সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধেও মানুষ মুখ খুলছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
কালো দাড়িওয়ালা দরবেশ তার দুকন্যাকে নিয়ে যে গ্রামটিতে অবস্থান নিয়েছিলো, এখন সে সেখানকার বাসিন্দা। গ্রামবাসীরা তাকে একটি ঘর দিয়ে রেখেছে। মিসরীদের গুনাহ মাফ করাবার জন্য তিন মাস চিল্লা করতে হবে বলে সে প্রকাশ্যে উঠাবসা করা ও মানুষের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। উক্ত গৃহ থেকে বাইরে বের হলেও স্বল্প সময়ের জন্য বের হচ্ছে এবং নীরব থাকছে। উপস্থিত জনতাকে হাত নেড়ে ইঙ্গিতে সালাম করছে এবং ভেতরে চলে যাচ্ছে। মাঝপথ থেকে তার সঙ্গে আসা সৈনিকরাই তার ঘনিষ্ঠ সহচর। আর সেই দুব্যক্তি যারা পরে পার্বত্য অঞ্চলে এসে তাকে সেজদা করেছিলো। লোকটাকে এতো প্রচার করে দেয় যে, এখন তাকে এক নজর দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসা-যাওয়া করছে।
***
আলী বিন সুফিয়ানের এক গোয়েন্দা ডিউটির অংশ হিসেবে ছদ্মবেশে কায়রোর উপকণ্ঠে এক স্থানে যোরাফেরা করছে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। মাগরিবের নামায আদায় করার জন্য সে মসজিদে প্রবেশ করে। নামাযের পর ইমাম সাহেব দুআ করেন। মুনাজাত শেষ হলে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে মুসল্লীদের কিছুক্ষণের জন্য বসতে অনুরোধ জানিয়ে ভাষণ দিতে শুরু করে। তার ভাষণের বিষয়বস্তু রামাল্লার পরাজয়। সে সুলতান আইউবীর ফৌজের বিরুদ্ধে সেসব কথাবার্তা বলতে শুরু করে, যা কালো দাড়িওয়ালা দরবেশ বলেছিলো। এই লোকটি দরবেশের সূত্র এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেনো লোকাট গায়েব জানে এবং জিনরা তাকে জীবিকা পৌঁছায়। সে সফরের পূর্ণ কাহিনী শোনায় এবং তারা কীভাবে গায়েব থেকে পানি ও খেজুর লাভ করেছিলো, তার বিবরণ প্রদান করে।
মুসল্লীরা তন্ময় হয়ে তার বক্তৃতা শুনতে থাকে।
বক্তব্য শেষ হলে মুসল্লীরা তাকে দরবেশ সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করে তিনি কি মনের আশা পূরণ করতে পারেন? দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত লোকদের আরোগ্য দান করতে পারেন? ভবিষ্যতের খবর জানেন? সন্তান দিতে পারেন?
উত্তরে বক্তা বললো, তিনি এখনো সকলকে শুধু এ কথাই বলছেন যে, সুলতান আইউবী ও তার বাহিনীতে ফেরাউনী চরিত্র সৃষ্টি হয়ে গেছে এবং তাদের পরাজয়ের কারণও এটাই। তিনি আরো বলছেন, তোমরা না নিজেরা সেনাবাহিনীতে ভর্তি হবে, না অন্যকে ভর্তি হতে দেবে। অন্যথায় তোমাদের বিরাট ক্ষতি হবে। কারণ, গুনাহের শাস্তির মেয়াদ এখনও পূর্ণ হয়নি। তিনি তিন মাসের জন্য মুরাকাবায় বসেছেন। তিন মাস পরে বলবেন, মিসরীদের পাপ ক্ষমা করা হয়েছে কিনা।
লোকটি মসজিদ থেকে বের হয়ে একদিকে হাঁটতে শুরু করে। আলী বিন সুফিয়ানের গোয়েন্দা তার পিছু নেয় এবং তাকে জিজ্ঞেস করে, আপনি যে বুযুর্গের কথা বলেছেন, তার সঙ্গে কীভাবে সাক্ষাৎ করতে পারি। আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই। আমি একজন সৈনিক। আপনার বক্তব্য শুনে মনে ভয় ধরে গেছে যে, ফৌজের পাপের শাস্তি আমাকেও ভোগ করতে হয় কিনা। আমিও দামেশক-হালুবের রণাঙ্গনে গিয়েছিলাম। সেখানে আমিও সেই পাপ করেছি, যার আলোচনা আপনি করেছেন। আপনি আমাকে বুযুর্গের নিকট নিয়ে চলুন। তিনি যদি বলেন আমি ফৌজ থেকে পালিয়ে যাবো। তিনি আমার থেকে যে সেবা চাইবেন, আমি দেবো। আমি খোদর অসন্তোষকে ভয় করি।
লোকটি এতোই অনুনয়-বিনয় করে যে, তার চোখ থেকে অশ্রু নেমে আসে।
আমার সঙ্গে চলো- লোকটি বললো- কিন্তু কাউকে বলবে না তুমি তার কাছে গিয়েছিলে। বর্তমানে তিনি চিল্লায় আছেন। তিন মাসের জন্য মুরাকাবায় বসেছেন। কারো সঙ্গে কথা বলছেন না। সাক্ষাতের পর তিনি যা যা জিজ্ঞেস করবেন, কেবল তারই উত্তর দেবে, কোন ফালতু কথা বলবে না।
আপনি কি সেই গ্রামেরই বাসিন্দা?- গোয়েন্দা জিজ্ঞেস করে বলেছেন আপনি রামাল্লার রণাঙ্গন থেকে আসা সৈনিক?
এই জন্যই তো কুরআনে হাত রেখে বলতে পারবো, এই বুযুর্গ আল্লাহর ঘনিষ্ঠ বান্দাদের একজন সৈনিক বললো- আমি রণাঙ্গনের রুদ্ররোষ দেখেছি। দেখেছি সফরের গজবও। কিন্তু এই লোকটি মরু প্রান্তরকে ফুল বাগিচায় পরিণত করে দিয়েছিলেন। এখন আর আমি বাহিনীতে যোগ দেবো না।
গ্রামটা দূরে নয়। দুজন কথা বলতে বলতে পৌঁছে গেছে। রাত গম্ভীর হয়ে গেছে। সৈনিক গোয়েন্দাকে অন্ধকারে দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে সেই ঘরে চলে যায়, যেখানে তার পীর অবস্থান করছে। খানিক পর ফিরে এসে বললো, আপনি পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে চলে আসুন। বলেই নিজে তার সম্মুখে সম্মুখে হাঁটতে শুরু করে। দুজন পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। দেউড়ি ও বারান্দা অতিক্রম করে তারা একটি কক্ষে প্রবেশ করে। বারান্দায় আলো ছিলো। দরবেশ যে দুটো মেয়েকে নিজের কন্যা বলে পরিচয় দিয়েছিলো, তারা অন্য এক কক্ষে অবস্থান করছে। বারান্দায় পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে তারা কক্ষের জানালা খুলে দেখে। বাইরে চোখ ফেলেই একটি মেয়ে চমকে ওঠে এবং অলক্ষ্যে তার মুখ থেকে উহ! বেরিয়ে আসে।
কী হলো? অপর মেয়ে জিজ্ঞেস করে- লোকটি কে?
মনে হয় আমরা ধরা পড়ে গেছি- মেয়েটি উত্তর দেয়- এই লোকটাকে আমি আগেও কোথাও দেখেছি। গোয়েন্দা মনে হচ্ছে। মেয়েটি গভীর ভাবনায় হারিয়ে যায়।
গোয়েন্দা কক্ষে প্রবেশ করে দরবেশের সম্মুখে সেজদাবনত হয়। তার পায়ে মাথা ঘষে। দরবেশ মেঝেতে কার্পেট বিছিয়ে বসে আছেন। গোয়েন্দা কান্নাজড়িত কণ্ঠে সবিনয় অনুরোধ জানায়, আপনি আমার গুনাহগুলো মাফ করিয়ে দিন। সে সৈনিকদের সঙ্গে পথে যেসব আবেগময় কথা বলেছিলো, দরবেশের সম্মুখেও সেসব পুনর্ব্যক্ত করে। তার চোখে অশ্রু এসে যায়। দরবেশ নিজের তাসবীহটা তার মাথার উপর বুলিয়ে মুচকি হেসে মাথায় হাত রাখে।
