এতে আমার প্রশান্তি আসবে না- গোয়েন্দা অশ্রু ঝরাতে ঝরাতে বললো- মুখের কথায় আমাকে সান্ত্বনা দিন। আমাকে আদেশ করুন। আমি আপনার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো। আমার একটি মাত্র সন্তান। আপনি আদেশ করলে আমি তাকেও আপনার পায়ের উপর জবাই করে ফেলবো। সুলতান আইউবীকে হত্যা করতে বলুন, আমি আপনার আদেশ পালন করবো। কথা বলুন। আদেশ করে দেখুন আমি মান্য করি কিনা।
অপর এক ব্যক্তি ভেতরে প্রবেশ করে। সে গোয়েন্দার কথাবার্তা মনোযোগ সহকারে শুনছে এবং গভীর দৃষ্টিতে অবলোকন করছে। সে গোয়েন্দাকে জিজ্ঞেস করে- তুমি এতো অস্থির হচ্ছো কেনো? এখন তো তুমি মুর্শিদের ছায়ায় এসে পড়েছো!
আমার পাপ এতো বেশি যে, আমি রাতে ঘুমাতে পারি না গোয়েন্দা বললো- আমি হামাতের সন্নিকটে এক গ্রামে এক মুসলিম পরিবারের একটি মেয়েকে অপহরণ করতে গিয়ে তার যুবক ভাইকে খুন করেছিলাম। আমি যদি ফৌজের সৈনিক না হতাম, তাহলে আমাকে জল্লাদের হাতে তুলে দেয়া হতো। কিন্তু এই ঘটনার জন্য কেউ আমাকে কিছু জিজ্ঞেসও করেনি।
দরবেশ চক্ষু বন্ধ করে ফেলে। ঠোঁট নড়ছে। হাত দুটো উপরে তুলে পরে গোয়েন্দার দিকে ইশারা করে। কিছুক্ষণ পর ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে। চোখ খুলে যায়। এবার মুখ খোলে। গোয়েন্দাকে বললো- অনেক কষ্টে তোমার সঙ্গে কথা বলার অনুমতি পেয়েছি। মন দিয়ে শোন। আমি তোমার গুনাহ মাফ করিয়ে দেবো বরং তুমি ও তোমার পরিবার এতো বেশি হালাল জীবিকা লাভ করবে, যা তুমি স্বপ্নেও দেখোনি। এখন চলে যাও, কাল আবার এসো।
দরবেশ পুনরায় মুরাকাবায় আত্মনিয়োগ করে। সৈনিক এবং অপর লোকটি গোয়েন্দাকে বারান্দায় নিয়ে যায়। তারা তাকে দরবেশের এমন সব কারামতের কাহিনী শোনায় যে, গোয়েন্দা অভিভূত হয়ে পড়ে। মেয়ে দুটো জানালার ফাঁক দিয়ে দেখছে। যে মেয়েটি গোয়েন্দাকে প্রথমবার দেখে চমকে ওঠেছিলো, সে অপর মেয়েকে বললো- একে আমি আগে কোথাও দেখেছি। লোকটা ধোকা দিচ্ছে না তো! মানুষটা কিন্তু সে-ই।
***
ঘটনাটা সেরূপই মনে হচ্ছে, যেমনটি আমরা আগেও একবার ধরেছিলাম- গোয়েন্দা আলী বিন সুফিয়ানকে রিপোর্ট করছে- সেই মুরাকাবা, সেই চিল্লা সেই জিন ও মানুষের আবেগকে আয়ত্ত্ব করে তাদের উপর যাদু প্রয়োগ করা। আমাদের ফৌজের যে সৈনিক আমাকে তার নিকট নিয়ে গিয়েছিলো, সে কেবল ফৌজের বিরুদ্ধেই কথা বলছিলো। মসজিদে মুসল্লীদের উদ্দেশ্যেও একই কথা বলেছিলো। লোকটি আমার সঙ্গে যেসব কথা বলেছে, তাতে প্রমাণিত হচ্ছে, তার আরো একাধিক সঙ্গী আছে, যারা তারই মতো মসজিদে মসজিদে গিয়ে মুসল্লীদের আমাদের ফৌজের বিরুদ্ধে উস্কানি দিচ্ছে। রণাঙ্গনের অসত্য কাহিনী শোনাচ্ছে এবং বুঝাতে চেষ্টা করছে, ফৌজে ভর্তি হওয়া পাপের কাজ।
তাদের এই অভিযান মসজিদেই পরিচালনা করার কথা- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- মসজিদে বলা কথাকে মানুষ অহীর সমান মর্যাদা দিয়ে থাকে। মানুষ আবেগের গোলাম। তারা সেই লোককে মুরশিদ-পথের দিশারী বলে বরণ করে নেয়, যে প্রথমে আবেগকে উত্তেজিত করে পরে শব্দ দ্বারা তাকে শান্ত করে। তুমি কাল আবার যাও। আমাকে গ্রাম ও ঘরটা বুঝিয়ে দাও। এদিক-ওদিক দেখে অধিকতর তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করো। তোমার তথ্যের ভিত্তিতে আমি সেখানে কমান্ডো অভিযান চালাবো।
আমার ভয় হয় কমান্ডো অভিযান চালালে সেখানকার অধিবাসীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠবে- গোয়েন্দা বললো- সৈনিক আমাকে বলেছে, গ্রামের প্রতিটি শিশুও তার অনুরক্ত এবং দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে।
আমাদের অতো কিছু তোয়াক্কা করা চলবে না- আলী বিন সুফিয়ান বললেন- যে শাসক জনগণের উপর শাসন চালাতে চায়, জনগণের আবেগ-উচ্ছ্বাসের তোয়াক্কা তাকে করতে হয়। এই চরিত্রের শাসকরা জনগণের আবেগ নিয়ে খেলা করে থাকে, যাতে প্রজারা খুশি থাকে এবং তাদের আনুগত্য করে। আমাদের কাজ সালতানাতে ইসলামিয়া ও দেশের জনগণের মর্যাদার সুরক্ষা। আমরা এলাকাবাসীকে হাকীকত দেখাবো। আমরা তাদেরকে সুলতান আইউবীর গোলাম বা ভক্ত বানাতে চাই না। আমরা তাদেরকে বলবো, ইসলামের প্রহরী তোমরাও ততোটুকু, যতোটুকু তোমাদের সুলতান। আমরা তাদেরকে ইসলামের দুশমন দেখাবো। আমরা আবেগ-পূজার নেশা জাগিয়ে জাতিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চাই না। জাতিকে বাস্তবতার ধাক্কা দিয়ে জাগাতে হবে। তুমি যাও। দেখো, বুঝে। তারপর রিপোর্ট করো।
গোয়েন্দার দরবেশের আস্তানায় যাওয়ার সময় রাতে। আলী বিন সুফিয়ান নিজের বেশভূষা পরিবর্তন করে উক্ত গ্রামে চলে যান। তিনি দরবেশের ঘরটি চিনে নেন এবং তার প্রতি মানুষের ভক্তি-বিশ্বাসের আন্দাজ করেন। মানুষের কথাবার্তা শোনেন। মিসরের ফৌজের বিরুদ্ধে ঝড় তোলা হচ্ছে। আলী বিন সুফিয়ান বাড়ির পেছনটা দূর থেকে দেখে নেন। ওখানে ছোট্ট একটি দরজা। দরজাটা বন্ধ। গাছ-গাছালি আছে। ডানে ও বামে আরো দুটি ঘরের পশ্চাদ্দেশ। কোন মানুষ দেখা যাচ্ছে না। যতো ভিড় বাড়ির সম্মুখে। হঠাৎ দরজাটা খুলে যায়। পুরাতন চোগা পরিহিত শুভ্র শশ্রুমণ্ডিত এক ব্যক্তি বেরিয়ে আসে। আলী বিন সুফিয়ান আড়াল হয়ে যান। তিনি খোলা দরজাটায় একটি সুন্দরী যুবতীকে দেখতে পান। মেয়েটি দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
