বাইরে উন্নত জাতের দুটি ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। সরাইখানার কর্তৃপক্ষ মিগনানা মারিউসের জন্য ভাড়ায় এনে দিয়েছে ঘোড়া দুটো। সে স্ত্রীকে নিয়ে ভ্রমণে যাবে বলেছিলো। মিগনানা মারিউস ও মুবী দুজন দুটি ঘোড়ায় চড়ে বসে। অপরজন ভৃত্যের মত তাদের পিছনে পিছনে হাঁটছে।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী কক্ষে উপবিষ্ট। তিনি সুদানীদের ব্যাপারে নায়েবদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন। এই ঝামেলা অল্প সময়ে শেষ করে ফেলতে চান সুলতান। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সুলতান জঙ্গীর প্রেরিত বাহিনী, মিসরের নতুন ফৌজ এবং ওফাদার সুদানীদের সমন্বয়ে একটি যৌথ বাহিনী গঠন করবেন এবং অতিসত্ত্বর জেরুজালেম আক্রমণ করবেন।
রোম উপসাগরে খৃষ্টানদের পরাজয়বরণের পর পরই সুলতান জঙ্গী রাজা ফ্রাংককে পরাজিত করেন। ফলে চরমভাবে বিপর্যস্ত খৃষ্টান বাহিনী দীর্ঘদিন পর্যন্ত আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। আত্মসংবরণের আগে আগেই খৃষ্টানদের হাত থেকে জেরুজালেম উদ্ধার করার পরিকল্পনা নেন সুলতান আইউবী। তিনি তারও আগে সুদানীদের পুনর্বাসনের কাজটা সম্পন্ন করে ফেলতে চাইছেন, যাতে তারা চাষাবাদ ও সংসার কর্মে আত্মনিয়োগ করে এবং বিদ্রোহের চিন্তা করার সুযোগ না পায়।
নতুন বাহিনীর পুনর্গঠন এবং হাজার হাজার সুদানীকে জমি দিয়ে পুর্নবাসিত করা সহজ কাজ নয়। সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এমন কিছু কর্মকর্তা আছেন, যারা মিসরের গভর্নর হিসেবে সুলতান আইউবীকে দেখতে চান না। সুদানী বাহিনীকে ভেঙ্গে দিয়েও সুলতান সমস্যার এক নতুন মাত্রা সৃষ্টি করেছেন। সুদানী বাহিনীর কয়েকজন পদস্থ অফিসার এখনো জীবিত। তারা বাহ্যত সুলতান আইউবীর আনুগত্য মেনে নিয়েছিলো ঠিক, কিন্তু আলী বিন সুফিয়ানের ইন্টেলিজেন্স বলছে, বিদ্রোহের ভস্মস্তূপে এখনো কিছু অঙ্গার রয়ে গেছে। সুদানীদের পুনর্বাসন এবং সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনে এ একটি মারাত্মক সমস্যা।
গোয়েন্দা বিভাগ আরো রিপোর্ট করে, নিজেদের পরাজয়ে এ বিদ্রোহী নেতাদের যতটুকু দুঃখ, তার চেয়ে বেশী দুঃখ খৃষ্টানদের পরাজয়ে। কারণ, তারা বিদ্রোহে ব্যর্থ হওয়ার পরও খৃষ্টানদের সাহায্য পেতে চাচ্ছিলো। এখন খৃষ্টানদের পরাজয়ে তাদের সে আশার গুড়ে বালি পড়েছে। মিসরের প্রশাসন ও ফৌজের । দু-তিনজন কর্মকর্তা সুদানীদের পরাজয়ে এজন্যেও ব্যথিত যে, তাদের বুকভরা আশা ছিলো, এ বিদ্রোহে সুলতান আইউবী হয়তো নিহত হবেন কিংবা মিসর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবেন।
এরা হলো ঈমান-বিক্রয়কারী গাদ্দার। কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ঘটা করে তাদের বিরুদ্ধে কোন এ্যাকশন নেননি। তিনি তাদের সঙ্গে সদয় আচরণ-ই করতেন। কোন বৈঠকে তাদের বিরুদ্ধে কোন কথা বলেননি। অধীন ও সেনাবাহিনীর উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে কখনো তিনি একথা বলেননি যে, যারা আমার বিরোধিতা করছে, আমি তাদের দেখিয়ে ছাড়বো। তাদের ব্যাপারে ধমকের সুরে কথা বলেননি কখনো। তবে প্রসঙ্গ এলে মাঝে-মধ্যে বলতেন–কেউ যদি কোন সহকর্মীকে ঈমান বিক্রি করতে দেখো, তাহলে তাকে বারণ করো। তাকে স্মরণ করিয়ে দিও যে, সে মুসলমান। তার সঙ্গে মুসলমানদের মত আচরণ করো, যাতে আত্মপরিচয় লাভ করে সে দুশমনের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে।
কিন্তু তিনি তাদের তৎপরতার উপর কড়া নজর রাখতেন। আলী বিন সুফিয়ানের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোও গুরুত্বের সঙ্গে তাদের গতিবিধির উপর নজরদারীতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। বিশ্বাসঘাতকদের গোপন রাজনীতি সম্পর্কে অবহিত হতেন সুলতান আইউবী।
আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্ব এখন বেড়ে গেছে আরো। রক্ষী ও উষ্ট্ৰচালকদের নিহত হওয়ার সংবাদ পৌঁছে গেছে কায়রো। এই রক্ষী ও উষ্ট্রচালকদের হত্যা এবং অজ্ঞাত ব্যক্তিদের দ্বারা রক্ষীদের হাত থেকে গুপ্তচরদের ছিনিয়ে নেয়া প্রমাণ করলো, এখনো মিসরে খৃষ্টান গুপ্তচর এবং গেরিলা বাহিনী রয়ে গেছে। আর দেশের কিছু লোক যে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও আশ্রয় দিচ্ছে, সে কথা বলাই বাহুল্য। তবে সুলতান আইউবীর প্রেরিত বাহিনী যে ঠিক নৌকায় উঠে ওপারে পাড়ি দেয়ার সময় সেই গেরিলা বাহিনী ও গুপ্তচরদের শেষ করে । দিয়েছে, সে খবর কায়রো পৌঁছেনি এখনো। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি গেরিলাদের প্রতিহত করার জন্য প্রেরণ করেছেন দুটি টহল বাহিনী। জোরদার করেছেন গোয়েন্দা তৎপরতা।
বিষণ্ণতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন সুলতান আইউবী। যে প্রত্যয় নিয়ে তিনি মিসর এসেছিলেন, তা কতটুকু সফল হলো, সে ভাবনায় তিনি অস্থির। তিনি সালতানাতে ইসলামিয়াকে জঞ্জালমুক্ত করে তাকে আরো বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ঝড় উঠেছে যেমন মাটির উপর থেকে, তেমনি নীচ থেকেও। সেই ঝড়ে কাঁপতে শুরু করেছে তার সেই স্বপ্নসৌধ। এ চিন্তায়ও তিনি অস্থির যে, মুসলমানদের তরবারী আজ মুসলমানদের-ই মাথার উপর ঝুলছে। নীলাম হচ্ছে মুসলমানদের ঈমান। ষড়যন্ত্রের জালে আটকে গিয়ে সালতানাতে ইসলামিয়ার খেলাফতও এখন খৃষ্টানদের ক্রীড়নকে পরিণত। নারী আর কড়ি প্রকম্পিত করে তুলেছে আরবের বিশাল পবিত্র ভূখণ্ড।
নিজেকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র সম্পর্কেও সুলতান সম্পূর্ণ সচেতন। কিন্তু তার জন্য তিনি কখনো পেরেশান হননি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন–জীবন আমার আল্লাহর হাতে। তাঁর নিকট যখন পৃথিবীতে আমার অস্তিত্ব অপ্রয়োজনীয় বিবেচিত হবে, তখন তিনি আমাকে তুলে নেবেন।
