লোকটি লাঠি হাতে ঝুঁকে ঝুঁকে ধীর পায়ে হেঁটে গ্রাম থেকে বেরিয়ে যায়। আলী বিন সুফিয়ান তাকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। বেশ দূরে গিয়ে লোকটি দাঁড়িয়ে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে। একদিক থেকে এক অশ্বারোহী ধেয়ে আসে। লোকটি ঘোড়ায় চড়ে বসে এবং কায়রোর দিকে রওনা দেয়। ঘোড়া নিয়ে আসা লোকটি পায়ে হেঁটে গ্রামের দিকে চলে যায়।
আলী বিন সুফিয়ান নিজ ঘোড়ায় আরোহণ করে অশ্বারোহী সাদা দাড়িওয়ালা লোকটির পেছন পেছন এগুতে থাকেন। লোকটি কয়েকবারই পেছন দিকে তাকায়। আলী বিন সুফিয়ান এগুতে থাকেন। লোকটি কায়রোর দিকে এগুতে থাকে। একটি লোক পেছনে পেছনে চলছে বলে সে বেজায় বিরক্ত। কায়রোমুখী হয়ে ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে দেয় সে। আলী বিন সুফিয়ানও গতির তাল বজায় রাখেন। তাঁর ঘোড়া আরো দ্রুত চলতে শুরু করে। লোকটি বারবার পেছন দিকে তাকাতে থাকে। আলী বিন সুফিয়ান তার পেছন পেছন যেতে থাকেন। কিছুদূর অগ্রসর হয়ে লোকটি কায়রোর রাস্তার পরিবর্তে ঘোড়া অন্য পথে ঘুরিয়ে দেয়। ঘোড়ার গতি স্বাভাবিক। আলী বিন সুফিয়ান তার ঘোড়াও সেই পথে ঢুকিয়ে দেন।
উভয় ঘোড়া এখন যেখানে, সেখানে এদিক-ওদিক দুএকটি ঝুপড়ি বা তবু দেখা যাচ্ছে। কোথাও যাযাবরদের অস্থায়ী ডেরা। লোকটি একের পর এক পথ পরিবর্তন করছে এবং বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছে। আলী বিন সুফিয়ানও তার পেছন পেছন অগ্রসর হচ্ছেন। লোকটির অস্থিরতা বেড়ে চলছে। অবশেষে সে কায়রোর দিকেই মুখ করে এবং ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে দেয়। আলী বিন সুফিয়ানের ঘোড়ার গতিও বেড়ে যায়। এখন উভয় ঘোড়ার মধ্যখানের ব্যবধান পনের-বিশ কদম। তারা কায়রো নগরীতে ঢুকে যাবে বলে। এমন সময় হঠাৎ শশ্রুমণ্ডিত লোকটি ঘোড়া থামিয়ে মোড় ঘুরে দাঁড়িয়ে যায়। আলী বিন সুফিয়ানও তার সম্মুখে গিয়ে থেমে যান।
তুমি দস্যু মনে হচ্ছে–সাদা শশ্রুমণ্ডিত অশ্বারোহী বললো। খঞ্জর বের করে পুনরায় বললো আমার পিছু নিয়েছো কেনো?
আলী বিন সুফিয়ান দেখলেন, সাদা দাড়ির কারণে লোকটার বয়স সত্ত্বর বছর মনে হচ্ছে। কিন্তু চেহারা, চোখ ও দাঁত বলছে চল্লিশেরও কম। আলী বিন সুফিয়ানও ছদ্মবেশে। তিনি কটিবন্ধ থেকে সোয়া গজ লম্বা তরবারীটা বের করে হাতে নেন।
দাড়ি খুলে ফেলো- আলী বিন সুফিয়ান লোকটির এক পাজরে তরবারী ঠেকিয়ে বললেন- আমার সামনে সামনে চলো।
শুনে লোকটির চোখ দুটো পলকহীন দাঁড়িয়ে যায়। আলী বিন সুফিয়ান তরবারীর আগাটা তার কালো পট্টির উপর রেখে দাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে ঝটকা টান দেন। সঙ্গে সঙ্গে দাড়িগুচ্ছ মুখমণ্ডল থেকে আলাদা হয়ে যায়। ক্লিনসেভ চেহারাটা বেরিয়ে আসে। পরক্ষণে তিনি নিজের কৃত্রিম দাড়িও খুলে ফেলে বললেন- আমিও তোমাকে চিনি। তুমিও আমাকে চেনো। চলো রওনা হই।
লোকটি ক্ষমতাচ্যুৎ আব্বাসী খেলাফতের একজন আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মী। এই খেলাফতকে- যার সিংহাসন কায়রোতে ছিলো- সাত-আট বছর আগে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বিলুপ্ত করে দিয়েছিলেন। তখন খলীফা ছিলেন আল-আজেদ, যিনি হাশিশি, ক্রুসেডার ও সুদানীদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে রেখেছিলেন। সুলতান আইউবী নুরুদ্দীন জঙ্গীর সঙ্গে কথা বলে এই খেলাফতকে বিলুপ্ত করে এমারতে মেসেরকে খেলাফতে বাগদাদের অধীন করে দেন। কিন্তু খেলাফতে আব্বাসিয়ার পদচ্যুৎ কর্মকর্তারা এখনো গোপন তৎপরতায় লিপ্ত। সুলতান আইউবীর রামাল্লা পরাজয় তাদের জন্য সোনালী সুযোগ এনে দেয়। এই আব্বাসীরা গোপন পন্থায় সুলতান আইউবী এবং তার বাহিনীকে চরিত্রহীন, বিলাসী, লুটেরা এবং পরাজয়ের জন্য দায়ী প্রচারে তৎপর হয়ে ওঠে।
এই ধৃত লোকটিও তাদেরই একজন।
আলী বিন সুফিয়ান লোকটিকে হেফাজতে নিয়ে নেন এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কয়েদখানায় আটক করে রাখেন।
***
আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা রাতে দরবেশের নির্ধারিত সময়ে গ্রামের বাইরে এক স্থানে গিয়ে দাঁড়ায়। গত রাতের সৈনিক তাকে নিতে চলে আসে। সৈনিক তাকে নতুন কিছু উপদেশ দিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। তারা পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু গোয়েন্দাকে গত রাতের কক্ষের পরিবর্তে অন্য এক কক্ষে নিয়ে বসায়। এই কক্ষে কালো দাড়িওয়ালা বুযুর্গ নেই- কেউ নেই। তাকে রেখে সৈনিকও বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। গোয়েন্দা দরজায় হাত লাগিয়ে বুঝতে পারে, দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কক্ষে কোনো জানালা নেই। গোয়েন্দা বুঝে। ফেলে আমি ধরা পড়ে গেছি। এরা জেনে গেছে, আমি গুপ্তচর। পালাবার কোনো পথ নেই। কী করা যায় ভাবতে শুরু করে গোয়েন্দা।
অনেকক্ষণ পর দরজা খুলে যায়। যে দুটি মেয়েকে দরবেশ নিজের কন্যা পরিচয় দিয়েছিলো, তাদের একজন ভেতরে প্রবেশ করে। এখন সে পূর্বের ন্যায় আপাদমস্তক পর্দাবৃতা নয়। তবে ইউরোপিয়ানদের ন্যায় নগ্নও নয়। তার পোশাক আরব নারীদের পোশাকের ন্যায়। কারুকাজ কিছু এরাবিয়ান, কিছুটা ইউরোপিয়ান। মেয়েটি ভেতরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে কে যেনো বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। দরজা আবারো বন্ধ হয়ে যায়। কক্ষে প্রদীপ জ্বলছে। মেয়েটির প্রতি চোখ পড়ামাত্র গোয়েন্দার চোখ বিস্ময়ে নিষ্পলক হয়ে যায়।
