আমি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। সঙ্গে কিছুই ছিলো না। পায়ে হেঁটে রওনা হই। পিতা-মাতা নিতান্ত গরীব ছিলেন। সঙ্গে পানি রাখার জন্য একটি মশকও ছিলো না। ইলমের পিপাসা এই সহায় সম্বলহীন অবস্থায় আমাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। রওনার সময় সকলে মন্তব্য করলো, ছেলেটা পথেই মরে যাবে। বাবা-মা খুব কান্নাকাটি করলেন। কিন্তু আমি তারপরও বেরিয়ে পড়লাম। সন্ধ্যার পর এই আশায় কোথাও পড়ে থাকতাম যে, এখানেই মরে বাঁচবো। কিন্তু চোখ খুলে দেখতাম, পার্শ্বে পানির একটি পাত্র ও কিছু খাবার পড়ে আছে। প্রথমবার খুব ভয় পেয়েছিলাম। প্রথমে বিষয়টা জিন-পরীদের কারসাজি মনে করেছিলাম। কিন্তু রাতে স্বপ্নে ইঙ্গিত পেলাম, এটা কোনো এক মুরশিদের কারামত। আমি জানতে পারলাম না, এই মুরশিদ কে এবং কোথায় আছেন। আমি পানাহার করে গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে জাগ্রত হয়ে দেখি, পানির পেয়ালাও নেই, খাবারের পাত্রও নেই।
বাগদাদ পৌঁছতে পৌঁছতে দুটি নতুন চাঁদ উদিত হয়েছে। সফর অনেক দীর্ঘ ছিলো। প্রতিরাতেই আমি প্রথম দিনের ন্যায় খাদ্য-পানীয় পেতে থাকি। আমি বাগদাদের জামে মসজিদে গিয়ে পৌঁছি। খতীব আমার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা না করেই বললেন, আমি তোমার পথের দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি আমাকে তার হুজরায় নিয়ে গেলেন। আমি বিস্মিত হলাম, যে দুটি পাত্র করে প্রতিরাতে আমার নিকট খাদ্য-পানীয় পৌঁছতো, সেগুলো হজরতের হুজরায় পড়ে আছে। তিনি বললেন, আল্লাহ হযরত মূসাকে (আ.) সাহায্য করতে চাইলেন। তিনি নীলনদকে নির্দেশ দিলেন, পথ দিয়ে দাও। নদীর ডানের পানি ডানে, বাঁয়ের পানি বাঁয়ে সরে গেলো। মধ্যখানটা শুকিয়ে রাস্তা হয়ে গেলো। মূসা (আ.) বেরিয়ে গেলেন। ফেরাউন তাঁকে ধাওয়া করতে গিয়ে যখন নদীর রাস্তায় নেমে পড়লো, অমনি দুদিকের পানি একত্রিত হয়ে তাকে ডুবিয়ে মারলো। ফেরাউন আল্লাহর গজবে নিপতিত হলো।
খতীব বললেন, আমরা সেই সত্ত্বার অনুগত, তিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর যে বান্দা তার ইলমের প্রেমে পাগল হয়, যেমনটি তুমি হয়েছে; তাকে তিনি মরুভূমিতে পিপাসায় মরতে দেন না; নদী-সমুদ্রেও ডুবিয়ে মারেন না। সেই মহান সত্ত্বাই তোমাকে কয়েক মাসের কঠিন পথ পার করিয়ে নিরাপদে এখানে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তিনি আমাকে আদেশ করেছেন, তোমার বক্ষে যে ইলম আছে, সব ঐ বালকটির বক্ষে স্থানান্তরিত করো এবং তোমার খেদমতের জন্য যে দুটি জিন নিয়োজিত রেখেছি, তাদেরকে বললো, পথে পথে ছেলেটাকে খাদ্য ও পানীয় পৌঁছিয়ে দিক। আমি মহান আল্লাহর আদেশ পালন করেছি। প্রতিরাতে তোমার জন্য এখান থেকে খাবার যেতো। তুমি বিস্মিত হয়ো না বেটা!, অস্থিরও হওয়ারও কোনো প্রয়োজন নেই। অনেক কম লোকেরই হৃদয়ে ইলমের বাতি প্রজ্বলিত হয়ে থাকে, যার আকাঙ্খা তুমি নিয়ে এসেছে। তোমার নিয়ত ভালো। অন্তরে আল্লাহর খোশনুদির তামান্না আছে। এই তামান্না যার থাকে, সমগ্র মানুষ ও জিন তার গোলাম হয়ে যায়।
জিনরা কি আপনার গোলাম? এক সৈনিক জিজ্ঞেস করে।
তা নয়- দরবেশ জবাব দেয়- কেউ কাউকে গোলাম বানাতে পারে না। আমরা সকলে এক আল্লাহর বান্দা। উঁচু-নীচু, ধনী-দরিদ্য বিবেচিত হয় না। ঈমানের পরিপক্কতা আর দুবর্লতা দ্বারা মানুষের মর্যাদা পরিমাণ করা হয়।
লোকটির বক্তব্যে এমন এক যাদু, যা সকলকে মুগ্ধ করে তোলে। সকলে তন্ময় হয়ে তার বক্তব্য শুনছে। সে বললো- বাগদাদের খতীব আমার হৃদয়কে ইলম দ্বারা আলোকিত করে দিয়েছেন। তিনি আমাকে বিবাহও করিয়েছেন। সেখানেই আমার এই দুটি কন্যা জন্ম লাভ করে। বহু সাধনার পর আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে দু-তিনটি ভেদ লাভ করি। এক রাতে খতীব আমাকে বললেন, এবার যাও। গিয়ে সেই লোকগুলোর সেবা করো, যারা ইলমকে সঙ্গে নিয়ে চিরদিনের জন্য কবরে ঘুমিয়ে আছে। তিনি আমাকে রামাল্লায় নিজ বাড়িতে ফিরে আসার নির্দেশ দিলেন। আমাকে দুটি উট দিলেন। পাথেয় দিলেন এবং বললেন, অন্তরে কখনো পাপের কল্পনা জাগ্রত হতে দেবে না। রামাল্লা পৌঁছার পর এক রাতে তুমি অনিচ্ছায় শয্যা থেকে উঠে হাঁটা দেবে। সম্ভবত তোমাকে বেশি দূর যেতে হবে না। তোমার পা আপনা-আপনি থেমে যাবে। সেটি একটি পবিত্র স্থান হবে। সেটিকে তুমি আস্তানা বানিয়ে নেবে। তবে আমি একটি সময়- যা এখনো ভবিষ্যতের অন্ধকারে লুকিয়ে আছে দেখতে পাচ্ছি। সেই সময়টায় পাপ হবে এবং তোমাকে অন্যের পাপের শাস্তি ভোগ করতে হবে। বোধ করি, তোমাকে হিজরতই করতে হবে।
আমি যখন স্ত্রী ও কন্যাদের নিয়ে সফরে ছিলাম, তখন সূর্যের প্রখরতা আমার জন্য শীতল হয়ে গিয়েছিলো। যে মরুভূমিতে পানির নাম-চিহ্ন থাকার কথা নয়, আমি সেখানেও অনায়াসে পানি পেয়ে যেতাম। রামাল্লা পৌঁছে দেখি, আমার পিতা-মাতা দুজনই মারা গেছেন। আমার স্ত্রী বিরান ঘরটিকে ঝেড়ে-মুছে বাসযোগ্য করে তোলে। আমি বিদ্যার সাগরে ডুবে থাকি। ধীরে ধীরে মেয়েগুলো বেড়ে ওঠে। আল্লাহ তাদের মাকে নিজের কাছে ডেকে নিয়ে যান। মেয়েরা আমার ঘর-গেরস্থলির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। এক রাতে আমি গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ এমনভাবে আমার চোখ খুলে যায়, যেনো কেউ আমাকে ডেকে তুলেছে।
