-ইতি আল-আদিল।
লেখা শেষ হওয়ার পর আল-আদিল পত্রখানা পাঠ করিয়ে শোনেন। তারপর তাতে স্বাক্ষর করে দূতের হাতে দিয়ে কায়রোর উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দেন।
***
কায়রোর আকাশে হতাশার কালো মেঘ ছেয়ে গেছে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী এখন কায়রো। নগরে-প্রত্যন্ত অঞ্চলে সকলের মুখে একটি-ই শব্দ উচ্চারিত হচ্ছে পরাজয়, পরাজয়, পরাজয়। সংশয় সন্দেহও দিন দিন বেড়ে চলছে। পরাজয়ের মতো দুর্ঘটনা এবং অজ্ঞাত কারণ ঘটনাবলি এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি করে, যার থেকে গুজব জন্ম নিয়ে দাবানলের ন্যায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিটা সৃষ্টি হয়ে গেছে কায়রোতে এবং তার আশপাশের অঞ্চলসমূহে, যেখানে শত্রুর নাশকতা কর্মী এবং গুপ্তচরও আছে, যারা ইউরোপের বাসিন্দা। মিসরেরই মুসলমান অধিবাসী। তারা খৃস্টানদের বেতনভোগি হয়ে কাজ করছে। তাদের দায়িত্ব, প্রচার করে বেড়ানো যে, খৃষ্টানদের এতোবেশি সামরিক শক্তি আছে, যার সম্মুখে পৃথিবীর কোনো শক্তির পঁাড়ানোর ক্ষমতা নেই। সুলতান আইউবীর পরাজিত বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু হয়ে যায় যে, এরা অথর্ব ও বিলাসী বাহিনী। যেখানে যায় লুট করে ফিরে এবং হাতে পেলেই মেয়েদের সম্ভ্রমহানী ঘটাতেও কুণ্ঠিত হয় না। সুলতান আইউবীর সামরিক যোগ্যতার বিরুদ্ধেও প্রচারণা শুরু হয়ে যায়।
একজন মানুষ যতো বেশি সরল হয়, গুজব ও আবেগময় বক্তব্য দ্বারা সে ততোবেশি প্রভাবিত হয়। সর্বত্র আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। এই কাজটা বেশি করছে নতুন ভর্তি হওয়া সৈন্যরা। আর সাধারণ মানুষ এই অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে আতঙ্কিত হয়ে ওঠছে। আল-আদিল ঠিকই লিখেছেন, রাজত্বের লোভী মুসলিম আমীরগণ নিজেদেরকে এবং সুলতান আইউবীর বাহিনীকে যদি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে ধ্বংস না করতো, তাহলে নতুন সৈনিকদের দ্বারা যুদ্ধ করাবার ঝুঁকি মাথায় নিতে হতো না। একটি ভুল ভর্তিসংশ্লিষ্ট কতিপয় কর্মকর্তাও করেছিলেন যে, জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য গনীমতের প্রলোভন দেখিয়েছিলেন। অথচ, প্রয়োজন ছিলো জিহাদের ফযীলত, গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে মানুষকে সেনা বাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং একথা জানানো যে, তাদের শত্রু কারা, তাদের প্রকৃতি ও লক্ষ্য কী?
রামাল্লায় পরাজয়বরণ করে ফিরে আসা এই সৈন্যরা একাকি কিংবা দু দুজন, চার-চারজনের ছোট ছোট দলে মিসরের সীমানায় প্রবেশ করছিলো। কেউ পায়ে হেঁটে কেউবা উট-ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে। কোন সৈনিক যখন লোকালয়ে প্রবেশ করছে, জনতা তাকে ঘরে নিয়ে পানাহার করাচ্ছে এবং যুদ্ধের কাহিনী জিজ্ঞাসা করছে। নতুন ও অনভিজ্ঞ বলে তারা পরাজয়ের গ্লানি দূর করার লক্ষ্যে কমান্ডারদেরকে অযোগ্য ও বিলাসী আখ্যায়িত করছে এবং খৃস্টান বাহিনীর শক্তির বর্ণনা দিচ্ছে। কারো কারো কথায় প্রমাণিত হচ্ছিলো, খৃস্টানদের কাছে অলৌকিক এমন কোন শক্তি আছে, যার ফলে তারা যেখানেই যাচ্ছে বিজয় ছিনিয়ে আনছে।
দু-তিনজন ঐতিহাসিক- যাদের মধ্যে আরনল্ড অন্যতম- লিখেছেন, খৃস্টানরা একটি গোপন অস্ত্র নিয়ে এসেছিলো এবং সেটিই তাদের বিজয়ের কারণ হয়েছিলো। সেই গোপন অস্ত্রটা কী, ইতিহাসে তার উল্লেখ নেই। কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদের রোজনামচায় এরূপ কোনো অস্ত্রের উল্লেখ নেই। তৎকালের কাহিনীকারগণও এই গোপন অস্ত্র সম্পর্কে নীরব। সম্ভবত অস্ত্রটি হলো খৃস্টানদের প্রোপাগান্ডার অস্ত্র, যাকে মিসর ও অন্যান মুসলিম অঞ্চলে খৃষ্টানদের আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিলো। বোধ হয় এই প্রোপাগান্ডা কৌশলকেই ঐতিহাসিকরা অস্ত্র বলে অভিহিত করেছেন।
এই গোপন অস্ত্র আসলে প্রোপাগান্ডাই ছিলো। তার উদ্দেশ্য ছিলো চারটি। প্রথমত, জানগণের চোখে সেনা বাহিনীকে অপদস্ত করা, যাতে সুলতান আইউবীর ফৌজ জনগণের সহযোগিতা ও নতুন ভর্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, মুসলমানদের মনে খৃস্টানদের ভীতি সৃষ্টি করা। তৃতীয়ত, সুলতান আইউবীর প্রতি দেশবাসীর আস্থা নষ্ট করা। চতুর্থত, আরো কিছু লোক রাজত্বের দাবিদার হয়ে যাবে এবং পুনর্বার গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়া যাবে।
সুলতার আইউবী দুশমনের এই অস্ত্র সম্পর্কে ভালোভাবেই অবহিত ছিলেন। তাই কায়রো পৌঁছেই তিনি গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ান, নগর প্রধান গিয়াস বিলবীস ও তাদের নায়েবদেরকে ডেকে বলে দেন, দুশমনের এই গোপন তৎপরতা প্রতিরোধের জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করুন এবং আমাদের গুপ্তচর ও সংবাদদাতাদেরকে আন্ডারগ্রাউন্ডে নিয়ে জোরদারভাবে কাজে লাগিয়ে দিন।
কিন্তু জনগণ জানতে চায় এই পরাজয়ের কারণগুলো কী, এর জন্য দায়ী কে?
***
রামাল্লা থেকে কায়রোর দূরত্ব অনেক দীর্ঘ এবং সফর অত্যন্ত কঠিন ও বিপজ্জনক। পথে পাহাড়ি এলাকাও আছে, বালির টিলা এবং মরুভূমিও আছে, যে ভূমি পথভোলা পথিকের রক্ত চুষে খেয়ে থাকে। রামাল্লায় পরাজিত হয়ে মিসরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া সুলতান আইউবীর সৈনিকগণ এই দীর্ঘ ও বিপজ্জনক পথেই যাত্রা শুরু করে। তাদের প্রত্যাবর্তনের দৃশ্য ছিলো ভয়ংকর। যারা মরুভূমির সফরে অভ্যস্ত ছিলো না, তারা কোথাও পড়ে গেলে আর উঠতে পারতো না। মৃতদের লাশ মাত্র একদিন নিরাপদ থাকতো। একদিন পরই মরু শিয়াল আর নেকড়েরা তাদের হাড়-মাংস ছিন্নভিন্ন করে ফেলতো। দলবদ্ধভাবে চলা সৈনিকরা এই পরিণতি থেকে রক্ষা পেতো। যারা উট-ঘোড়া ও খচ্চরে আরোহণ করে চলতো, তাদের জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা বেশি ছিলো।
