আল-আদিলের বার্তা যেমনি সুলতান আইউবীকে উজ্জীবিত করে তোলে, তেমনি তাঁর সালার, কমান্ডার প্রমুখদের বিক্ষত মনোবলকেও চাঙ্গা করে তোলে। যাদের অন্তরে সুলতান আইউবী ও তাঁর ফৌজের বিরুদ্ধে সংশয় সৃষ্টি হয়েছিলো, তা দূর হয়ে যায়।
ওদিকে আল-আদিলও থেমে নেই। তিনি তার বাহিনীকে ত্রিশ চল্লিশজনের দলে বিভক্ত করে সেই এলাকায় নিয়ে যান, যেখানে বল্ডউইন ছাউনি ফেলে অবস্থান করছেন। তিনি তাঁর কমান্ডারদেরকে গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। উদ্দেশ্য, দুশমনকে অস্থির করে রাখতে হবে। যেনো তারা অগ্রযাত্রা করতে না পারে এবং বসে থাকতে না পারে।
বল্ডউইন পূর্ব থেকেই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তিনি এতো বিশাল বাহিনী নিয়ে এই আশায় এসেছিলেন যে, তিনি দামেশক পর্যন্ত সকল ভূখণ্ড দখল করে ফেলবেন। কিন্তু এখন তার অবস্থা হচ্ছে, প্রতি রাতে বাহিনীর কোনো না কোনো অংশের উপর তীরবৃষ্টি হচ্ছে কিংবা আক্রমণ হচ্ছে। সৈন্যদের সচেতন হতে না হতে আক্রমণকারীরা সটকে পড়ছে।
বল্ডউইন তার বাহিনীকে সমগ্র অঞ্চলে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছেন। আল-আদিলের কমান্ডো বাহিনীর ন্যায় গ্রুপ তৈরি করে দিয়েছেন, যারা রাতে এদিক-ওদিক টহল দিচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি ভোরেই বল্ডউইনকে সংবাদ শুনতে হচ্ছে, আজ অমুক ক্যাম্পের উপর আক্রমণ হয়েছে কিংবা অমুক গ্রুপটি মারা পড়েছে।
অঞ্চলটা পাহাড়ি। আল-আদিলের গেরিলাদের জন্য এটি একটি বিশেষ সুবিধা। সুযোগটা তারা ভালোভাবেই কাজে লাগাচ্ছে। তবে এই স্বার্থ উদ্ধার করতে আল-আদিলকে অনেক মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। কমান্ডোরা এতো দুঃসাহসিকতার সাথে আক্রমণ চালাচ্ছে যে, তারা দুশমনের ক্যাম্পের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ছে এবং নিজেদের জীবন কুরবান করে সমূহ ক্ষতিসাধন করছে।
এই ধারার যুদ্ধ আর এই কুরবানীর মাধ্যমে কোনো অঞ্চল জয় করা সম্ভব ছিলো না। আল-আদিল দুশমনকে সেখান থেকে পেছনে হঠাতে পারছেন না। কিন্তু উপকারও কম হচ্ছে না যে, খৃস্টানদের এই বিশাল বাহিনীটি সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে। বল্ডউইন যদি সম্মুখে অগ্রসর হতেন, তাহলে এই সামান্য সৈন্য নিয়ে আল-আদিল মুখোমুখি যুদ্ধে দুঘন্টাও টিকতে পারতেন না।
বল্ডউইনের ক্যাম্পে কর্মরত স্থানীয় লোকদের মধ্যে আল-আদিলের গুপ্তচরও আছে। সুযোগমতো তারাও কাজ করছে। খৃস্টানরা ঘোড়াকে খাওয়ানোর জন্য পাহাড়ের উঁচুতে শুস্ক ঘাসের স্তূপ জড়ো করে রেখেছিলো। আল-আদিলের এক গুপ্তচর তাতে আগুন ধরিয়ে ভস্ম করে ফেলে।
আল-আদিল সংবাদ পান, দামেশক থেকে সামান্য সাহায্য আসছে। হাল্ব থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা নেই। আল-মালিকুস সালিহ বার্তা প্রেরণ করেন, খৃস্টানরা হাররান দুর্গ অবরোধ করার পরিকল্পনা আঁটছে। তা-ই যদি ঘটে যায়, তাহলে হাবের ফৌজ দ্বারা তাদের মোকাবেলা করতে হবে।
***
কয়েকজন ইউরোপীয় ঐতিহাসিক লিখেছেন, রামাল্লার পরাজয়ের পর ইসলামী বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়া হয়। তার ক্ষুদ্র যে ইউনিটগুলো বেঁচে গিয়েছিলো, তারা লুটপাটকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। তারা খৃস্টানদের সেনা কাফেলাগুলোতেও হাইজ্যাক শুরু করে।
কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, লুট করতো স্বয়ং খৃস্টান সৈন্যরা। অধিকাংশ ঐতিহাসিক এ তথ্য স্বীকার করেছেন। পূর্বেও ঐতিহাসিকদের সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, খৃস্টান সৈন্যরা অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে মুসলিম কাফেলাসমূহ লুণ্ঠন করতো। তারা এই লুটতরাজ এমন ধারায় করতো, যেন এটি তাদের সামরিক ডিউটি। কতিপয় ঐতিহাসিক যেসব মুসলিম সেনাদল সম্পর্কে লিখেছেন, তারা লুটতরাজ করতে শুরু করেছিলো, তারা ছিলো মূলত আল-আদিলের কমান্ডো সেনা, যারা ম্রাট বল্ডউইনের বিশাল বাহিনীকে গেরিলা অপারেশনের মাধ্যমে একই অঞ্চলে আটকে রেখেছিলো।
যা হোক, গেরিলা অপারেশনে আল-আদিলকে অনেক মূল্য গণনা করতে হয়েছে। কিন্তু সৈনিকদের জযবা এতই তীব্র ছিলো যে, একজন সৈনিকও পেছন দিকে তাকাতে সম্মত ছিলো না। অধিকাংশ সৈন্য অবিরাম উপত্যকা ইত্যাদি অঞ্চলে টহল দিয়ে অপারেশন পরিচালনা করে ফিরছিলো। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ক্ষণিকের জন্য ক্যাম্পে যাওয়ার ফুরসত ছিলো না। ঐতিহাসিক আসাদুল আসাদীর প্রকাশিত পান্ডুলিপির ভাষ্যমতে, তারা ব্যাঘ্রের ন্যায় শিকারের সন্ধানে ওঁৎ পেতে থাকতো এবং যখনই শিকার চোখে পড়তো, তখন আর নিজের জীবনের কোনো তোয়াক্কা থাকতো না। তারা দুশমনের অধিক থেকে অধিকতর ক্ষতিসাধনের লক্ষ্যে অবলীলায় শহীদ ও আহত হয়ে যেতো। তাদের রাত কাটতো মরু বিয়াবানে-অঘুম নয়নে।
কিন্তু কায়রোতে এই প্রোপাগাণ্ডা জোরেশোরে বেড়ে চলেছে যে, মিসরের ফৌজ চরিত্রহীন ও বিলাসী হয়ে ওঠেছে এবং রামাল্লার পরাজয় তার শাস্তি। কায়রোর ইন্টেলিজেন্স খুঁজে বের করতে পারছে না, এই অপপ্রচার কোথা থেকে উত্থিত হচ্ছে। এটা নতুন সৈনিকদের অসতর্ক কথাবার্তার প্রতিফল, নাকি দুশমনের এজেন্টরা সুকৌশলে এই প্রোপাগাণ্ডা ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এখন এ-ও লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, মানুষ সেনাবাহিনীতে ভর্তি হতে ইতস্তত করছে। রামাল্লার পরাজয়ের আগে মিসরীদের চিন্তা চেতনা এরূপ ছিলো না। আলী বিন সুফিয়ান ও গিয়াস বিলবীস গোয়েন্দা জাল বিছিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু জনগণ ফৌজের দুর্নাম করে বেড়াচ্ছে এই তথ্য ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি।
