আল-আদিল স্বীয় বড় ভাই সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নামে পত্র লিখেন
শ্রদ্ধেয় বড় ভাই এবং মিসর-সিরিয়ার সুলতান! আল্লাহ আপনাকে সালতানাতে ইসলামিয়ার মর্যাদার খাতিরে দীর্ঘায়ু দান করুন। আমি এই আশায় পত্র লিখছি যে, আপনি সুস্থ্য শরীরে নিরাপদে কায়রো পৌঁছে গেছেন। একবার সংবাদ পেয়েছিলাম, আপনি শহীদ হয়ে গেছেন। তারপর খবর এলো, আহত হয়েছেন। আমি ও আমার সালারগণ চিন্তা ও পেরেশানীতে আছি। আপনি বুদ্ধির কাজ করেছেন যে, রাস্তা থেকেই দূত প্রেরণ করে আমাদের অবহিত করেছেন, আপনি নিরাপদ আছেন এবং কায়রো যাচ্ছেন। আমি আশা করছি, আপনি রামাল্লার পরাজয়ে ভেঙে পড়েননি। আমরা ইনশাআল্লাহ এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবো, হারানো অঞ্চল পুনরুদ্ধার করবো এবং বাইতুল মুকাদ্দাস অতিক্রম করে সম্মুখেও এগিয়ে যাবো।
আপনি রামাল্লার পরাজয়ের কারণ নিয়ে চিন্তা করছেন। আমি এর দায় ফৌজের উপর চাপাবো না। আমাদের ভাইয়েরাই আমাদেরকে সেইদিন পরাজয়ের পথে নিক্ষেপ করেছে, যেদিন তারা আমাদের বিপক্ষে সারিবদ্ধ হয়েছিলো। দুই ভাই যখন আপসে যুদ্ধ করে, তখন তাদের শত্রুরা সহমর্মিতার আড়ালে একজনকে অপরজনের বিরুদ্ধে উস্কানি দিতে থাকে। রাজত্বের নেশা আমাদের ভাইদেরকে অন্ধ করে দিয়েছে। সালতানাতে ইসলামিয়ার যে সম্পদ ছিলো, গৃহযুদ্ধে সব শেষ হয়ে গেছে। আমাদের বাহিনীর ভালো ভালো অভিজ্ঞ সৈন্যগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের ফৌজ আর আমরা একই খেলাফতের সৈনিক ছিলাম। কিন্তু তাদের সেই ফৌজ শুধু এ কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তাদের কতিপয় লোক সিংহাসনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলো। যে জাতির নেতৃস্থানীয় লোকদের মধ্যে শিহাসনের লোভ সৃষ্টি হবে, সেই জাতিকে তারা দলে দলে ও গোত্রে পাত্রে বিভক্ত করে আপসে যুদ্ধ করাবে। আমাদেরকে এদিকেও দৃষ্টি খতে হবে, যেনো জাতি বিভেদ-বৈষম্যের শিকার না হয়। আমাদের সিংহভাগ সৈন্য গৃহযুদ্ধে বিনষ্ট হয়েছে। নতুন ভর্তি দ্বারা আমরা সেই অভাব পূরণ করেছি এবং পরাজয়বরণ করেছি। রণাঙ্গন থেকে বিশৃংখলভাবে পলায়নকারী সব সৈন্যই নতুন ছিলো।
রামাল্লার পরাজয়ের পরপরই আমি এবং আমার সালারগণ প্রমাণ করে দিয়েছি, আমাদের ফৌজ পরাজিত হয়নি। আমার নিকট সেই পদাতিক ও অশ্বারোহী যোদ্ধারাই ছিলো, আপনি যাদেরকে আমার কমান্ডে, রেখে গিয়েছিলেন। আপনি আমাকে রিজার্ভ রেখেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থা এত দ্রুত পাল্টে যায় যে, আপনার কোনো নির্দেশ আমার কাছে এসে পৌঁছেনি। আমি এ-ও জানতে পারিনি, সম্মুখে কী হচ্ছে। আর আমি আপনাকে কি-ইবা সাহায্য করতে পারতাম। পেছনে সরে আসা এক কমান্ডার- যে ডান পার্শ্বে ছিলো আমাকে উদ্বেগজনক সংবাদ জানালো এবং পরামর্শ দিলো, আমি যেনো আমার বাহিনীকে ব্যবহার না করি এবং আক্রমণ করে ভুল না করি। আমি আবেগ নিয়ন্ত্রণে রেখে বিবেক অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আমি আমার বাহিনীকে হামাত অভিমুখে রওনা হওয়ার নির্দেশ প্রদান করি।
আমার বাহিনীর মনোবল ভেঙে গিয়েছিলো। আমি দুআ করতে থাকি, যেনো দুশমন আমার সামনে এসে পড়ে আর আমি আমার সৈনিকদের চেতনায় জীবন ফিরিয়ে আনতে পারি। আমি পেছনে লোক রেখে এসেছিলাম। হামাতের পার্বত্য অঞ্চলের সংবাদদাতারা আমাকে মূল্যবান সংবাদ জানালো, বল্ডউইন আমার পশ্চাদ্ধাবনে আসছে। আমি দুর্গে আছি মনে করে তিনি তার পুরো বাহিনীকে হামাতের দুর্গ অবরোধের জন্য নিয়ে আসেন। কিন্তু আমি আপনারই কৌশল মোতাবেক পাহাড়ের অভ্যন্তরে সৈন্যদের লুকিয়ে রাখি এবং দুর্গপতিকে আমার পরিকল্পনা ও পরিস্থিতি অবহিত করে রাখি। আল্লাহ আমার আশা পূর্ণ করেছেন। আমার সৈন্যরা বল্ডউইনের বাহিনীর উপর যাদের সংখ্যা আমার চেয়ে দশগুণ বেশি। অত্যন্ত বীরোচিত ও সফল কমান্ডো আক্রমণ চালায়। এটি আপনার সেই বাহিনীর কমান্ডো অভিযান, যাদের সম্পর্কে ইতিহাস বলবে, এরা পরাজিত হয়েছিলো। আমি মনে করি, এই কমান্ডো অভিযানের কাহিনী লিপিবদ্ধ করে রাখা দরকার, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বলতে না পারে, পরাজয়ের পর জাতি মরে যায়।
পরদিন রাত পোহাবার পর আমরা যে দৃশ্যটা দেখলাম, যদি আপনি দেখতেন, তাহলে রামাল্লার পরাজয়ের সব বেদনা ভুলে যেতেন। আমার আফসোস, বল্ডউইন আমার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে গেছে। আমি তাকে ধরতে পারিনি। এই মুহূর্তে আমি একটি পাথরের উপর দাঁড়িয়ে কাতের দ্বারা পত্র লেখাচ্ছি। ঐ যে আমি হামাতের দুর্গটা দেখতে পাচ্ছি। তার উপর মিসর ও সিরিয়ার পতাকা উড়ছে। দুর্গের চতুর্পার্শ্বে খৃস্টানদের লাশ ছাড়া আর যা দেখা যাচ্ছে, তাহলে হাজার হাজার শকুন, যারা লাশগুলো খাবলে খাচ্ছে। আকাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে শকুনের দল নামছে। কোনো কোনো স্থান থেকে ধোঁয়া উঠছে। এই আগুন গত রাতে আমার গেরিলারা লাগিয়েছিলো। বল্ডউইনের জীবিত সৈন্যরা যেরূপ বিক্ষিপ্ত ও জ্ঞানশূন্য অবস্থায় পলায়ন করেছে, তাতে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, সে পাল্টা আক্রমণ করতে পারবে না। তথাপি আমি তার জন্য প্রস্তুত আছি।
বর্তমানে আমার হাতে যে পরিমাণ সৈন্য আছে, যদি আরো এ পরিমাণ সৈন্য থাকতো, তাহলে আমি খৃস্টানদের ধাওয়া করতাম এবং পরাজয়কে বিজয়ে পরিণত করে দিতাম। আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, আমার সালার, কমান্ডার ও সকল সৈন্যের যুদ্ধের জ্যুবা চাঙ্গা হয়ে গেছে। আমি জানি, আপনি আরামে বসে নেই। মিসর পৌঁছেই আপনি নতুন ভর্তি ও নববিন্যাসে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আপনি শান্তমনে প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। আমি গেরিলা যুদ্ধ অব্যাহত রাখবো। আমি দুশমনকে কোথাও সুস্থির বসতে দেবো না। এই প্রক্রিয়ায় আমি কোনো অঞ্চলের উপর দখল প্রতিষ্ঠা করতে পারবো না বটে; কিন্তু আপনি প্রস্তুতির সময় পেয়ে যাবেন। আমি দামেশকে ভাই শামসুদ্দৌলাকে বার্তা প্রেরণ করেছি, যেন তিনি আমার জন্য কয়েক ইউনিট সৈন্য ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি প্রেরণ করেন। হাবে আল-মালিকুস সালিহকে পত্র দিয়েছি, যেন তিনি চুক্তি মোতাবেক আমাকে সাহায্য দেন। আল্লাহর উপর ভরসা করে আমি আপনাকে সান্ত্বনা দিচ্ছি, আপনি আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আমি ও আমার সালারগণ আপনার কুশল ও তৎপরতা সম্পর্কে জানতে উদগ্রীব। আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। আমি তারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। আমাদের সকলকে তারই নিকট ফিরে যেতে হবে।
