***
এদিক-ওদিক লক্ষ্য রাখো- লোকটি সকলকে বললো- যেখানেই পথভোলা কাউকে মিসরের দিকে যেতে দেখবে, এখানে নিয়ে আসবে। রাতে এখানে কেউ ক্ষুধার্ত-পিপাসার্ত থাকবে না।
মিসর যাওয়ার এই একটিই পথ। অন্য সব জায়গা টিলায় পরিপূর্ণ। এটিই প্রশস্ত জায়গা। তবে এর মধ্যদিয়ে যাওয়াও অনর্থক। বাইরে থেকেই বুঝা যায়, এখানে পানির নাম-চিহ্ন নেই। সবাই মৃত্যু দেখতে পাচ্ছে। মিসরের সীমান্ত এখনো অনেক দূর। এই লোকগুলোর আশ্রয় প্রয়োজন। কালো দাড়িওয়ালা দরবেশই এখন তাদের ভরসা। লোকটির প্রতিটি কথা তাদের হৃদয়ে বসে গেছে। কিন্তু পিপাসার আতিশয্যে দু-তিনজন সৈনিক চৈতন্য হারাবার উপক্রম হয়। দরবেশ তাদেরকে সান্ত্বনা প্রদান করছে।
সূর্য ডুবে গেছে। আঁধারে ছেয়ে গেছে রাত। নীরব-নিস্তব্ধ সাহারা। হঠাৎ টিলার মধ্য থেকে একটি পাখির ডাক ভেসে আছে। সবাই চমকে ওঠে। যে জাহান্নামে পানির কল্পনাও করা যায় না, মৃত্যু যেখানে মাথার উপর ঝুলে থাকছে সারাক্ষণ, সেই অঞ্চলে পাখির ডাক! না, এটি পাখির ডাক নয়, হতে পারে না। সকলের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। এটি কোনো প্রেতাত্মার শব্দ হবে।
শোকর আল্লাহ!- দরবেশ বললো- আমার দুআ কবুল হয়ে গেছে। লোকটি তার সম্মুখে উপবিষ্ট দুজন সৈনিককে বললো তোমরা দুজনে ওদিকে যাও। চল্লিশ পা গণনা করো। সেখান থেকে ডান দিকে মোড় নাও। চল্লিশকদম গণনা করো। সেখান থেকে বা দিকে মোড় নাও। সম্মুখে এক স্থানে আগুন জ্বলছে দেখবে। সেই আগুনের আলোতে তোমরা পানি দেখতে পাবে। হয়তো কিছু খাবারও পেয়ে যাবে। যা পাবে তুলে নিয়ে আসবে। এই যে ডাকটা শুনেছো, ওটা পাখির ডান নয়- গায়েবের ইশারা।
আমি যাবো না- এক সৈনিক ভয়জড়িত কণ্ঠে বললো- তার গা ছমছম করছে- আমি জিন-পরীর জায়গায় যাবো না।
যে দুজন লোক পরে ঘোড়ায় চড়ে এসেছিলো, তারা দাঁড়িয়ে যায়। দরবেশকে একটা সেজদা দিয়ে সৈনিকের উদ্দেশে বললো- ভয় করো না। জিন-পরীরা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। তাদের প্রতি নির্দেশ আছে, এই বুযর্গ যেখানে যাবেন, তাকে খাদ্য-পানীয় পৌঁছাতে থাকবে। আমরা হযরতের কারামত সম্পর্কে অবগত। দু-তিনজন লোক আমাদের সঙ্গে চলো।
এবার সৈনিকরা যেতে সম্মত হয়। তারা রওনা হয়ে পড়ে। দরবেশের কথামতো পা গননা করে। মোড় ঘুরে। তারপর দুটি টিলার মধ্যখান দিয়ে অতিক্রম করতে গিয়ে একস্থানে আগুন দেখতে পায়। সকলে কালেমা ঝপতে ঝপতে এগিয়ে যায়। আগুনের আলোতে পানিভর্তি চার-পাঁচটি মশক পড়ে আছে দেখতে পায়। আছে একটি কাপড়ের পুটুলিও। থলেটি খেজুরে ভর্তি। তারা মশক ও থলেটি তুলে নেয়। ফিরে গিয়ে বস্তুগুলো দরবেশের সম্মুখে রেখে দেয়। দরবেশ খেজুরগুলো অল্প অল্প করে সকলের মাঝে বন্টন করে দেয়। পরে দুটি মশক তাদের হাতে তুলে দিয়ে বললো, প্রয়োজনের বেশি পান করো না। পানি বাঁচানোর চেষ্টা করো। এবার কারো সন্দেহ রইলো না, লোকটি একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও বড় মাপের একজন বুযুর্গ। সে সকলকে তায়াম্মুম করিয়ে জামাতের সঙ্গে নামায আদায় করে।
সবাই ঘুমিয়ে পড়ে।
রাত পোহাতে এখনো অনেক দেরি। লোকটি সকলকে জাগিয়ে তোলে এবং কাফেলা মিসরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। দরবেশ একটি উটের পিঠে এবং তার মেয়ে দুটো আরেকটি উটের পিঠে চড়ে বসে। পথে তাদের তিন-চারজন সৈনিকের সঙ্গে সাক্ষৎ হয়। তারাও মিসর যাচ্ছে। দরবেশ তাদেরও খেজুর খাওয়ায় ও পানি পান করায়। তারপর তাদেরকে দুজন উষ্ট্রারোহীর পেছনে বসিয়ে নেয়।
এই কাফেলার ডান দিক দিয়ে আরো একটি কাফেলা যাচ্ছিলো। একজন বললো, ওদেরকেও নিয়ে নিন। দরবেশ বললো, তারা আমাদের ন্যায় পালিয়ে এসেছে বলে মনে হয় না। তাদের সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই।
***
অনেকদিন পর সৈনিকদের এই কাফেলা দরবেশরূপী কালো দাড়িওয়ালা লোকটির সঙ্গে মিসরের সীমানায় প্রবেশ করে। যে দুব্যক্তি পরে এসে দরবেশকে সেজদা করেছিলো, তারা পথে সৈনিকদেরকে দরবেশের কারামতের কাহিনী শোনাতে থাকে। তারা সৈনিকদের ধারণা প্রদান করে, যে ব্যক্তি লোকটিকে নিজ গ্রামে আশ্রয় দেবে, তার জীবিকার কোনো অভাভ থাকবে না এবং খোদা সব সময় তার উপর দয়াপরবশ থাকবেন। একই গ্রামের তিন সৈনিক তাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। তারা দরবেশকে বললো, আপনি আমাদের গ্রামে চলুন। লোকটি তাদেরকে দু চারটি প্রশ্ন করে তাদের প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করে।
কায়রোর অদূরে বড় একটি গ্রাম। কাফেলা উক্ত গ্রামটিতে প্রবেশ করে। সৈনিকদের দেখে গ্রামের অধিবাসীরা তাদের চার পার্শ্বে ভিড় জমায়। তাদের পশুগুলোকে খেতে দেয় এবং তাদের জন্যও খাবারের ব্যবস্থা করে।
জনতা যুদ্ধের কাহিনী শুনতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। তারা কালো দাড়িওয়ালা ব্যক্তিটি সম্পর্কে বললো, ইনি আল্লাহর নৈকট্যশীল বুযুর্গ মানুষ। আল্লাহ জিনের মাধ্যমে এর নিকট খাবার পৌঁছিয়ে থাকেন। সৈনিকরা জনতাকে লোকটির সংক্ষিপ্ত বৃত্তান্ত শোনায়। দরবেশ কারো সঙ্গে কথা বলছে না। দুচোখ বন্ধ করে ধ্যানে বসে আছে। তার মেয়ে দুটোকে এই গ্রামেরই অধিবাসী এক সৈনিক নিজ ঘরে নিয়ে যায়।
রণাঙ্গনের ভেদ আমাকে জিজ্ঞাসা করো- দরবেশ বললো- এরা সৈনিক। এরা কেবল লড়াই করতে জানে। সৈনিকদের জানা থাকে না, যুদ্ধের নেপথ্য নায়কদের উদ্দেশ্য কী। এই যে কজন সৈনিককে আমি সাহারার আগুন থেকে রক্ষা করে নিয়ে এসেছি, এরা সেই ফৌজের শাস্তি ভোগ করছিলো, যারা এদের অনেক আগে সিরিয়া গিয়েছিলো। সেই ফৌজ প্রতিটি রণাঙ্গনে বিজয় অর্জন করেছিলো। সেখানকার উপত্যকা-মরুভূমি সুলতান আইউবী জিন্দাবাদ ধ্বনিতে মুখরিত ছিলো। এই বাহিনী সর্বত্র হীরে-জহরত ও নারী দেখতে পায়। ওখানকার নারীরা মিসরের নারীদের চেয়েও বেশি রূপসী। গনীমতের নেশা বাহিনীটির মধ্যে ফেরাউনী চরিত্র সৃষ্টি করে দেয়। তাদের মন-মস্তিষ্কে গনীমত ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইলো না। তারপর ফৌজের সালার, কমান্ডার ও সৈনিকরা জাতির ইজ্জত এবং মর্যাদাবোধকেও বিদায় জানায়। তারা মুসলমানদের ঘরে ঘরে লুট তরাজ শুরু করে দেয়। সুন্দরী মেয়েদের শ্লীলতাহানী ও অপহরণ করতে শুরু করে। এই নারীগুলো সবাই ছিলো সম্ভ্রান্ত ও পর্দানশীল মুসলিম মহিলা। তাদেরকে তারা নিজ তাঁবুতে আটকে রাখে।
