তারপর ভালোবাসা। অবশেষে দুজনের মাঝে গভীর প্রণয় জমে যায়। এক পর্যায়ে গুরু-শিষ্য নয় প্রেমিক-প্রেমিকা পরিচয়ই মুখ্য হয়ে ওঠে। মেয়েটি এমনও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, এই লোকটির খাতিরে গুপ্তচরবৃত্তির মতো হীন পেশাটা ছেড়ে দেবে এবং তার স্ত্রী হয়ে সম্মানের জীবনযাপন করবে। মুসলমান গোয়েন্দা তার ভালোবাসার উত্তর ভালবাসা দ্বারাই দিয়েছিলো বটে; কিন্তু কর্তব্য পরিত্যাগ করতে পারেনি। মেয়েটি কাজ-কর্মে অবহেলা করতে শুরু করেছিলো। প্রেমিক গুরুকে ছাড়া তার কিছুই ভালো লাগছিলো না।
একদিন আক্রায় দুজন মুসলমান গোয়েন্দা ধরা পড়ে যায়। তাদের একজন তার জানামতো সকল সহকর্মীর ঠিকানা বলে দেয়। এই গোয়েন্দাও তাদের একজন ছিলো। খোঁজাখোজি শুরু হয়ে যায়। মেয়েটি তাকে জিজ্ঞেস করে- তুমি গুপ্তচর নও তো? মুসলমান নও তো? শুনেছি, এখানকার গোয়েন্দা বিভাগ তোমার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিচ্ছে এবং তোমার উপর নজর রাখছে।
জবাবে গোয়েন্দা হেসে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু মনটা তার অস্থির হয়ে ওঠে। রাতে কমান্ডারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। কমান্ডার বললো, আমাদের বহু লোক চিহ্নিত হয়ে গেছে। সম্ভব হলে এখান থেকে বেরিয়ে যাও।
গোয়েন্দা কমান্ডারের গৃহ থেকে বের হয়ে টের পায়, দুব্যক্তি তাকে অনুসরণ করছে। সে এগিয়ে গিয়ে আস্তাবলে ঢুকে পড়ে। একটি ঘোড়ায় জিন কষে। অমনি দুজন লোক এসে তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, কোথায় যাচ্ছো? লোকটি অত্যন্ত চৌকস ও সতর্ক। অবস্থা বেগতিক দেখে সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে ঘোড়ায় চড়েই ঘোড়া হাঁকায়। একজন তাঁর ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়ে মারা যায়। অপরজন কিছু বুঝতে না বুঝতে সে ছুটতে শুরু করে। গোয়েন্দা আক্ৰা থেকে বেরিয়ে আসে।
***
আমি তোমাকে চিনে ফেলেছি- গোয়েন্দা মেয়েকে বললো। তিন বছর পর তাদের এই সাক্ষাৎ- আমি বিস্মিত হয়নি। তুমি যে গোয়েন্দা, আমি জানি।
তিন বছর আগে তোমার প্রেমের ফাঁদে পড়ে আমি গুপ্তচরবৃত্তি ত্যাগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। মেয়েটি বললো- তুমি যদি বলতে, তুমি। মুসলমান এবং গোয়েন্দা, তবু আমি তোমাকে ধোঁকা দিতাম না। আমি তোমার সঙ্গে এসে পড়তাম। তোমার পালিয়ে আসার পর আমি যখন জানতে পারলাম, তুমি মুসলমান গুপ্তচর ছিলে, তখন আমি ব্যাথিত হয়নি। আমার বেদনাটা ছিলো তোমার বিরহের।
