আমরা তো আমাদের ফৌজের সঙ্গে কোনো নারী দেখিনি! এক সৈনিক বললো।
তারা যখন দামে গিয়েছিলো, তুমি কি তখন থেকেই ফৌজের সঙ্গে আছো? লোকটি জিজ্ঞাসা করে।
আমরা সবাই এই প্রথমবার এসেছি- সৈনিক জবাব দেয়। আমরা নতুন সৈনিক।
আমি পুরাতন সৈনিকদের কথা বলছি- লোকটি বললো- সে ফৌজের কমান্ডার ও সৈনিকরা উপযুক্ত শাস্তি পেয়ে গেছে। তোমরা নতুন। এখনো পাপ করোনি। সে কারণেই তোমরা জীবিত ও নিরাপদে ফিরে এসেছে। যারা মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদের ঘর লুট করেছিলো এবং মুসলিম নারীদের প্রতি হাত বাড়িয়েছিলো, তারা মারা গেছে। যারা বেশি গুনাহগার ছিলো, তাদের কারো পা কাটা গেছে, কারো বাহু। জীবিত পড়ে থাকা অবস্থায় শকুনেরা তাদের চোখ খুলে খেয়েছে। যারা তাদের চেয়েও বড় পাপী ছিলো, তারা খৃস্টানদের হাতে বন্দি হয়ে গেছে। যে বন্দিত্ব তাদের জন্য জাহান্নামের চেয়ে কম হবে না। তাদের জন্য রয়েছে অনন্ত নির্যাতন। তারা ক্ষুৎপিপাসায় ছট ফট করতে থাকবে; কিন্তু মরবে না। মৃত্যুর জন্য দুআ করবে; কিন্তু কবুল হবে না।
এই কি আমাদের পরাজয়ের কারণ? এক সৈনিক বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে।
আমি দুবছর আগেই ইঙ্গিত পেয়েছিলাম, এই বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাবে- লোকটি বললো- আর এই ফৌজ কাফেরদেরকে ইসলামের অবমাননা করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে। এখন এই বাহিনী আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হলো।
আপনি কোথায় যাবেন?- একজন জিজ্ঞাসা করে।
আমি তোমাদের ন্যায় আল্লাহর গজব থেকে- যা খৃষ্টান বাহিনীর আকারে নাযিল হয়েছিলো- পালিয়ে এসেছি- লোকটি উত্তর দেয়- খৃস্টান, বাহিনী ঝড়ের ন্যায় এসেছিলো। তোমাদের ফৌজ তাকে প্রতিহত করতে পারেনি। আমি যদি একা হতাম, তাহলে মুরশিদের মাজারে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করে দিতাম। কিন্তু আমার এই যুবতী মেয়েগুলোর ইজ্জত তো আমি কুরবান করতে পারি না। খৃস্টানরা দুটি বস্তু নাগালে পেলে ছাড়ে না। অর্থ আর নারী। আমার প্রতি মাজার থেকে নির্দেশ আসে, মেয়েদের নিয়ে তুমি মিসর চলে যাও। জিজ্ঞাসা করলাম, জীবন নিয়ে নিরাপদে যাবো কীভাবে? উত্তর আসে, তুমি আমার যে খেদমত করেছে, তার বিনিময়ে তোমরা নিরাপদেই কায়রো পৌঁছে যাবে। কিন্তু ওখানে গিয়ে নীরবে বসে থাকলে চলবে না। প্রতিজন মানুষকে বলতে হবে, পাপ করবে তো, এমন শাস্তি ভোগ করবে, যেমনটি ভোগ করছে তোমাদের ফৌজ। মাজার থেকে আমাকে আরো অনেক কিছু বলা হয়েছে, যা আমি মিসর পৌঁছে বলবো। তোমরা পরস্পরকে তাকাও। তোমাদের চেহারা লাশের ন্যায় সাদা হয়ে গেছে। তোমাদের দেহে যেনো প্রাণ নেই। আর আমার দিকে তাকাও। আমি আমার কন্যাদের নিয়ে পায়ে হেঁটে এসেছি। সঙ্গে কোন খাদ্য-পানীয় ছিলো না। তারপরও আমরা কিরূপ তরতাজা! এটা মহান আল্লাহরই অনুগ্রহ।
আপনি কি আমাদেরকে মিসর পর্যন্ত আপনার ন্যায় নিয়ে যেতে পারেন? এক সৈনিক জিজ্ঞাসা করে।
পারি, যদি তোমরা ওয়াদা করো; অন্তর থেকে পাপের কল্পনা ঝেড়ে ফেলবে- লোকটি উত্তর দেয়। আর এই প্রতিশ্রুতি দাও যে, আমি যে মিশন নিয়ে মিসর যাচ্ছি, তাতে তোমরা আমার সঙ্গ দেবে।
আমরা সত্যমনে ওয়াদা করছি- অনেকগুলো কণ্ঠ ভেসে ওঠে। আপনি বলুন, আমাদের কী করতে হবে। জীবন থাকা পর্যন্ত আমরা আপনার সঙ্গ দেবো।
আমি শুধু নিজের জীবন আর মেয়ে দুটোর ইজ্জত রক্ষা করার জন্য রামাল্লা থেকে পালিয়ে আসিনি- লোকটি বললো- মাজার আমাকে নির্দেশ দিয়েছে, আমি মিসর গিয়ে বলবো, তোমরা ফেরাউনদের দেশের মানুষ। এই মাটিতে পাপের ক্রিয়া আছে। হযরত ইউসুফ (আ.) মিসরে নীলাম হয়েছিলেন। মূসা (আ.)-এর সঙ্গে বেআদবী মিসরে হয়েছিলো। ফেরাউনদের হাতে অনেক নবীর গোত্র এই মিসরে খুন হয়েছিলো। হে মিসরবাসী! তোমাদের ধ্বংস ও শাস্তি শুরু হয়ে গেছে। তোমরা আল্লাহর রশিকে শক্তভাবে আকড়ে ধরো। এই বার্তা আমি মিশরবাসীর জন্য বয়ে নিয়ে যাচ্ছি। তোমরা যদি এই বার্তা সারা দেশে প্রচারের কাজে আমাকে : সাহায্য করো, তাহলে তোমাদের দুনিয়াও জান্নাতে পরিণত হবে এবং আখেরাতেও তোমাদের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে যাবে।
***
সূর্য অস্ত যেতে এখনো অনেক বাকি। রামাল্লার দিক থেকে আসা দু তিনজন সৈনিক নিকট দিয়ে অতিক্রম করছে। দরবেশ বললো, ওদের থামাও। ওরা রাত পর্যন্ত জীবিত থাকবে না।
তাদের থামানো হলো। তারা পানি প্রার্থনা করছে। মুখ দিয়ে কথা সরছে না। দরবেশ বললো, পানি রাতে পাবে। সে পর্যন্ত সেই আল্লাহকে স্মরণ করো, যিনি তোমাদের রামাল্লা থেকে জীবিত উদ্ধার করে এনেছেন এবং নতুন জীবন দান করেছেন।
কিছুক্ষণ পর আরো দুব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে এদিক দিয়ে অতিক্রম করে। তারা সৈনিক নয়। তারা প্রথমে কাফেলার প্রতি তাকায়। তারপর কালো চোগা পরিহিত কালো দাড়িওয়ালা লোকটির প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করে। তারা ঘোড়া থামিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে ঘোড়াগুলো ওখানেই রেখে ছুটে আসে। উভয়ে তার সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। তারপর তার হাতে চুমো খেয়ে বললো- মুরশিদ! আপনি এখানে? তারা কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই কাফেলার সৈনিকদের উদ্দেশে বললো, আপনাদের খোশনসিব যে, আপনারা এই বুযুর্গের সাক্ষাৎ লাভ করেছেন। ইনি এক বছর আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, মিসরের গোনাহগার ফৌজ যদি মাজার এলাকায় আসে, তাহলে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে।
