কেন, সুলতান আইউবী কি অন্ধ ছিলেন?- এক ব্যক্তি ক্রুদ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে তিনি কি দেখলেন না, তার সৈন্যরা কী করছে?
খোদা যখন কোনো জাতিকে শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন দেশের ইমাম, আলিম ও শাসকদের বিবেকের উপর পর্দা ফেলে দেন দরবেশ বললো- সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী স্বয়ং জয়ের নেশায় মাতাল হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বোধ হয় আল্লাহর অস্তিত্ব এবং তার শাস্তি-সাজার কথাও ভুলে গিয়েছিলেন। তার দেহরক্ষী ও বিলাসী সালারগণ তাকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছিলো যে, কোনো মজলুমের ফরিয়াদ তাঁর কানে পৌঁছতো না। যে রাজা ফরিয়াদীদের জন্য ইনসাফের দ্বার এবং নিজের কান বন্ধ করে রাখেন, সে রাজা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয়ে যান। আমি দুবছর আগেই ইঙ্গিত পেয়েছিলাম, এই বাহিনী পাপের শাস্তিস্বরূপ ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি রাতে গায়েবী আওয়াজ শুনতাম। কিন্তু যার জন্য আওয়াজ আসতো, তার কান বন্ধ ছিলো।
তারপর খোদা তাদের চোখের উপর পট্টি বেঁধে দেন এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী- যিনি রণাঙ্গনের রাজা ছিলেন এবং যাকে খৃস্টানরা রণাঙ্গনের দেবতা মনে করতো এমনই জ্ঞানান্ধ হয়ে যান যে, তিনি সকল রণকৌশল ভুলে যান। তাঁর কৌশলে যুদ্ধ করে শত্রুরা। তিনি এমন শোচনীয় পরাজয় বরণ করেন যে, একাকি মিসর পালিয়ে আসতে বাধ্য হন।
আমরা খৃস্টানদের থেকে এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবো- এক বেদুঈন তেজস্বী কণ্ঠে বললো- আমরা আমাদের পুত্রদেরকে কুরবান করে দেবো।
জয়-পরাজয় আল্লাহর হাতে- দরবেশ বললো- তিনি যদি কারো কপালে পরাজয় লিপিবদ্ধ করেন, তাহলে জয় ছিনিয়ে আনার ক্ষমতা তার থাকে না। তখন বান্দার সব জোশ ঠান্ডা হয়ে যায়। আমিও এখানে এজন্যই এসেছি যে, মিসরের শিশুটিকেও প্রতিশোধের জন্য প্রস্তুত করবো। কিন্তু শাস্তির মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। তোমরা যদি তোমাদের পুত্রদেরকে এখনই পুনরায় ভর্তি করিয়ে ময়দানে প্রেরণ করো, তাহলে তারা মারা যাবে এবং পরাজয়বরণ করবে। প্রতিটি কাজের একটি উপযুক্ত সময় নির্ধারিত থাকে। খৃস্টানদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের সেই মোক্ষম সময়টি এখনো আসেনি। এখন তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো এবং তার নিকট তোমাদের সেই পুত্রদের গুনাহের ক্ষমা প্রার্থনা করো, যাদেরকে তোমরা সিরিয়া প্রেরণ করেছিলে।
***
পরাজয়ের সব দায় আমার মাথায় রাখো- সুলতান আইউবী বললেন। তিনি সালার, নায়েব সালার, কমান্ডার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন- পরাজয়ের কারণ অত্যন্ত স্পষ্ট। ভুল হয়েছে, আমি নতুন সৈনিকদের ময়দানে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি যদি আরো অপেক্ষা করতাম আর মিসরে বসে থাকতাম, তাহলে দুশমন সমগ্র মিসরে ছড়িয়ে যেতো। আমি ফৌজের যে অভাবটা নতুন সৈনিকদের দ্বারা পূরণ করেছি, তোমরা জানো, তার দায় কার উপর বর্তায়। কিন্তু সেই আলোচনায় জড়িয়ে আমি সময় নষ্ট করতে চাই না। অপরাধ আরোপ যদি করতেই হয়, তাহলে আমার উপর করো। বাহিনী দ্বারা যুদ্ধ আমি করিয়েছি। কৌশলে ভুল থাকলে সেই ভুল আমার। তার কাফফারা আমাকেই আদায় করতে হবে এবং করবো। জয়-পরাজয় যে কোনো যুদ্ধের শেষ ফল। আজ আমরা এমন একটি পরিণতির মুখোমুখি, যার জন্য আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। সে কারণেই আমি তোমাদের চেহারায় মলিনতা এবং চোখে অস্থিরতা দেখতে পাচ্ছি। তোমরা যদি আমাকে পরাজয়ের শাস্তি দিতে চাও, আমি তার জন্যও প্রস্তুত আছি। আমার কানে এ আওয়াজও আসছে যে, আমার ফৌজ সিরিয়া গিয়ে নারীর শ্লীলতাহানি, লুণ্ঠন ও মদপানে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো। আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে, বাগদাদের খলীফার উপর প্রভাব বিস্তার করার লক্ষ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে পরাজয়বরণ করেছি এবং আমি এই পরাজয়কে বিজয়ে পরিণত করে খলীফাকে আমার অনুগত বানাবার চেষ্টা করবো। আমাকে ফেরাউনও আখ্যা দেয়া হচ্ছে। আমি এর একটি অপবাদেরও জবাব দেবো না। এসব অপবাদ-অভিযোগের জবাব আমি মুখে দেবো না- দেবে আমার তরবারী। আমি শব্দ দ্বারা নয়, কাজে প্রমাণ করবো এসব কার পাপ, যার শাস্তি আমি এবং আমার মুজাহিদরা ভোগ করেছে।
ইতিমধ্যে দারোয়ান সংবাদ জানায়, হামাত থেকে দূত এসেছে। সুলতান। আইউবী সঙ্গে সঙ্গে তাকে ভেতরে তলব করেন। সর্বাঙ্গ ধুলায় মাখা ও দীর্ঘ সফর-ক্লান্ত দূত আল-আদিলের একখানা পত্র সুলতানের হাতে তুলে দেন। সুলতান পুত্ৰখানা খুলে পাঠ করেন। তাঁর চোখে অশ্রু নেমে আসে। পত্রখানা এক সালারের হাতে দিয়ে সুলতান বললেন- পড়ে সবাইকে শোনাও।
সালার বার্তাটি পড়তে শুরু করেন। পড়তে পড়তে যতোই অগ্রসর হচ্ছেন, শ্রোতাদের চোখে আনন্দের দ্যোতি ততোই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অজান্তে তাদের মুখ থেকে অস্ফুট জিন্দাবাদ ধ্বনি উচ্চারিত হতে শোনা যাচ্ছে।
এ হলো গুনাহগারদের কীর্তি- সুলতান আইউবী বললেন- তোমরা যারা কায়রোতে ছিলে, জানো না আল-আদিলের নিকট কতোজন সৈন্য আছে। জানতে না বল্ডউইনের কাছে আমাদের দশগুণ বেশি সৈন্য ছিলো। তার আরোহীরা বর্মপরিহিত। সব পদাতিকের মাথায় শিরস্ত্রাণ। আল আদিল কি প্রমাণ করেনি, আমরা পরাজয়কে বিজয়ে পরিণত করতে জানি? তোমরা কি ভাবতে পারো, আমি মাথায় হাত রেখে বসে পড়বো? তোমরা পরবর্তী যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করো। আমাকে নতুন সেনাভর্তি দাও। বায়তুল মুকাদ্দাস তোমাদের ডাকছে। দুশমনের সঙ্গে আমি কোনো প্রকার চুক্তি-সমঝোতা করবো না।
