এমনই একটি ক্ষুদ্র দল পথ চলছে। তারা উট ও ঘোড়ার আরোহী। পথে পথে তাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া নিঃসঙ্গ সঙ্গীরা তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। এক পর্যায়ে দলটি ত্রিশ-চল্লিশজনের বড়সড় একটি কাফেলায় পরিণত হয়ে যায়। তারা সেই ভয়ানক মরুদ্যান দিয়ে পথ চলছে, যাকে বর্তমানে সিনাই মরুভূমি বলা হয়। দলবদ্ধতার কারণে তাদের মনোবল অটুট। কিন্তু দিগন্ত পর্যন্ত পানির চিহ্ন চোখে পড়ছে না। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত রণাঙ্গন ত্যাগ করে আসা এক একজন, দুদুজন এবং তিন তিনজন সৈনিক পা টেনে টেনে হাঁটছে। তারা একে অন্যের কোনোই সাহায্য করতে পারছে না। শুধু এতোটুকু পারছে, কেউ মৃত্যুবরণ করলে তার কোনো একজন সঙ্গী তাকে। বালিতে পুতে রাখছে।– আরোহীদের এই কাফেলাটি এগিয়ে চলছে। এখন সম্মুখে আছে দেয়াল, খুটি এবং গৃহের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা, মাটির উঁচু-নীচু টিলা। এক সৈনিক একটি টিলার উপর একজন মানুষের মাথা ও কাঁধ দেখতে পায়। কিন্তু পরক্ষণেই লোকটি অদৃশ্য হয়ে যায়। সৈনিক তার সঙ্গীদের বললো, ও পর্যন্ত গিয়ে নেমে যাবো। ওখানে অন্য কিছু আছে। ক্ষুৎপিপাসা ও ক্লান্তিতে কাফেলার অধিকাংশ সদস্যেরই দিশেহারা অবস্থা। এতোক্ষণ তারা যুদ্ধের আলোচনা করে চলছিলো। কিন্তু এখন আর কারো মুখ থেকে কথা সরছে না। তাদের পশুগুলোর মধ্যে এখনো প্রাণ আছে। তারা ভালোভাবেই হাঁটছে।
এক মাইল দূরের টিলা শত ক্রোশের দূরত্বে পরিণত হয়ে যায়। কাফেলা সেখানে পৌঁছে যায় এবং দুটি টিলার মধ্য দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। সকলে বাহনের পিঠ থেকে অবতরণ করে। পশুগুলোকে ছায়ায় ছেড়ে দিয়ে নিজেরা একটি উঁচু টিলার নীচে বসে পড়ে।
লোকগুলো বসে সবেমাত্র স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। হঠাৎ একটি টিলার আড়াল থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে তাদের সম্মুখে এসে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে যায়। লোকটি মাথা থেকে পা পর্যন্ত সাদা পোশাকে আবৃত। পোশাকটি কাঁধ থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত লম্বিত চৌগা। মুখে কালো দাড়ি। নিপুণভাবে ছাটা খাটো দাড়ি। হাতে একটি লাঠি, যে লাঠি সাধারণত আলিম, বুযুর্গ-দরবেশ ও খতীবদের হাতে থাকে। লোকটি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কাফেলার লোকজনও একদম নীরব। খানিক পর একজন ক্ষীণ কণ্ঠে মন্তব্য করে- হযরত খিজির বোধ হয়।
ইনি এই পৃথিবীর মানুষ নন- আরেকজন ফিস্ ফিস করে বললো।
কাফেলার লোকদের মনে ভয় ধরে যায়। তারা এমনিতেই সন্ত্রস্ত। এই রহস্যময় লোকটি তাদের ভীতি বাড়িয়ে তুলেছে। আপনি কে? জিজ্ঞাসা করার সাহস কারো নেই। এই নিষ্ঠুর মরু অঞ্চলে এ প্রকৃতির কোনো মানুষের উপস্থিতি বিস্ময়করই বটে। সৈনিক হলে ভয়ের কিছু ছিলো না।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ একটি মেয়ে তার এক পার্শ্বে এমনভাবে দাঁড়িয়ে যায়, যেনো মেয়েটি তার দেহের ভেতর থেকে আত্মপ্রকাশ করেছে। পরক্ষণে আরো একটি মেয়ে একইভাবে তার অপর পার্শ্বে আত্মপ্রকাশ করে। নিতান্ত বিস্ময়কর ও অলৌকিক ব্যাপারই বটে। কাফেলার ভীতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। মেয়ে দুটো আপাদমস্তক পোশাকাবৃত। চোখের উপর জালের ন্যায় পাতলা কাপড়। হাতগুলোও বোরকাসম চাদরে ঢাকা।
তোমাদের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক- দরবেশ মুখ খোলে আমি কি আরো এগিয়ে এসে তোমাদেরকে আমার পরিচয় বলবো?
সকলে পরস্পরের দিকে তাকায়। তারপর সেই লোকটি ও, মেয়ে দুটোকে নিরীক্ষা করে দেখে। একজন ভয়জড়িত কণ্ঠে বললো- আপনি আমাদের নিকটে এসে বলুন আপনি কে এবং আমাদের জন্য আপনার কী নির্দেশ। আমরা আপনার নির্দেশ পালন করবো।
লোকটি এমনভাবে হেঁটে তাদের নিকটে চলে আসে, যে হাঁটা মানুষ হাঁটে না। লোকটির চলন ও ভাবভঙ্গিতে গাম্ভীর্য ও প্রভাব বিদ্যমান। মেয়ে দুটোও তার পেছনে পেছনে এগিয়ে আসে। শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য কাফেলার সকলে দাঁড়িয়ে যায়। তারা সন্ত্রস্ত। লোকটি টিলাটা পেছনে করে বসে পড়ে। মেয়েরাও দুপার্শ্বে বসে যায়। জালের মধ্যদিয়ে তাদের চক্ষু দেখা যাচ্ছে। বুঝা যাচ্ছে, খুবই রূপসী মেয়ে। কিন্তু তাদের চোখে চোখ রাখার সাহস কারো হচ্ছে না। লোকটির এবং মেয়ে দুটোর পোশাক ধুলামলিন। বোঝা গেলো, তারাও সফরে আছে।
***
আমিও সেখান থেকে এসেছি, যেখান থেকে তোমরা এসেছে দরবেশ মিসরের পালিয়ে আসা সৈনিকদের বললো- পার্থক্য শুধু এটুকু যে, তোমরা যেখানে যাচ্ছে, সেটি তোমাদের আবাস আর আমার আবাস সেটি ছিলো, যেখান থেকে আমি এসেছি।
লোকটির কণ্ঠে হতাশা।
আমরা কীভাবে বিশ্বাস করবো, আপনি মানুষ?- এক সৈনিক জিজ্ঞাসা করে। আমরা তো আপনাকে আকাশের প্রাণী মনে করছি?
আমি মানুষ- লোকটি উত্তর দেয়- আর এরা দুজন আমার কন্যা। আমিও তোমাদের ন্যায় রামাল্লা থেকে পালিয়ে এসেছি। আমার মুরশিদ যদি আমার প্রতি দয়া না করতেন, তাহলে খৃস্টানরা আমাকে হত্যা করে ফেলতো এবং আমার মেয়ে দুটোকে ছিনিয়ে নিতো। এ আমার মুরশিদের মাজারের বরকত। আমি রামাল্লার বাসিন্দা। শৈশব থেকেই আমার ধর্মজ্ঞান অর্জনের আকাঙ্খ ছিলো। আমি বহু মসজিদের ইমামের অনেক খেদমত করেছি এবং তাদের থেকে ইলম হাসিল করেছি। আল্লাহ তাঁর রাসূলের ধর্মের অনুসারীদের প্রতি অনেক অনুগ্রহ করে থাকেন। এক রাতে আমি স্বপ্নে নির্দেশ পাই, তুমি বাগদাদ চলে যাও এবং সেখানকার খতীবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করো।
