আমি ধড় মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে যাই। বাগদাদের খতীবের কয়েক বছর আগের কথা মনে পড়ে যায়, তুমি আপনা-আপনি জেগে উঠবে এবং কোনো ইচ্ছা-পরিকল্পনা ছাড়াই হাঁটতে শুরু করবে। তা-ই হয়েছে। আমার মনে কোনো ইচ্ছা, কোনো পরিকল্পনা ছিলো না। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। লোকালয়ও ত্যাগ করে চলে আসি। কোথাও কোথাও মনে হতো, কে যেনো আমার সামনে সামনে হাঁটছে। জানি না, এটা নিছক কল্পনা ছিলো, না বাস্তব।
আমি হাঁটতে থাকি। জানি না তোমরা সেই জায়গাটি দেখেছো কিনা, যেখানে বেশ গভীরতা আছে এবং সেই গভীরতায় নদী প্রবাহিত হচ্ছে। খৃস্টানদের ফৌজ সেখানেই লুকিয়ে ছিলো। আমি শুনেছি, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী নাকি মাটির শেষ স্তরে লুকিয়ে থাকা দুশমনকেও দেখতে পান। কিন্তু ওখানে আল্লাহ তাঁর চোখের উপর এমন আবরণ ফেলে দিয়েছিলেন যে, তিনি এটুকুও জানতে পারলে না, তিনি নিজে কোথায় আছেন। খৃস্টান বাহিনী তোমাদের বাহিনীকে ফাঁদে নিয়ে গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে আক্রমণ চালায়। পরে তোমাদের কী পরিণতি ঘটেছিলো, তা তো তোমাদের জানা আছে।
সেই যুদ্ধের বছর কয়েক আগে এক রাতে আমি আপনা-আপনি কিংবা কোন অদৃশ্য শক্তির জোরে সেই গর্তে পৌঁছে গিয়েছিলাম এবং এক স্থানে আমার পা আটকে গিয়েছিলো। জোছনা রাত ছিলো। আমি একটি কবর দেখতে পেলাম, যার চার পার্শ্বে দুহাত উঁচু পাথরের দেয়াল। আমি পরীক্ষার জন্য অন্য একদিকে পা বাড়াতে চেষ্টা করি। কিন্তু আমি আপনা আপনি কবরের দিকে ঘুরে গেলাম এবং পাথরের দেয়ালের অভ্যন্তরে যাওয়ার যে পথ ছিলো, তাতে ঢুকে পড়ি। ফাতেহা পাঠের জন্য আমার দুহাত আপনা-আপনি উপরে উঠে যায়। মনে হলো, জায়গাটার জোছনা বেশি ফকফকা। মনে জাগলো, খতীব আমাকে এ স্থানটির কথা-ই বলেছিলেন। আমি কবরের উপর হাত রেখে বললাম, আমি গোলামটার জন্য নির্দেশ কী? কোন উত্তর আসলো না। মনে প্রতীতি জন্মালো, কয়েকটা রাত সেখানেই কাটিয়ে দেই। সকালে নদীতে গিয়ে অজু করে এসে নামায আদায় করি। তারপর যখন সেখান থেকে বিদায় নিলাম, তখন আমার মধ্যে এক রকম মাদকতা বিরাজ করছিলো, যেনো আমি ধনভান্ডার পেয়ে গেছি।
তারপর উক্ত কবর থেকে আমার প্রতি এমনভাবে দিক-নির্দেশনা আসতে শুরু করে যে, আমি কোনো শব্দ শুনতাম না। অন্তরে যা কিছু জাগ্রত হতো, তা-ই আমার দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হতো। আমি কবরটির দেয়াল আরো উঁচু করে উপরে গম্বুজ নির্মাণ করে দেই। আমি অনেক দূর দূরান্ত পর্যন্ত গিয়েছি। হাল্ব-মসুল ছাড়াও বাইতুল মোকাদ্দাসও গিয়েছি। কিছুদিন যাবত উক্ত মাজার থেকে যে সব নির্দেশনা পাচ্ছিলাম, সেগুলো সুখকর ছিলো না। এটি যে বুযর্গের মাজার, তার আত্মা ছটফট করছে বলে মনে হচ্ছিলো। আমি কবরের উপর সবুজ চাদর বিছিয়ে দিয়েছিলাম। এক রাতে হঠাৎ চাদরটি ফড় ফড় শব্দ করে ওঠে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। চাদরের উপর হাত বুলিয়ে বললাম- আদেশ করুন মুরশিদ!
মাজারের ভেতর থেকে আওয়াজ আসে- তুমি কি দেখছো না মুসলমান মদপান করছে? তুমি মুসলমানদেরকে মদের অপকারিতা সম্পর্কে সতর্ক করো।
আমি তাঁর নির্দেশ পালন করলাম। কিন্তু মদ পানকারীরা ছিলো আমীর ও শাসক গোষ্ঠী। আমার আওয়াজ তাদের কানে পৌঁছেনি।
তারপর আরেক রাত মাজারের চাদর ফড়ফড় করে ওঠে আমাকে বললো, মিসর থেকে আসা ফৌজ মুসলিম বসতিগুলোতে মুসলমানদের সঙ্গে সেই আচরণই করছে, যেমনটি খৃস্টানরা করে থাকে। সে সময় সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজ দামেশকেও ছিলো। তাছাড়া দামেশক থেকে হাব পর্যন্ত এবং সেখান থেকে রামাল্লা পর্যন্ত স্থানে স্থানে তারা অবস্থান করছিলো। সেই ফৌজের কমান্ডাররা মুসলমানদের ঘরে মূল্যবান যতো সম্পদ পেয়েছে, লুট করে নিয়ে গেছে। তারা পর্দানশীন মুসলিম নারীদের প্রতি হস্ত প্রসারিত করেছে। কমান্ডারদের দেখাদেখিতে সৈনিকরাও লুটপাট ও নারীর সম্ভ্রমহানী শুরু করে দিয়েছিলো। এই রিপোর্টও আছে যে, তোমাদের সালার ও কমান্ডারগণ মুসলিম মেয়েদের অপহরণ করে নিজেদের তাবুতে নিয়ে রেখেছিলো। মাজার থেকে আদেশ আসে, তুমি সুলতান আইউবীর নিকট গিয়ে তাঁকে বলো, এই ফৌজ বাগদাদের খেলাফতের- মিসরের ফেরাউনদের নয়। কিন্তু যদি তারা এসব অপরাধ অব্যাহত রাখে, তাহলে তাদের পরিণতি ফেরাউনদের মতোই হবে।
সে সময়ে সুলতান আইউবী হাবের সন্নিকটে এক স্থানে ছাউনি ফেলে অবস্থান করছিলেন। আমি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলাম, তাঁর দেহরক্ষীরা আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি সুলতানের সঙ্গে কেননা সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছো? বললাম, আমি রামাল্লা থেকে এসেছি। এবং একটি বার্তা নিয়ে এসেছি। তারা জিজ্ঞাসা করলো, কার বার্তা? আমি বললাম, এই পয়গাম যার, তিনি জীবিত মানুষ নন। রক্ষীরা খিল খিল করে হেসে ওঠে। তাদের কমান্ডার উচ্চকণ্ঠে বললো, পাগল কোথাকার! সুলতান আইউবীর জন্য কবরের বার্তা নিয়ে এসেছে, না? একজন বললো, লোকটি শেখ সান্নারের প্রেরিত ঘাতক। সুলতানকে হত্যা করতে এসেছে। একে আটক করো। কেউ বললো, খৃস্টানদের চর, মেরে ফেলো। অগত্যা গ্রেফতার এড়াবার জন্য আমি প্রকাশ করলাম, আমি পাগল। আমি সেখান থেকে পালিয়ে আসি। আমি স্বচক্ষে দেখেছি, সুলতান আইউবীর রক্ষীদের এক কক্ষে দুটি মেয়ে বসে আছে।
